লাবণী মণ্ডল

নারীবাদী লেখিকা।

মন্টি চাকমা ও দয়া চাকমাতো ‘নারী’ই

পাহাড় মানেই রহস্য। সৌন্দর্যের রহস্য আছে আবার আছে ভয়ঙ্কর রহস্য। জাদুর রহস্যও রয়েছে। আমরা পাহাড়প্রেমী। পাহাড়ের ঝর্ণা, অরণ্য আমাদেরকে ভাবায়, প্রলোভিত করে। আমাদেরকে আনন্দ দেয়, প্রশান্তি দেয়। আমাদেরকে নতুন করে স্বপ্ন দেখার অনুপ্রেরণাও জোগায়। পাহাড়কে বর্ণনা করে শেষ করা যাবে না। আমরা পাহাড়ীদের প্রশংসাও কম করি না। তারা মিশুক, আত্মীয়পরায়ণ। কেউ কেউ তো রীতমতো প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে কবিতায়, গল্পে, উপন্যাসে পাহাড়ীদের চরিত্রকে প্রধান স্থান দেয়। পাহাড়ী মেয়েদের বর্ণনার তো শেষ নেই।

পথনাটক, মঞ্চনাটক, টিভি নাটক থেকে শুরু করে কোথায় নেই পাহাড়ীদের অবস্থান। এতে বোঝা যায় পাহাড়ীরা আজ বড় সুখে-শান্তিতে, আরামে-আয়েশে বাস করছে। তারা তো বরং সর্বজায়গায় অবস্থান করছে। হ্যাঁ, একপাক্ষিক চোখে এরকমটাই দেখা যায়। আরো দেখা যায় তাদেরকে যখন বিশেষভাবে কোনো অনুষ্ঠানে ডেকে আনা হয়, তাদেরকে নাচিয়ে-গাইয়ে বেশ সুনামও অর্জন করা যায়। আহা পাহাড়ীদের ছাতা নাচ, আলো নাচ কতই না সুন্দর! সুন্দরের বর্ণনায় পাহাড়ীরা প্রথম সারিতে।

বছরে দু’একবার পাহাড়ে না গেলে চলেই না। আহা, রাঙামাটি, সীতাকুণ্ডু, কক্সবাজার, খাগড়াছড়ির তুলনার শেষ নেই। সমুদ্রের মতো গভীর তাদের মন, পাহাড়ের মতোই অসীম তাদের চিন্তাভাবনা- কত কিছুই না বলেন আপনারা। আর এজন্যই আপনারা এইসমাজের দৃষ্টিতে ভদ্র, নম্র, অতীব ভালো মানুষ। পাহাড়ীদের টুরিস্ট গাইড হিসেবে ব্যবহার করেন। কোনোকিছুতেই কমতি নেই যেন!

কিন্তু বিষয়টা কি অতই সহজ, সাবলীল? প্রতিনিয়ত পাহাড়ী নারীদের ধর্ষণের খবর কি রাখছেন না, গুম, খুন, ধর্ষণেও তো পাহাড়ীদের উপর আপনারাই এগিয়ে। আপনারা বলতে এই বাঙালিরাই এগিয়ে- নাকি বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে? কল্পনা চাকমা থেকে শুরু করে নামগুলো বেড়েই যাচ্ছে, কমছে না তো! এত এত মানুষ, এত এত জ্ঞানী-গুনী বাড়ছে তাতে পাহাড়ীসহ সারা বাংলাদেশের চিত্র তো একই।

মন্টি চাকমা, দয়া চাকমাকে নিয়ে এত কম কথা হচ্ছে কেনো? তাদের রাজনৈতিক লাইনের কারণে? নাকি তারা পাহাড়ী বলে, চাকমা বলে? নাকি তাদের ফেসভ্যালু নেই? তাদের পক্ষ নিয়ে জাতে উঠা যাবে না, আপনার স্ট্যাটাস রক্ষা পাবে না! আপনার প্রতিবাদে হাজার হাজার সুশীল সামিল হবে না বলে? কোনটা ঠিক? যেখানে সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে তুলকালাম বাঁধিয়ে দেন আপনারা, গলা ফাটিয়ে দেন, রাজপথ কাঁপিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা করেন- সেখানে এদের নিয়ে কোনো কথা নেই, কোনো উচ্চবাচ্য পর্যন্ত নেই। হায় সেলুকাস! হায় গণতন্ত্র! হায় সুশীল! হায় প্রগতিশীল! হায় নারীবাদী!

মন্টি চাকমা, দয়া চাকমাতো নারীই। যদি এই বিষয়টা মাথায় রাখা যায় তবুও সোচ্চার হওয়া যায়। আসলে, ঘটনা একটাই শ্রেণিচরিত্র। আপনারা বুঝেন কোথায় নাচা যাবে আর কোথায় যাবে না। আর কোনো বুদ্ধি না থাকলেও এইধরনের কুবুদ্ধিকে ভালোভাবেই আয়ত্ত করতে পেরেছেন। হ্যাঁ, এটাই চেয়েছিলো এই সমাজ, রাষ্ট্র। এখানে এদের সফলতা। আমাদের মতো মানুষের ব্যর্থতা।

বনানীর ধর্ষণে আপনারা সবাই হুড়মুড় করে রাস্তায় নেমে আসেন, কিন্তু বাসা বাড়িতে, গার্মেন্টসে, বাসে যে সমস্ত নারী ধর্ষণ হয় তাদের নিয়ে একটা লাইনও লিখতে পারেন না। তখন আপনার কত ভাবতে হয়! ভাবনাটাই স্বাভাবিক। আপনার একটা জাত আছে। এইসব অজাত-কুজাতদের পক্ষ নিয়ে কেনো জাতের পিণ্ডি জ্বালাবেন, কেনো বলুন? ঠিক মন্টি চাকমা, দয়া চাকমাদের বেলায় একই কথা প্রযোজ্য। আপনারা সব অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন না। বেছে বেছে নিজের পছন্দমতো, রুচিমতো প্রতিবাদ করেন। এজন্যই আপনাদের ফেসভ্যালুর মূল্যায়ন করে এই ঠুনকো সমাজ- যা আপনারা চানও বটে!

আপনাদের আন্দোলনের একটা শ্রেণিচরিত্র আছে। এই শ্রেণিচরিত্রটাকে প্রাধান্য দিয়েই রাস্তায় নামেন, সোশ্যাল মিডিয়া গরম করেন। কে কত বেশি লিখতে পারবেন, কত বেশি শেয়ার হবে, কার কত কমেন্ট, কার কত লাইক। এ নিয়ে দিব্যি গোলটেবিলও বসে পড়েন। চায়ের কাপে চুমুক, সিগারেটের ধুয়ো ছড়িয়ে আলোচনা করতেই থাকেন। আত্মঅহমিকায় যেন উড়ে যান, যেন জীবনের সকল সার্থকতা পেয়ে গেছেন। কেনো এত অল্পতেই এত উড়ে যান? আপনারা!

আবার ইনিয়ে-বিনিয়ে, আবেগে নাক-চোখের পানি এক করে বলবেন- আমরা কোথাও নিরাপদ নয়। মন্টি চাকমা, দয়া চাকমাদের কাছে ক্ষমা চাওয়া ছাড়া আছে কী? না, আপনারা ওদের কাছে ক্ষমা চেয়ে ওদেরকে অপরাধী করবেন না। ওরা আপনাদের/আমাদের ক্ষমা করবে না। ওরা এত ক্ষমাশীল নয়। আপনাদের মতো এতো অল্পতেই তুষ্ট নয় ওরা। তাইতো আজ ওরা অপহরণ হয়, দিনের পর দিন যায় কোনো খোঁজ নেই। তারপর সব চলছে। সব ঠিকঠাক চলছে। কারোকোনো কিছু থেমে নেই। হ্যাঁ, থেমে আছে মন্টি চাকমা, দয়া চাকমার পরিবারের লোকজনের- সেই যে স্তব্ধ হয়েছে আজ পর্যন্ত তারা স্বাভাবিক হতে পারে নি- তাই তো স্বাভাবিক! কিন্তু আপনারা/আমরা দিব্যি চলে যাচ্ছি। সস্তা দরে যেগুলোর প্রতিবাদ করা যায় ঠিক সেগুলোর প্রতিবাদ করে যাচ্ছি। যে প্রতিবাদ করলে রাষ্ট্র, সমাজের কিচ্ছুটি যায় আসে না- সেগুলোর পিছনে দিনের পর দিন দৌড়োচ্ছি। মন্টি চাকমা, দয়া চাকমাদের নিয়ে বেশি কথা বলতে নেই। হুমকি আসতে পারে। আহা, কতই না বেঁচে থাকার শখ! যেকোনো মূল্যেই এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকতেই হবে!

রাজনৈতিক পার্টি, সংগঠনগুলোতো কোনো রকমে শান্তি বজায় রেখে, একটা মানববন্ধন করেই খালাস। যাতে পাছে কেউ না বলতে পারে আপনারা তো কোনো কথা বললেন না। তারা তাদের দোষকে কাটিয়ে উঠছে। তাদের একটা মানববন্ধন হয়েছে তো! যেখানে দু’দুটি মেয়ে নেই হয়ে গেলো সেখানেই এটাই যথেষ্ট!

তারা যদি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার স্বীকারও হন, তা নিয়ে কথা বলা দরকার। এই রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে মুক্তির উপায় খোঁজা দরকার নেই কী? এতো ছোট্ট লেখায় অত বেশি কিছু টানাবো না তবে এটাই বলতে চাই নারীদের এত বেছে বেছে আন্দোলন করার কারণটা কী? তারা যদি শুধু নারী নিয়েই থাকে তবুও তো এদের নিয়ে কথা বলা উচিত। নাকি, নারী আন্দোলন, নারীবাদেরও ক্লাসিফিকেশন আছে? সব নারীর ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রযোজ্য নয়?

শাহবাগ কাঁপানোর জন্য মন্টি চাকমা, দয়া চাকমারা ইস্যু কেনো হতে পারে না? নাকি আপনারা এ দু’জনকে চিনেন না বলে! এত এত চিন্তা-বুদ্ধি নিয়ে আপনাদের ঘুম আসে কি করে? হে আন্দোলনকারী? প্রত্যেকটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন নচেৎ আপনারা এইসব আতলামী বন্ধ করুন। এর শেষ আছে বলে কিছু মানেন কী? ভণ্ডামী ছাড়ুন, পথে নামলে নামার মতো নামুন। নচেৎ এসিতে বসেই ঠিক যেভাবে থাকতেন সেভাবেই থাকুন।

মন্টি চাকমা, দয়া চাকমাদের নিয়ে যেমন আপনাদের ভাবতে হবে না ঠিক তেমনি আন্দোলনকে খেলার পুতুল বানাতে দেওয়া হবে না আপনাদেরকে। কারো এজেন্ডা হয়ে, কোনো গোষ্ঠির এজেন্ডা হয়ে আন্দোলন করে বাংলাদেশকে রসাতলে নিয়ে যাবেন না। যতটুকু গেছে, ততটুকু থেকে উদ্ধারের চেষ্টা করার একজন সত্যিকারের মানুষের কাজ হোক। আপনারাও একটু বসে ভাবুন- কি করছেন, কেনো করছেন? উদ্দেশ্যটাই বা কী? আমূল পরিবর্তন নাকি হরেবরে...

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।