মহুয়া ভট্টাচার্য

চট্টগ্রামের দৈনিক আজাদী পত্রিকার 'খোলা হাওয়া' পাতায় লেখালেখির শুরু। এবারের বইমেলায় একটি ছোটগল্পের বই প্রকাশিত হয়েছে। বইয়ের নাম - " মহুয়ার গল্প।"

একটি ধর্ষণ ও নারীবাদ

গতো দু'তিন দিন ধরে ফেসবুকে একটি অভিযোগ নিয়ে পোস্ট, পাল্টা পোস্ট,  কমেন্ট, পাল্টা কমেন্টগুলো পড়ছিলাম। প্রথম অভিযোগটির শিরোনামেই আমার প্রথম ধাক্কাটি লাগে। "একটি ধর্ষণঃ একজন নারীবাদী ও একজন বামনেতার ধর্ষণের সহযোগিতা।" বিষয়ের গভীরতা কখনো এমনি মগ্ন স্থিরতা নিয়ে আসে যা থেকে সৃষ্টি হয় দারুণ কিছু, যার নান্দনিক ভিত্তির উপর নির্মিত হয় সভ্যতা, উৎকর্ষতা পায় মানবতা। আবার বিষয়ের অস্থিরতায় কখনো মগজের নিউরন গুলোর ভাইব্রেশনের মাত্রা এতোই বেড়ে যায় যে ব্যপ্তিহীন বোধের ভিতর কাজ করে উচ্চ মাত্রার ব্যকুলতা, তেমনি এক ব্যকুলতা আমাকে অস্থির করে রেখেছে কয়েকদিন ধরে। কোনো অনৈতিক কর্মকান্ডের জন্য ব্যক্তিকে দায়ী করা যায়, শাস্তির দাবী করা যায়, কিন্তু যুগ যুগ ধরে চলে আসা কল্যাণকামী আদর্শকে কি দায়ী করা উচিত?

গত ৩ আগষ্ট মৌলভীবাজারে কিছু প্রগতিশীলদের হাত ধরে ঘটে যাওয়া ঘটনাটার কথা বলছি। উক্ত ঘটনার পঞ্চমূখী বর্নণা শুনে আমার ব্যকুলতাসমুহ ক্রমাগত আরো গভীরভাবে বিভ্রান্ত হতে শুরু করেছে। তবে একটা পয়েন্টে স্থির হতে পেরেছি যে সকল পক্ষের বক্তব্যে কেউ ঘটনার সত্যতা অস্বীকার করেননি। প্রথমত ঘটনাটা আমরা যার মুখে প্রথম শুনলাম তিনি ঐ ঈদ পূনর্মিলনি পার্টির হোষ্ট মি. মাহমুদ এইচ খান। ঘটনার সহযোগী হিসেবে যার দিকে আঙ্গুল তুলেছেন তিনি তার বন্ধু নারী অধিকারকর্মী মারজিয়া প্রভা, এখন প্রশ্ন হচ্ছে শুধু প্রভা কেনো, তিনি নিজেও কি সেই সময়ে সহযোগীর ভুমিকায় ছিলেন না? তা না হলে নিজের বাড়িতেই এই ধরনের ঘটনা তিনি শক্তি প্রয়োগ করে হলেও আটকালেন না কেনো? অথবা তাৎক্ষনিকভাবে মুখ না খুলে ২২ দিন পরে এসে কেনো মুখ খুললেন? অন্তত ভিকটিমকে সাথে নিয়ে তাৎক্ষনিক আইনের আশ্রয় নিতে পারতেন। এতোদিন পরে এসে নিজের বন্ধুদের বিরুদ্ধে সামাজিক মাধ্যমে এই অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠাই স্বাভাবিক।

মার্জিয়া প্রভা তার বক্তব্যে দাবি করছে তারা দু'জন পূর্ব পরিচিত এবং নিজেদের সম্মতিতেই তারা মিলিত হয়েছে। তাহলে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন আসে প্রভা তাদের পারস্পরিক সম্মতির কথা আগে থেকেই জানতেন এবং একজন সহযোগী হিসেবে মাহমুদের মাধ্যমে এই পার্টির আয়োজন করেন। পারস্পরিক সম্মতিতে করা কোনো কিছুতেই কারো আপত্তি থাকার কথা নয়। তবে মাদকের প্রভাবে কাউকে আনকনসাস মাইন্ডে নিয়ে যাওয়া ধর্ষনের পূর্ব প্রস্তুতি নয় কি? অন্যদিকে মি. তুষার একজন প্রগতিশীল ছাত্রনেতা এবং কবি হয়েও গতকাল নিজের ফেসবুক ষ্ট্যাটাসে যা লিখলেন তা একটি রগরগে চটি গল্পকেও হার মানায়। হুমায়ুন আজাদ যেভাবে জায়নামাজে প্রার্থনারত আল মাহমুদের মধ্যে একজন ধর্ষককে অবলোকন করেছিলেন, মি. তুষারের লেখা পড়ে আমরাও তেমনি প্রগতিশীলতার মোড়কে একজন ধর্ষক কবির ভাবমূর্তি দেখতে পাই। তিনি তার লেখায় এটাও উল্লেখ করেছেন যে, ম্যাসেঞ্জারে মেয়েটি তার সাথে কী ব্যবহার করেছে? খেয়াল করুন সে নিজেই স্বীকার করেছে যে, মেয়েটি তাকে বলেছে- “কুত্তার বাচ্চা শুওরের বাচ্চা, তুই আমার সাথে এটা কেনো করলি? এইডা ঠিক করছস না বন্ধু? তরে আমি সেন্সে থাকতেই কইছিলাম ১০০ হাত দূরে থাকতে”। তার মানে মাদকের প্রভাবে মেয়েটি যখন নিজের বোধ হারিয়ে ফেলে তখন এই ঘটনা ঘটে। এটিকে পরিকল্পিত ধর্ষন ছাড়া আর কী বলা যায়?

কোনো নারীর নেশাদ্রব্যে কৌতুহল আছে মানেই যে সে সেক্স পার্ভাট হবে এমন নয়। কিংবা খুব নিয়মিত শয্যাসঙ্গীকেও যে তার অমতে যেকোনো শারীরিক ও মানসিক পরিস্থিতিতেই নিজের শয্যাদাসী ভাবা যাবে এমন মানসিকতার বলয় থেকে তো নারী বেরিয়ে আসছেই। পাশ্চাত্য দেশগুলোর ন্যায় এই নেশা কিংবা মধ্যরাতের পার্টিকে আর কোনো রকম দোষ দেয়া যায় না। কারণ এখানে আমরাই সেই আঁধারকে সোসালাইজেশন করেছি অনেক আগে।

আরেক দিকে শোনা যাচ্ছে মেয়েটি এতদিন পর বোকার মতো মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এতে আলামত হিসেবে যা পাওয়া যাবে তাকে কি ধর্ষনের আলামত বলা যাবে? হয়তো নারী হিসেবে কিছু আইনের ফ্যাসিলিটি ছাড়াও কিছু প্রতিবাদী সহযোদ্ধাও পেয়ে যাবে। কিন্তু তা দিয়ে তার নিজের এবং তার পরিবারের যে সামাজিক মর্য়াদা ক্ষুন্ন হয়েছে তা পূনরোদ্ধার সম্ভব কি? আমাদের সামাজিক বাস্তবতায় মেয়েটি কি আরো ভার্চুয়াল ধর্ষণের শিকার হবে না? মাঝখান থেকে ফায়দা লুটে নিচ্ছে নারীবাদের পেছনে লাগা কিছু মানসিক বিকারগস্ত মানুষ। তারা তাদের নানাবিধ অশালীন ও অপ্রাসঙ্গিক মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে প্রচার করে যে  উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে  নারীবাদের চর্চা করা হয়, তার মূল সুর থেকে বিচ্যুত করার প্রচেষ্টা চালানো হয়। সেই সাথে বামপন্থী রাজনীতিকে প্রশ্ন করার অপপ্রয়াস।  কোনো আদর্শ অনুসরণকারীর ব্যক্তিগত  কর্মকান্ডের জন্য পুরো মতবাদটিই ভুল কিংবা প্রশ্নবিদ্ধ করা যায় না।  সর্বোপরি বিরোধীতার খাতিরে বিরোধীতা করতে গিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নব্য অতি বিপ্লবীদের নির্বোধ ট্রলের মাধ্যমে মেয়েটি সাইবার বুলিং এর শিকার হয়ে প্রতি মুহুর্তে যে আরো কতবার ভার্চুয়াল ধর্ষনের শিকার হচ্ছে সেদিকে কেউ দৃষ্টিপাত করছে না।

অভিযোগকারী নারী কালক্ষেপণ করে হলেও আইনের দ্বারস্থ যখন হয়েছেন, কামনা করি তিনি ন্যায্য বিচার পান। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের অভিযোগ প্রামাণিত হলে তাদের বিচার হোক। এই বিচারে অভিযুক্ত এবং সাজাপ্রাপ্ত হবে ভুল ও ক্ষতিকর ব্যক্তিরাই। অতএব, তাদের অনুসরণকৃত মতবাদ কিংবা আদর্শকে আপনারা আপনাদের স্যোশালবুলিং থেকে মুক্তি দিন। অপরাধীর পরিচয় শুধু মাত্র সে একজন অপরাধীই। সে তার অনুসরণকৃত আদর্শ বিচ্যুত বলেই সে অপরাধী।

637 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।