মোনাজ হক

সম্পাদক আজকের বাংলা ডট কম

মানবতাবাদ বা হিউম্যানিজম থেকে রেঁনেসা

"মানবতাবাদ" বা হিউম্যানিজম শব্দটি ল্যাটিন শব্দ মানবতা থেকে আসে। মানবতাবাদ ইউরোপের সমস্ত পশ্চিমা দেশগুলির মধ্যে ১৫ থেকে ১৬ শতকের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। প্রাচীনকালের মানবতার ধারণায় পণ্ডিতদের দর্শনের পরিবর্তন ঘটায়। "রেনেসাঁ" শব্দটি ফরাসি থেকে আসে এবং তাকে নবজাগরণ বলা হয়। এটি প্রাচীন সংস্কৃতির নতুন আবিষ্কারের সাথে একটি ইউরোপীয় সংস্কার আন্দোলন ছিলো। সংস্কারের ফলে খ্রিস্টীয় ধর্মযাজক মার্টিন লুথার কর্তৃক ক্যাথলিক চার্চের পুনর্নবীকরণের প্রতিনিধিত্ব করে।

ইতিহাস থেকে আমরা জানি যে ১৪৫৩ সালে রোমান সাম্রাজ্য কনস্টান্টিনোপল আবার তুর্কিদের কাছ ফিরে যায় এবং অনেক বাইজেন্টাইন পণ্ডিতদেরকে ইতালিতে পালিয়ে যেতে বাধ্য করে। ১৪৫৫ সালে, জোহানেস গুটেনবার্গ সেই কাহিনী ছাপার অক্ষর দিয়ে চিত্রায়িত করেন (এর আগে হাতে লিখে ইতিহাস সংরক্ষিত হতো) এবং এর ফলে বই ছাপানোর প্রচলন দ্রুত থেকে দ্রুততর হয়। ১৪৯২ খ্রিষ্টাব্দে ক্রিস্টোফার কলম্বাস কর্তৃক আমেরিকা পুনরায় আবিষ্কৃত হয়। কোপের্নিকাস এর মাধ্যমে সূর্যাস্তিক পৃথিবীর ও গ্রহপুঞ্জ ধারণা প্রবল হতে থাকে এবং জোহানেসন কেপলার গ্রহপুঞ্জের কক্ষপথ আবিষ্কার করেন। এই সংস্কার সমুহ মার্টিন লুথার তাঁর এই থিসিস দ্বারা প্রমাণিত ও গ্রহণ করেছিলেন, তাই ১৫২১ সালে মার্টিন লুথারকে ক্যাথলিক চার্চ ও রাষ্ট্রিক আইনসভার অইন দিয়ে তাকে চার্চ থেকে বহিষ্কার করা হয়। তিনি বাইবেল অনুবাদ শুরু করেন ও তাঁর উচ্চ জার্মান ভাষাজ্ঞান প্রয়োগের ফলে তিনি ধর্ম সংস্কারে নতুন উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন। ১৫৫৫ সালে মার্টিন লুথার ধর্মীয় শান্তি আন্দলন "রিফরমেসন" শুরু করেন, কিন্তু এই বিপ্লব আর থামাতে পারে না ক্যাথোলিক চার্চ। মানবতাবাদ ইতালি থেকে শুরু হলেও পরে তা "রেনেসাঁ" নামে সারা ইউরোপ ছড়িয়ে পড়ে।

ইতালীয় দার্শনিক দান্তে আলিগরি এবং গিওভ্যানি বোকাসিয়ো মতো লেখকরা নিজেদের জন্য মানবতাবাদ নামে একটি নতুন আন্দোলন শুরু করেন। এটি বাইজেন্টাইন পণ্ডিতদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলো যারা তুর্কিদের দ্বারা কনস্টান্টিনোপলকে পরাজিত হওয়ার পর ইতালিতে চলে আসেন। চার্চের পাদরীবর্গরাও উচ্চপদস্থ শাস্ত্রীয় কাজের অনুবাদ ও সংরক্ষণের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলো। বই মুদ্রণ আবিষ্কার এই সংস্কারের কাজ প্রক্রিয়াকরণ ত্বরান্বিত করে। ইউরোপের অন্যান্য দেশেও মানবিকতাবাদ বা হিউম্যানিজম ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে এটি কেবল শিল্প ও সাহিত্যের সাথেই শুধু ইতালিতে নয়, ফরাসি, জার্মান পণ্ডিতরা একটি মানবতামূলক শিক্ষা এবং ধর্মতত্ত্ব ছড়িয়ে দেবার জন্য বিশাল প্রোগ্রাম তৈরি করেন। তারা সংস্কারের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। জার্মান মানবতার শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি ছিলো ইরাসমমোস ভন রটারডাম, উলরিখ ভন হুতেন এবং জোহানেস রয়েসলাইন। তাঁরা সকলেই আধুনিক ছাপাখানার কল্যাণে পত্রিকা প্রকাশ শুরু করে ছিলেন, যা দিয়ে ক্যাথলিক চার্চের দারুণ সমালোচনা শুরু করে একদিকে "রিফরমেসন" আর অন্যদিকে সংস্কৃতি, শিল্পকলা ও সংগীত এর নতুন রেনেসাঁ বা নবজাগরণ কে এগিয়ে নিয়ে যান। ছাপাখানার আবিষ্কার এই জার্মানি তে ১৫'শ শতাব্দী হওয়ায়, পৃথিবীর সর্ববৃহৎ বইমেলা ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয় এবারেও ১১ থেকে ১৫ অক্টোবর আবার নিয়মের মতো করে চলবে, প্রতিবার শুধু শতাধিক দেশের সহস্রাধিক প্রকাশক ও লক্ষাধিক পরিদর্শকদের বর্ণনা দেই।

এবার এই ছাপাখানাকে কেন্দ্র করে রেনেসাঁ বা নবজাগরণ নিয়ে একটু ব্যতিক্রমী এই লেখা। (এই আর্টিকেল টি আমার গত বছররের এক লেখার কিছু অংশ নিয়ে নতুন করে লেখার কারণ হলো, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অবস্থানটি ১৫'শ শতাব্দীর ইউরোপের রেনেসাঁ পূর্ববর্তী অবস্থা স্মরণ করিয়ে দেয়, তাই একটি নবজাগরণ বা বাংলার রেনেসাঁর সময় হয়তো এখনই লেখক, প্রকাশক আর শিক্ষক হত্যার বিচার সরকার এখনো নিশ্চিত কর‍তে পারেনি, বেশিরভাগ তরুন ব্লগাররা এখণ দেশের বাইরে, এই ইউরোপই তাদেরকে আশ্রয় দিয়েছে )

বাংলাদেশে এখন মুক্তচিন্তার মানুষ মৌলবাদীদের রোষানলে পড়েছে, শঙ্কা ও আতঙ্কে তারা দেশ ছেড়ে যাচ্ছে, বাংলার শিল্প, সংস্কৃতি ও সাহিত্যের নবজাগরণ কি ধর্মীয় মৌলবাদিদের দ্বারা হবে?

3822 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।