মহুয়া ভট্টাচার্য

চট্টগ্রামের দৈনিক আজাদী পত্রিকার 'খোলা হাওয়া' পাতায় লেখালেখির শুরু। এবারের বইমেলায় একটি ছোটগল্পের বই প্রকাশিত হয়েছে। বইয়ের নাম - " মহুয়ার গল্প।"

নারীর জন্য বাসযোগ্য পৃথিবীর খোঁজে

একটি বছরের মারীময় পৃথিবীতে আমরা নিদারুণ বিভীষিকায় জীবন কাটাচ্ছি।  প্রতিনিয়তই নতুন নতুন আশংকা গ্রাস করছে আমাদের স্বাভাবিক হতে আপ্রাণ চেষ্টা করা জীবনযাত্রাকে। এসবের মধ্যেই  একটি বিভৎস ঘটনা সামলে উঠতে না উঠতেই আর একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা সামনে চলে আসে সামাজিক গণ মাধ্যমে। এই ঘটনাগুলোর বেশিরভাগেরই শিকার কিন্তু নারী অথবা শিশু। ধর্ষণ এবং নারী নির্যাতন এখন খুব স্বাভাবিক গা সওয়া বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।  অলিতে-গলিতে আনাচকানাচে প্রতি নিয়ত ঘটছে ধর্ষণের ঘটনা। আমরা যা শুনতে পাচ্ছি, কিংবা মিডিয়ায় যতখানি প্রচার হচ্ছে তা সিকিভাগ মাত্র। বাকি একটি বিরাট অংশ আমাদের জানার বাইরে চলে যাচ্ছে সামাজিক লোকলজ্জার ভয়ে এবং দূর্বৃত্তদের প্রভাব ক্ষমতা সংশ্লিষ্টতার কারণে।

কিন্তু এখনো কেনো পরিবার, সমাজ নারীর প্রতি এমন অমানবিকতা ধামাচাপা দিয়ে রাখছে জানেন? তার একমাত্র কারণ নারীকে এখনো আমরা মানুষ ভাবতে শিখিনি। কন্যা সন্তান এখনো পরিবারের আতংক, ভয় ও বিশাল দায়ের। সভ্যতার দু‘টো সচল চাকার একটি কিন্তু নারী, অথচ আমরা সেই নারীকে সন্তান উৎপাদনের ক্ষেত্র, গৃহপোষ্য প্রাণী ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারছি না। সমাজের একটি দূর্বল প্রাণীর নাম - নারী। তাকে ইচ্ছেমতো ব্যবহার করা যায়, খেয়ালখুশি মতো তার কাঁধে দায় চাপানো যায়। যেভাবে আজ আনুশকার ঘটনায় আমরা ভিক্টিম ব্লেমিং করে যাচ্ছি ক্রমাগত। একটি ষোল সতেরো বছর বয়সী মেয়ে, বন্ধুদের সাথে গ্রুপস্টাডি করতে গিয়ে ধর্ষণের শিকার হোলো। তার পায়ুপথ, যোনিপথ ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে রক্তক্ষরণ হতে হতে যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে মারা গেলো, অথচ আমরা তখনও দোষ খুঁজে বেড়াচ্ছি মেয়েটির অভিভাবকের আর ধর্মের নির্দেশনা না মানার কুফলকে। এটি নতুন বছরের প্রথম আলোচিত ঘটনা বললে ভুল হবে না। আনুশকার মৃত্যু সংবাদ আমাদের সংবেদনশীল মনকে নাড়িয়ে দিয়েছে ততোধিক বেশি হম্বিতম্বি দেখছি ধর্মের নীতিকথা বিলানো আর ভিক্টিম ব্লেমিং করা লোকজনের। মাত্র কয়েক বছরের  ঘটনাগুলোর দিকে চোখ দিলেই দেখা যায় এই ভিক্টিম ব্লেমিং এর ঘটনা নতুন কিছু নয়। সেই সাথে যুক্ত হয়েছে ‘সতীত্ব‘ ‘যৌন বিশুদ্ধতা‘ ‘যৌন পবিত্রতা‘ শব্দগুলো। এই সমস্ত বিষয়গুলোই পুরুষতান্ত্রিকতা যাপনের একটি প্রত্যক্ষ উদাহরণ। এই পুরুষতান্ত্রিকতা আমাদের সমাজে বিবেকবর্জিত নীতিহীনতার ভিত্তি গড়ে তুলছে ক্রমশঃ। 

এখন সময় এসেছে ধর্ষণের মূল কারণ উদঘাটন করার। এই কারণ থেকে যে নগ্ন সত্যিটি বেরিয়ে আসে, তার একটি পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা এবং দ্বিতীয়টি আমাদের বিদ্যালয় ও পরিবারে যথোপযুক্ত শিক্ষার অভাব।  কিন্তু সেসব গূঢ় তথ্য না ঘেটে আমরা ঢালাওভাবে দোষারোপ করি অপরাধীর অভিভাবককে এবং প্রযুক্তির ব্যবহারকে। আরো পরিস্কার করে বললে বলা যায়,  বর্তমানে আমরা তথ্য প্রযুক্তির উৎকর্ষতাকেই অনেকাংশে দায়ী করছি এই ধর্ষণ বা নারী নির্যাতনের বিষয়ে।

একবার বাচ্চাদের পাশে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে আমি ইউটিউবে  ভিডিও দেখছিলাম। ভিডিওটি ছিলো একটি সিজারিয়ান অপারেশনের। হঠাৎ খেয়াল হোলো আমার ছেলে এবং মেয়ে দু‘জনেই চোখ পাকিয়ে চেয়ে আছেন আমার মোবাইল স্ক্রিনে।  এবং আমার পুত্রের চোখ ছলছল!  জিজ্ঞেস করলাম-  কাঁদছো কেনো বাবা!? সে আমাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বললো, আমাদের বের করে আনতে তোমার পেটটাও কি এমনি করে কাটতে হয়েছিলো মা? আমি হেসে বললাম, এখন আর ব্যাথা নাই! সে মানবে না। আমার পেটে হাত বুলিয়ে বুলিয়ে বারবার জানতে চায় অনেক ব্যাথা পেয়েছো মা? তোমার পেট দু‘বার কাটতে হয়েছিলো না? এখন সেলাই করে দিয়েছে তো শক্ত করে?  যদি সেলাই ছুটে যায় মা, তোমার রক্ত তো সব বেরিয়ে মরে যাবে তুমি!  আমি তাকে যতই আশ্বস্ত করি যে শক্ত, মোটা সুতো দিয়েই আমার পেট সেলাই করা আছে, ছুটবে না, সে ততই বলে, তাহলে তুমি আস্তে আস্তে হাঁটবা, কখনও দৌড় দিবা না। এই ভিডিওটি থেকে সে যেমন খানিকটা আতংকিত হয়েছে, তেমনি সেই আতংক থেকে সে তার মায়ের কষ্টটুকু অন্তর থেকে উপলব্ধি করতে পেরেছে যে অনুভূতি আমি বই পড়িয়ে কিংবা বুঝিয়ে তৈরি করতে পারতাম না। তাহলে আমি কি করে প্রযুক্তির এই উৎকর্ষকে এড়িয়ে চলতে পারি?

আজকাল তথ্য প্রযুক্তির উৎকর্ষে  বাচ্চাদের এসব বোকা বানানোর প্রয়োজন হয় না। এই প্রযুক্তির উৎকর্ষের খারাপ দিকটিও অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু যদি ধর্ষণের কারণ হিসেবে পর্ণ সাইটগুলোকে দায়ী করা হয়, যদি পর্ণ দেখাই হয় এর কারণ, তাহলে আমি বলবো এই ধারণা ভুল। পর্ণ সাইট বন্ধ করে এর সমাধান অসম্ভব। পর্ণ সাইট বন্ধ করারও দরকার নেই। কেবল শিশুকাল থেকে সন্তানের প্রশ্নের উত্তর দিন। তাদের কৌতুহল নিবৃত্তির জন্য স্বাভাবিক আলোচনা করুন। যৌন শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হোক  প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে। এবং সবচেয়ে প্রধান যে বিষয়টি সকলের মধ্যে নারীর প্রতি সম্মানের দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে হবে। এর প্রয়োজনীতা কমবেশি গোটা পৃথিবীতেই। আর সেই সম্মান দিতে গিয়ে যদি সমাজ ও ধর্মের গন্ডী পেরোতেই হয় তাহলেও আমাদের এগিয়ে যেতে হবে নইলে মানুষ নামের এই বুদ্ধিমান প্রাণীটি অচিরেই পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে হিংস্র একদল স্বজাতি ভক্ষকে পরিণত হবে এবং তা বিবর্তনবাদের কোনো সূত্র না মেনেই। 

389 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।