মহান একুশে ফেব্রুয়ারি থেকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস

বুধবার, ফেব্রুয়ারী ২১, ২০১৮ ১০:৫৩ AM | বিভাগ : দেশ/রাজনীতি


একুশে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২, বাঙালি জাতির ভাষা আন্দোলনের গৌরবোজ্জ্বল স্মৃতিবিজড়িত একটি দিন "মহান শহীদ দিবস" হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আজও আমাদের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয়ে আছে। কেনো বাঙালিদের এই মহান শহীদ দিবস থেকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস তা একমাত্র বাঙালিরাই পৃথিবীর মানুষদেরকে শোনাতে পারবে।

বাহান্নর ভাষা শহীদরা এখন আর শুধু বাঙালিদের শোক দিবস হিসেবে নয় বরং, সালাম, রফিক বরকত আর জব্বার এর অত্মত্যাগ এখন বিশ্ব গৌরবের সাথে স্মরণ করছে। জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ইউনেস্কো ১৯৯৯ সনের ১৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর প্যারিস অধিবেশনে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে এবং ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে দিবসটি জাতিসঙ্ঘের সদস্যদেশসমূহে যথাযথ মর্যাদায় পালিত হচ্ছে।

কেনো এই দিনটি আন্তর্জাতিক মাতৃবাষা দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে তা ইতিমধ্যে সকল বাঙালিদের জানার কথা, কিন্তু আমার দৃঢ় বিশ্বাস অনেক বাঙালিই এ ব্যাপারে সঠিক ইতিহাস জানেন না, তাই আমাদের দায়িত্ব এই দিনটির সঠিক ইতিহাস নতুন প্রজন্মকে জানানো। ২০০০ সনের প্রথম আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস শুরুর পর থেকে এর মাঝে ১৮ টি বছর পেরিয়ে গেছে সে হিসেবে মাতৃভাষা দিবস এখন পূর্ণবয়স্কতা লাভ করেছে। তাই এর প্রকৃত ইতিহাস আমাদেরকেই জানাতে হবে।

কানাডার ভ্যানকুভার শহরে বসবাসরত দুই বাঙ্গালি রফিকুল ইসলাম এবং আবদুস সালাম প্রাথমিক উদ্যোক্তা হিসেবে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণার আবেদন জানিয়েছিলেন জাতিসংঘের মহাসচিব কফি আনানের কাছে ১৯৯৮ সনে। সেই দুই বাঙ্গালিসহ আরো ৬ জন অন্য মাতৃ ভাষার মানুষ প্রস্তাব করেন যে, ১৯৫২ সনের ২১ শে ফেব্রুয়ারি যেহেতু বাঙালি জাতি তাদের মাতৃভাষাকে রক্ষা করার জন্য পাকিস্তানী শাসকের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম করে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষার স্বীকৃত মর্যাদা অর্জন করেছিলো তাই ওই বিশেষ দিনটিকে যদি সমস্ত মাতৃভাষাকে বিশ্বব্যাপী পালনের জন্য দিন ঘোষণা করা সম্ভব হয় তাহলেই হবে সমগ্র বিশ্বের প্রায় ৬ হাজার মাতৃভাষার প্রতি সন্মান প্রদর্শন। মহাসচিব কফি অনানের কাছে তারা আবেদন করেন যে বিশ্বের সমস্ত প্রধান এবং ক্ষুদ্রতর ভাষাগুলিকে রক্ষা করার বিশেষ প্রয়োজন রয়েছে, বিশেষত প্রায় বিলুপ্ত ভাষার সংরক্ষণ এবং সুরক্ষিত করা।

২৩ জানুয়ারী, ১৯৯৮ এ জাতিসংঘে জনসাধারণের তথ্য বিভাগের কর্মকর্তা হাসান ফেরদৌসের স্বাক্ষরিত একটি জবাব তারা পেয়েছিলেন এই মর্মে যে এই প্রস্তাবটি কেবলমাত্র কোনোও সদস্য রাষ্ট্রের মাধ্যমে উত্থাপিত হতে পারে, কোনো ব্যক্তি বা সংগঠন নয়। সেই থেকে তারা বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেন ও জাতিসংঘের কাছে আবেদন করার পরামর্শ দেন। বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জনাব আব্দুস সামাদ আজাদ তখন সরকারি ভাবে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ইউনেস্কো তে আবেদন করেন ২১ ফেব্রুয়ারি কে আন্তর্জাতিক মাতৃ ভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা দিতে। সেই আবেদনের প্রেক্ষিতে ইউনেস্কো তাদের সাধারণ সভায় ১৯৯৯ সনের ১৭ নভেম্বর সর্ব সম্মতিক্রমে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

২০০১ সনে বাংলাদেশ সরকার পরিবর্তন হওয়ায় বি এন পি সরকার আর এব্যাপারে জনগণকে কোনো তথ্য সরবরাহ করে নি এমনকি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ মিশনগুলো থেকে ও কোনো রকম তথ্য সরবরাহ করে নি। এব্যাপারে আমার একবার বার্লিনে বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সাথে বেশ মতানৈক্যের সৃষ্টি হয়। সেসময় ২০০৩ রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশ দুতাবাসে সকল বাঙালিদেরকে নিমন্ত্রণ করে প্রতিবছরের মতো ২০০৩ এর ২১ ফেব্রুয়ারীতেও হাত তুলে মুনাজাত করে মিষ্টিবিতরণ করে, এই নিয়ে বার্লিন দুতাবাসে রাষ্ট্রদূত মহোদয়ের সাথে আমার দারুণ বিতর্ক হয়, কারণ তিনি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস সম্পর্কে কোনো কিছু বর্ণনা না করেই অনুষ্ঠান শেষ করার সুযোগ খুঁজছিলেন, আমার বিরোধিতায় আরো ৩০ মিনিট অনুষ্ঠান চালিয়ে যেতে বাধ্য হন এবং আমি উপস্থিত বাঙালিদেরকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা সম্পর্কে বিশদ ভাবে বর্ণনা করি, বিশেষ করে তৎকালীন আওয়ামীলীগ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদের ও কানাডার দুই বাঙালির প্রশংসা করি।

এখনো কয়েকজন বাহান্নর ভাষা আন্দলনের সৈনিক বেঁচে আছেন বাংলাদেশে। ১২ বছর আগে আজকের এই দিনে ভাষা সৈনিক আবদুল মতিন কে পেয়েছিলাম জার্মানি তে এক স্মরণসভায়, মতিন ভাইয়ের সাথে সেটাই আমার প্রথম দেখা, আর গাজিউল হক ভাই আমাদের বাড়ির অতি আপনজন ছিলেন, সেই সুবাদে তাঁকে দেখেছি নিজের একান্ত পরিচিত জন হিসেবে।

মতিন ভাই মারা গেছেন ২০১৪ তে তিনি তাঁর দুই মেয়ের সঙ্গে মোহাম্মদপুরে থাকতেন। তার জন্ম ১৯২৬ সালের ৩ ডিসেম্বর, সিরাজগঞ্জ জেলার চৌহালী উপজেলার ধুবলিয়া গ্রামে। ১৯৫২ সালে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে নেতৃত্বের ভূমিকার জন্য তাকে ‘ভাষা মতিন’ নামেই চিনতো সারা বাংলাদেশ। আবদুল মতিন হলেন সেই ভাষা সৈনিক যিনি ১৯৪৮ সনে প্রথম ঢাকা কার্জন হলের, জিন্নাহর ভাষণ "উর্দু ই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা" এর প্রতিবাদ করে "নো নো" বলে গর্জে উঠেছিলেন, এবং তার পরেই শুরু হয় "রাষ্ট্রভাষা বাংলা" আন্দোলন।

গাজীউল হক হলেন সেই ছাত্রনেতা যিনি ২১ ফেব্রুয়ারী ১৯৫২ সোনার ছাত্র সভার সভাপতিত্ব করে সিদ্ধান্ত নেন ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে দু’জন দু’জন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মিছিল করে মেডিকেল কলেজের দিকে এগিয়ে যায়।

আবদুল মতিন এর মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। উল্লেখ, ভাষাসৈনিক আবদুল মতিন তার মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দান করে গেছেন। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এক চিঠির মাধ্যমে তিনি মরণোত্তর দেহদানের কথা জানান। ভাষা সৈনিকরা ও এমনি করেই নিয়মের মতন একের পর এক চলে যাবেন, বেঁচে থাকবে শুধু স্মৃতি আর সারা বিশ্ব ব্যাপী আন্তর্জাতিক মাতৃ ভাষা দিবস, এই দিন মিলাদ পরে মিষ্টি বিতরণের জন্য নয় বরং মাথা উঁচু করে গৌরবে বেঁচে থাকার দিন, বরকত, সালাম, রফিক জব্বার এদের রক্ত বৃথা যায় নি তাই এই দিনে কবিগুরুর ভাষায় গাইতে ইচ্ছে হয় - আজি প্রণমি তোমারে চলিব, নাথ, সংসারকাজে। তুমি আমার নয়নে নয়ন রেখো অন্তরমাঝে॥


  • ৬৩১ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

মোনাজ হক

সম্পাদক আজকের বাংলা ডট কম

ফেসবুকে আমরা