ফারহানা আনন্দময়ী

লেখক

মোহাব্বাত হ্যায়, ইসি লিয়ে তো জানে দিয়া; যিদ্‌ হোতি তো বাহো মে হোতি।

আমার ফেসবুকের বন্ধুতালিকায় যুক্ত অনেকেই সুতপা শিকদারের বিবৃতিটি, না, নিবেদনটি নিশ্চয়ই পড়েছেন এতোদিনে। পাঠের পরে কারো কারো, আমারই মতো, মনে হয়েছে নিশ্চিত, একটি বিস্তারি সম্পর্কে সঠিক সঙ্গী নির্বাচন করা অত্যাবশ্যক একটি বিষয়। বিস্তারি শব্দটার ব্যাখ্যায় ভিন্নতা আছে, থাকবে; তবে সবচেয়ে সোজা ব্যাখ্যা হলো, যে সম্পর্কে 'ভেন্টিলেশন' চমৎকার। এসব সম্পর্কে পারস্পরিক বোঝাপড়া আর বোঝাবুঝির আলো-হাওয়ার চলন খুব অনায়াস, সহজ পথে বয়ে যায়। গত চারদিন ধরে যতবারই ল্যাপটপ খুলছি, ওঁর নিবেদনটিতে দু'চারবার চোখ বুলাচ্ছি। এটা সত্যিই 'ম্যাজিক্যাল', এত পরিশীলিত স্বরে এতোটা বিস্তারে পৌঁছানো যায়!

তিনি লিখছেন, "আমি একে কী করে শুধুই ব্যক্তিগত শোক বলি! কী করে এ আমার শুধু একার হবে, যখন অগুনতি মানুষ ওঁর প্রস্থানকে নিজের ব্যক্তিগত কষ্টে জায়গা দিচ্ছেন ভালোবেসে!" ভাবা যায়, কতটা সংবেদনশীল আর উদারচিত্ত হলে; 'কপি রাইট'কে এক ফুঁয়ে বাতাসে উড়িয়ে দিয়ে, শোককে সকলের আপন করে দিলেন!

আবার তিনি লিখছেন, "আমি কিছু হারাইনি। পথ থেকে পথে এগোতে, এতদিন ধরে যা অর্জন করেছি, যা ওঁর কাছ থেকে শিখেছি, যা আমরা যৌথজীবন থেকে শিখেছি; সময় শুরু হলো তা প্রয়োগ করার।" সুতপা শিকদার, সম্পর্কের শেকড়ে কতটা যত্নে জল ঢাললে, আজ অতল-কেঁপে-ওঠা এক ভাঙচুর সময়ে এসে, আপনি এতোটা ঋজু উচ্চারণে দাঁড়িয়ে যেতে পারেন! বিস্মিত আমি, অভিভূত।

একখানে তিনি লিখলেন, "আমাদেরটা কোনো বিবাহ ছিলো না; যা ছিলো, তা হলো, 'ইউনিয়ন'... একটা মিলিত প্রয়াস।" সেই প্রয়াস যে কতটা সার্থক ছিলো, তা বোঝা যায়, সুতপার এই ভালোবাসাময় শক্তিশালী নিবেদন, ২৫ বছরের দাম্পত্যজীবনের প্রান্তে এসে। নির্ভুল ছন্দের বোঝাপড়া এবং বোঝাবুঝি, একইসাথে। রবীন্দ্রনাথকে কোথায় পড়েছিলাম এভাবে, "এক রকম ভালোবাসা আছে, যা তুলে ধরে, বড়ো করে; ইমোশনকে একটা রূপ দেয়। আর-একরকম ভালোবাসা আছে...আমাদের দেশে, যেটা মারে, চাপা দিয়ে দেয়। আমার মনে হয়, নারীদের কাছ থেকে আমরা যেটা পেতে পারতুম, তার অনেকখানি অপব্যয় হয়, কেবলমাত্র তার চোখের জলের সীমানার মধ্যে।" সুতপা ওঁর বেদনার সীমানাটা কী এক অদ্ভুত পরিমিতিতে আলোর সমুদ্র অবধি বিস্তৃত করে নিলেন।

সুতপাকে জানা আমার, এই পাঁচদিন। কী হয় জানেন তো, কিছু কিছু বিষয় সামনে আসে, যা হৃদয় এবং মগজকে সমান আদরে ধাক্কা দিতে থাকে। ওই যে খিল খুলে গেল একবার... আবার খিল তুলতে অনেকটা দিন সময় নেবে। সুতপা শিকদার নামের নারীটি এবং তাঁর এই নিবেদন, কার, কোথায়, কতখানি স্পর্শ করেছে জানি না, আমাকে ভাবিয়েছে, ভাবাচ্ছে।

শোকার্ত ছিলাম, ইরফানের প্রস্থান সংবাদে। তিনদিনের মাথায় সেই শোকই কেমন শক্তিদায়ী সান্ত্বনা হয়ে উঠলো সুতপার বার্তায়। হ্যাঁ, ইরফান আমার খুব পছন্দের অভিনেতা, এতো মেধাদীপ্ত অভিনয়, মুগ্ধ তো করবেই। হিন্দি ভাষার পাশাপাশি হলিউডে অভিনয়ের প্রেক্ষিতে বিশ্বও অনেকখানি জয় করেছেন তিনি। তো, এমন মানুষের সঙ্গী হওয়াটা সুতপার জন্য সৌভাগ্য এক অর্থে। তবে, এ ক'দিনে আমার মনে হলো, না, সৌভাগ্য যদি বলতে হয়, ইরফানও সমান ভাগ্যবান, সুতপাকে সঙ্গী হিসেবে পেয়ে। খ্যাতিই সব নয়, সুতপার এই যে মননের দ্যুতি, একে সঙ্গ দিতেও ইরফানকে অনেকখানি প্রস্তুত হতে হয়েছে, সেই নাটকের স্কুলজীবন থেকেই।

সেই যে প্রথমেই লিখেছি, একটা বিস্তারি সম্পর্কে সঠিক সঙ্গী নির্বাচন অতি জরুরি বিষয়। তাই-ই যদি না হতো, তাহলে, আমরা, ভক্ত, পাঠকেরা পেতাম না এমন একটি অর্ঘ্য। জরুরি বিষয়টির শর্ত পূরন হয়েছে ব'লেই, ইরফানের মতো এমন দুর্দান্ত মেধাবী এবং খ্যাতিমান অভিনেতা সঙ্গীর প্রস্থানে একজন লেখক জীবনসঙ্গী তো এমন নিবেদনেই সিক্ত করবেন, প্রিয়তম মানুষটিকে। দু'পক্ষেই সঙ্গী নির্বাচন সঠিক ছিলো বলে, ওঁদের সম্পর্কটি এমন বিস্তারি আর সমৃদ্ধ; আর তাতে করে আমাদেরই প্রাপ্তির পাল্লাটা ভারী হলো।

ইরফানের উচ্চারণে, "মোহাব্বাত হ্যায়, ইসি লিয়ে তো জানে দিয়া; যিদ্‌ হোতি তো বাহো মে হোতি।"... ইরফানের দৃষ্টিতে যে দৃপ্ত বিশ্বাস আর শেষ হাসিতে, বন্ধনেও মুক্তির যে আনন্দ... শুধু এটুকু দেখার জন্যই কত শতবার দেখেছি এই গানের দৃশ্য। কেনো যেন মনে হয়, এই সংলাপটুকু সুতপা শিকদারের ঠোঁটেও আরো বেশি মানিয়ে যাবে আজ।

1313 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।