আমরা এভাবেই বেঁচে আছি ...!

বুধবার, জুলাই ২৪, ২০১৯ ৯:১৯ PM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


আজকাল আর কারো কথা ভাবতে ইচ্ছে করে না। সব কিছুতে সব জায়গায় নিজেকে খুঁজে পাই; এ এক ভয়ানক রোগ হয়েছে আমার!
 
গত দুদিন ধরে ফেসবুকে চোখ রাখা মাত্রই রক্তাক্ত বিধ্বস্ত এক নারীর মুখ নিউজ ফিডে ভাসছে, মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে হয়ত কোনো ক্রমে মুখটা তুলে বলছিলো- বাবারা, আমার দুইটা বাচ্চা আছে। আমি দ্রুত স্ক্রল করে উপরে উঠে যাই বা নিচে নেমে যাই, ছবিটা না দেখার ভান করি- তারপরও দেখে ফেলি আর আমার সেই ভয়ানক রোগে আক্রান্ত হই; আমি সেই নারীকে দেখি না নিজেকে দেখি, নিজেকে ভাবি। দেখি অফিস ফেরতা পথে বেশ দ্রুত হাটছি, বাসায় বাচ্চা রেখে আসছি। হঠাৎ কারো সাথে ধাক্কা লাগলো সেই লোক আমাকে বলছে চোখে দেখেন না? এই আপনার ব্যাগে কি? কথা কন না ক্যা? ধর ধর ছেলধরা! আর সাথে সাথে কিছু ছেলে আমায় টেনে হিচড়ে নিতে থাকলো আর লাথি, ঘুষি দিতে থাকলো। সাথে আরো আরো লোক জমে গেলো- মার চলছে! দিনের পর দিন অনলাইন মিডিয়ায় খুন-খারাবি, ধর্ষণ, হত্যা, গুম দেখতে দেখতে ফুসতে থাকা মানুষগুলো হাতের কাছে নিজের হাতে বিচার করবার একটা মোক্ষম সুযোগ প্রবল ভাবে কাজে লাগাচ্ছে, যে যেভাবে পারছে। শেষ নিশ্বাস নেবার আগে আমি মাথাটা তুলে শুধু বলতে পেরেছি বাসায় আমার একটা বাচ্চা আছে।
 
প্রতি মুহূর্তে একটা ভোতা যন্ত্রণার মধ্যদিয়ে আমি ঘর-সংসার-অফিস-বাচ্চা সামলাচ্ছি। সব করছি কিন্তু কোথাও আমি নেই, ভাবতে চাইছি না তবুও ভাবছি- যদি আমি না ফিরি আর, বাচ্চাকে বিকেলের স্ন্যাকসটা কে করে দেবে, রাতের খাবার কিংবা যখন ওর দুধুন পাবে তখন কি করবে সে যদি আমি না থাকি! আর আমাদের এতো এতো মিডিয়ার এতো এতো প্রতিভাবান(!) নামি দামি(!) সাংবাদিক ভাই-বোনেরা টিআরপি বাড়ানোর আশায় নিশ্চয় আমার আধো আধো বোল ফোটা বাচ্চাটার কাছেই জানতে চাইবে অনুভূতি! প্রশ্ন করবে মা কোথায়? মার জন্য মন কেমন করে?
 
এ তো গেলো একটা ঘটনা। আরো বহু ঘটনা ঘটছে এমন, আমি অন্যের ঘটনা গুলো নিজের মধ্যে দেখতে শুরু করেছি! এই ধরুন মিন্নির ঘটনা; মিন্নি মেয়েটাকে না চেনার কোনও কারণই নেই এখন আর। মেয়েটার বরকে প্রকাশ্য হত্যার প্রথম ভিডিওটি আমি দেখিনি কারণ দেখতে চাইনি। টিভি মিডিয়া ওর সাক্ষাতকার নিয়েছে আমি স্কিপ করে গেছি, কেবলি মনে হয়েছে এটা ওর সাক্ষাতকারের সময় নয়, এটা ভয়ানক ট্রমা থেকে বের হবার পথ খুঁজতে একটু শোক করবার সময়। কিন্তু কয়েকদিন পরেই আরেক ভিডিও! যা দেখেই আপামর জনসাধারন রায় দিয়ে দিচ্ছে এই হত্যায় মিন্নি নিজে জড়িত! না হলে সে অমন ধীরে ধীরে হাঁটলো কেনো? কুপাকুপির পরও নিজের ব্যাগের কথা ভুলে গেলো না কেনো? এমন আরো অনেক কেনো?
 
আমি বহু সাহস সঞ্চয় করে ২য় ভিডিওটা দেখলাম; আবার সেই রোগ! মিন্নিকে দেখি না, নিজেকে দেখি! আমি ফিরে যাই বছর তিনেক আগের দূর্ভাগ্যজনক এক দিনের এক ভয়ানক ঘটনায়। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস যে ঘটনা আমাকে ট্রমাটাইজ করে রেখেছিল; দিনের পর দিন কাউন্সেলিং, থেরাপি, মানষিক পরিচর্যায় যে ট্রমা আমি কাটিয়ে উঠলেও পুরোপুরি বেরুতে পারি না তার থেকে। কাউন্সেলিং ও থেরাপির এক পর্যায়ে আমার থেরাপিস্ট বলেছিলেন আমি যেনো সেই ঘটনা আর সেই সব দিনের কথা লিখবার চেষ্টা করি, যদি আমি লিখতে পারি তবে তার থেকে বেরুনো আমার জন্য সহজ হবে এবং এটা একটা প্রক্রিয়া। আমি এখনো লিখতে পারিনি, পারি না। হয়তো লিখবো কোনো একদিন;
 
 
কিন্তু নিম্মির দ্বিতীয় ভিডিও তার প্রতিক্রিয়া ও পরবর্তি অবস্থা আমাকে আবার সেই ঘটনার মধ্যে নিয়ে যায়, আমার যাপিত জীবন ক্ষতবিক্ষত হয়। তাই কিছুটা লিখবার চেষ্টা করছি। সেই ভয়াবহ দূর্ঘটনায় আমি ও আমার বোন আমাদের দুই মেয়েকে হারিয়েছি! ওরা দুজনেই টুপ করে ডুবে গেছে পাথরের টুকরোর মতন আমার বোনের বাসার পুকুরে! ওরা দুইবোন সোফায় বসে মুটু-পাতলু দেখছিল আমি গিয়েছিলাম বাথরুমে। বাথরুম থেকে গোসল সেরে ফিরে দেখি ওরা নেই, নেই তো নেই- ছাদে নেই, বাসার চারপাশে নেই, রাস্তায় নেই! আমি ছুটলাম লম্বা লন পেরিয়ে পুকুর ঘাটে; গিয়ে দেখি- দেখি আমার বোনের মেয়ে, আমাদের সবার খুব প্রিয় বাচ্চাটা উপুড় হয়ে ভাসছে! আর এক কোনে ভাসছে আমার ছোট্ট বাচ্চাটার একটা লাল জুতো! (এই যে আমি যত সহজে লিখছি বিষয়টা অত সহজ কিছু নয়!) এই দৃশ্য আমার ভেতর কী ঘটিয়েছিলো, আমি কী ভাবছিলাম বা ভাবছিলাম কিনা কিচ্ছু বলতে পারবো না শুধু জানি আমি পাগলের মত মরনপণ চিৎকার করছিলাম কারো সাহায্যের আশায়; আমি বলছিলাম কে আছো, আমার দুইটা বাচ্চা পানিতে ডুবে গেছে, কে আছো! কতক্ষন? ৩০ সেকেন্ড, এক মিনিটি, দুই মিনিট, জানি না! তারপর হঠাৎ মনে হলো আগে ওদের তোলা দরকার, সাথে সাথে নেমে গিয়ে ভাগ্নীকে টেনে ঘাট পর্যন্ত নিয়ে এলাম ততক্ষনে চারপাচ জন লোক চলে এসেছে। এর পরের ঘটনা গুলো নিশ্চয় লিখব কোনো একদিন।
 
কিন্তু আমার কী মনে হয় জানেন- এই যে আমি এখনো বেঁচেবর্তে আছি এবং এই যে লিখছি তা শুধু পারছি কারণ সেদিন আমার চারপাশে কোনো মোবাইল ক্যামেরা বা কোনো সিসি ক্যামেরা ছিলো না। তা থাকলে এই এত দিনে হয়ত আমিই হয়ে যেতাম আমার বাচ্চাদের হন্তারক! ভিডিও ফুটেজ দেখে মানুষের সহানুভূতি ২৪ ঘন্টাও পার হতো না তারপরই সবাই হয়ে যেতো ফেলুদা। প্রশ্নের পর প্রশ্ন উঠতো- দেখা মাত্রই আমি সুপারম্যানের মত পানিতে ঝাপিয়ে না পড়ে চিৎকার করে সময় নষ্ট করেছি কেনো? ওই সময়ই আমাকে গোসলের জন্য বাথরুমে যেতে হলো কেনো? গেলামই যদি বাচ্চাদের নিয়ে যাই নি কেনো? আমার চরিত্রের আগ-পাশ-তলা বিশ্লেষন করতে সবাই হয়ে যেত দুদে গোয়েন্দা। জীবনের সবচেয়ে দূর্ভাগ্যজনক ঘটনাতেও আমি স্বস্থি খুঁজছি আজকাল ভাবছি বড় সৌভাগ্য(!) আমার তখন কোনো ক্যামেরা ছিলো না।
 
এই যে লেখাটুকু লিখছি আমার দুইদিন পেরিয়ে গেছে এটুকু লিখতে। কেনো সে ব্যাখ্যা আপনাদের দিতে যাবো না কারণ এটা ব্যাখ্যা দিয়ে বোঝানো সম্ভব নয়। শুধু ভাবছি মানুষ তার সবচেয়ে দূর্ভাগ্যজনক সময়ে কী আচরণ করবে তার মস্তিস্ক তাকে কোন পথে নেবে তার বিচার করে লাইনআপ ঠিক করার আমরা কে বলুন তো?
 
আরো অনেক অনেক ভয়ঙ্কর নেতিবাচক খবর আমি আমার নিজের দিকে টেনে নিই। এক একটা বাচ্চা ধর্ষিত হয়ে বোঘোরে খুন হয় আমি আমার বাচ্চাদের কথা ভাবতে থাকি কেবল মনে হয় এ আমার হারিয়ে যাওয়া বাচ্চারা- কেউ হলুদ ক্ষেতে-ধান ক্ষেতে-রাস্তায়-মাদ্রাসায়-স্কুলে-বাসায় রক্তাক্ত হয়ে পড়ে আছে! আর ইলেক্টনিক-প্রিন্ট-অনলাইন সকল মাধ্যমে তাদের ছবি, নাম পরিচয়সহ খবর ছাপা হচ্ছে সেই সাথে রসালো বর্ণনা কোথায় কেমন কামড়, আচড়, আর কাটাকুটি! এক একটা ঘটনা ঘটে আর আমি সুমনকে (আমার বাচ্চার বাবা) জড়িয়ে ধরে হাও মাও করে কাঁদতে থাকি। এক সময় নিজের দূর্ভাগ্যতেও স্বস্থি খুঁজি, ভাবি, ভালো হয়েছে আমার বাচ্চারা এই ভয়ঙ্কর অন্যায় গুলো দেখবার/জানবার আগেই মরে গেছে!

  • ২২১ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

মলি জেনান

এইচএসসির শেষের দিকে ছাত্রইউনিয়নের সাথে জড়িত হই এবং ছাত্রইউনিয়নের পরিচয় গর্বের সাথে দিতে ভালোবাসি। বর্তমানে একটি সরকারী প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছি। লেখালেখি আমার জীবনের অংশ, আমি বেঁচে থাকবার জন্যই লিখি।

ফেসবুকে আমরা