কী সুন্দর এই মেয়েটা..

শুক্রবার, নভেম্বর ১৭, ২০১৭ ২:৩৬ PM | বিভাগ : সাহিত্য


যখন ঢাকা শহরে আসি তখন থাকবার জায়গা ছিলো না আমার। সেই একেবারে পাটগ্রাম উপজেলা থেকে সোজা ঢাকা। আমার বাবা বর্গা চাষী। বাবা যার জমি চাষ করতেন তার ছোট ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকেন।

ঠিকানা নিয়ে সোজা তার হলে। আমার জায়গা হলো সূর্যসেন হলের চারতলায় ভাইজানের রুমে। আমি ওনাকে ভাইজান ডাকি। আমাকে দয়া করে ফ্লোরিং করার সুযোগ দেয়া হলো। সারাক্ষণ ভাইজানের ফুট ফরমাশ খাটি। চা নাস্তা এনে দেই।

চা নাস্তা রুমে এনে দেয়া বা রুমে হিটার জ্বালিয়ে খিচুড়ি রান্না করতে আমার বেশ লাগতো। তবে খুব খারাপ লাগতো যখন ভাইজান বলতেন নীলক্ষেত ফার্মেসি থেকে কনডম কিনে আনতে। প্যাকেটটা নিয়ে মাথা নিচু করে ওনার হাতে দিতাম, উনি খ্যাক খ্যাক করে হাসতেন।

: কিরে সফদার নিবি নাকি?

আরো লজ্জায় মাটিতে মিশে যেতাম।

আমার দিনগুলো ছিলো থমকে থাকা, রাতগুলো ক্লান্তিহীন। ঢাকার সূর্য আমার সাথে পিচঢালা পথে হাঁটতো। কতোদিন ফিরে যাবার চিন্তা করছিলাম আমাদের বাঁধানো গ্রামে, স্মৃতির চোখের ভেসে থাকা অমলিন দিন।

এই ঢাকায় কি কি আছে?

আমার কাছে সবখানে ফাঁকি লাগে। ভাইজানের কাছে কতো ছেলেরা আসতো। বুঝতে পেরেছি উনি বড়মাপের নেতা। ওনার সাথে বেশ ক’জনের কাছে অস্ত্র দেখেছি। বেশ কয়েকবার আমাকে বলেছে;

: সফদারের বাচ্চা মালটা রাখত বিছানার নিচে।

ক্যাম্পাসে গোলাগুলি হতো, বোমা ফাটতো। ভাইজানের ছোটাছুটি বেড়ে যেতো। একদিন কিছু ছেলে আর্মস নিয়ে রুমে ঢুকে ভাইজানকে খুঁজতে আসে। না পেয়ে আমাকে নর্থ বেঙ্গল মফিজ বলে আচ্ছা মতো পেটালো।

ভেবেছিলাম জানে মেরে ফেলবে। মারলো না। হকি স্টিক আর চ্যালা কাঠ দিয়ে মনের সুখে আমাকে পিটিয়েছে। পরে পুলিশ এসে বহিরাগত বলে চালান করে দিলো।

অনেক খড় কাঠ তুষ পুড়িয়ে মুচলেকা দিয়ে ছাড়া পেলাম। ভাইজান অনেক টাকা পয়সা খরচ করলো থানা পুলিশ নিয়ে।

ছাড়া পাবার পরদিনই ভাইজান আমাকে খুব সুন্দর দেখতে একটা পিস্তল দিলেন। সূর্যসেন হলের বারান্দায় ভাইজানের এক শিষ্য আমাকে পিস্তল চালানো শেখালেন যত্ন করে। আমার ভালো লাগছে বেশ।

বারান্দা থেকে কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি করে সবাইকে চমকে দিলাম। ওরা সবাই আমার পিঠ চাপড়ে দিলো।

ফ্লোরিং থেকে বিছানায় ট্রান্সফার হলাম। ভাইজান ঢাকা কলেজের আশে পাশের দোকানের বখরা আমাকে ছেড়ে দিলেন। মরণচাঁদের দাদুর দোকানের মিষ্টি আমার জন্য ফ্রি।

ডাসের জসীম ভাই আগে আমাকে নর্থ বেঙ্গলের মফিজ ডাকত, এখন ডাকে সফট। সফদার থেকে সফট। সবাই চেনে আমাকে ভাইজানের ডান হাত, ক্যাম্পাসের সফট।

সেদিন ভাইজান রুমে নেই। মধুর কেন্টিনে মিটিং আছে। হলের দারোয়ান এসে আমাকে চিরকূট দিলো। দেখলাম একটা মেয়ের নাম লেখা। দারোয়ান বললো গেস্ট রুমে অপেক্ষা করছে।

পিস্তলটা পকেটে গুঁজে নিচে গেস্ট রুমে যাই। বিষণ্ণ সুন্দর মতো একটা মেয়ে। চিনতে পারলাম না। আমাকে দেখে উঠে দাঁড়ালো।

খুব অসহায় আর ভীত লাগছে মেয়েটাকে। আমাকে দেখে হাউমাউ করে উঠলো। চমকে উঠলাম। যা বললো তা হলো;

মেয়েটা প্রেগন্যান্ট। ভাইজান বলেছে অ্যাবরশান করতে। মেয়েটা মোটেও রাজী হচ্ছে না। মেয়েটা বলেছে ভাইজানকে বিয়ে করতে। ভাইজান বলেছে অ্যাবরশান না করলে মেরে ফেলবে তাকে।

মেয়েটা কাঁদছে, বলছে: সফট ভাই আমাকে বাঁচান।

সিদ্ধান্ত নিতে এক সেকেন্ড দেরি করলাম না। বললাম: চলো।

মেয়েটার হাত ধরেই দৌড় দিলাম। হল থেকে পালাচ্ছি। ঢাকা শহর থেকে পালাচ্ছি। কেউ না জানুক মনেরও তো কষ্ট আছে, সেই বেদনা লুকিয়ে রাখি হাজার ছলনায়। জীবন খাতায় ভুলের হিসাব পাতায় পাতায়...

ট্রেনটা ছুটছে। ছুটুক। মেয়েটা আমার কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে।

পকেটে পিস্তলটা ভীষণ ভারী লাগছে। অস্বস্তি লাগছে। আলগোছে পিস্তলটা পকেটে থেকে বের করে জানালা দিয়ে বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দেই।

ট্রেনের জানালা দিয়ে বাংলাদেশের সমস্ত লাবণ্য মেয়েটার মুখে এসে পড়ছে রোদ ছায়ায়।

কী সুন্দর এই মেয়েটা..

 


  • ৮৯৭ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

অপরাহ্ণ সুসমিতো

জন্মের শহর : সিলেট। বেড়ে ওঠা : সিলেট, রাঙ্গামাটি, চট্টগ্রাম। স্কুল জীবন থেকে লেখালেখির শুরু, কবিতা আর রবীন্দ্রনাথকে ভালবেসে । ক্লাস নাইনে পড়ার সময় মনে হয়েছিল বিপ্লব করবেন তাই নামের আগে যুক্ত করেছিলেন ‘আসাবিক’ অর্থাৎ ‘আমি সারকারখানা স্কুলে বিপ্লব করবো’। কিছুদিন আন্ডারগ্রাউন্ড সাহিত্য পত্রিকায় লেখালেখি চলছিল । গদ্য পদ্য দুটোতেই দৌঁড়-ঝাপ । আবৃত্তি খুব প্রিয় বলে কাব্যের সুষমা, শব্দ-উপমা, চিত্রকল্পের বেসুমার লাগামহীন টানের কারনেই হয়তো আলাদা করে রাখে অপরাহ্ণ সুসমিতোকে, স্নিগ্ধতায়। যদিও বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি ও কানাডায় প্রোগ্রামিং নিয়ে পড়াশোনা কবিতার রম্য প্রেম থেকে তাকে আলাদা করে রাখতে পারেনি । লালমনিরহাটে বছর পাঁচেক ম্যাজিস্ট্রেসি করেছেন, ত্রাণ মন্ত্রণালয়েও কিছুদিন। এখন কানাডার মন্ট্রিয়ল শহরে একটা সেল ফোন কোম্পানীতে কাজ করছেন। লেখালেখির বাইরে আবৃত্তি, অভিনয়, টেলি-জার্ণাল, বড়দের-ছোটদের নিয়ে নানা রকম সাংস্কুতিক কর্মকান্ডে সমান আগ্রহ । এক সময় গ্রুপ-থিয়েটার করতেন । একটা শর্ট ফিল্মে অভিনয় করেছেন । কাব্যগ্রন্থ : তুমি পারো, ঐশ্বর্য (২০১০), রাষ্ট্রপতির মতো একা (২০১৪) গল্পগ্রন্থ : চিড়িয়াখানা বা ফেসবুক ও অন্যান্য গল্প (২০১৬) প্রবচনগুচ্ছ : মিরর (২০১৬)

ফেসবুকে আমরা