মেয়েরা শোনো! জীবনের লড়াই জীবন থাকতেই করতে হয়

বৃহস্পতিবার, জানুয়ারী ১৮, ২০১৮ ১০:২৭ PM | বিভাগ : আলোচিত


কাল পূর্ণীমাকে নিয়ে লিখেছি। আজ পূর্ণিমাদের নিয়ে লিখবো, এই ধর্ষক নিপীড়কের সমাজে যারা বারবার ফিরে আসে ধর্ষকামী পুরুষের মৃত্যুদূত হয়ে আসে আমাদের সঞ্জীবনী শক্তি হয়ে।

আমরা তাদের খুঁজে পাই বনানীর হোটেল রেইনট্রীতে বন্ধুর জন্মদিনের পার্টিতে গিয়ে ধর্ষনের বিষাক্ত ভয়াল স্মৃতি নিয়ে ফিরে আসা মেয়েদের মাঝে। অস্ত্রের মুখে তাদের রাতভর ধর্ষণ করা হয়েছিলো, ভিডিও ছেড়ে দেয়া হয়েছিলো। একের পর এক উদ্ধত দম্ভোক্তি ও হুমকি দিয়ে গেছে ধর্ষক ও তার পরিবার। তবু নিজের সাথে বোঝাপড়া করে শেষ পর্যন্ত বিচারের দরজা পর্যন্ত পৌঁছুতে পেরেছিলো ওরা।

বিচার চাইতে গিয়ে আবার, বারবার, প্রতিদিন মুখে চোখে ধর্ষিত হয়েছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে। ওসি মামলা নেয় নি, থানা থেকে অপমান করে বের করে দিয়েছে। ছবি তুলে রেখেছে, এক সময় সে ছবি মিড়িয়ায় চলে এসেছে। সাংবাদিক লেলিয়ে দেয়া হয়েছে তাদের পেছনে। সেই পোষা সাংবাদিকরা তাদের বাড়ীর সামনে আসন গেড়ে বসেছে, ডিবি পরিচয় দিয়ে বাসায় ঢুকার চেষ্টা করেছে।

তবু প্রবল ক্ষমতাধর, উঁচুতলার প্রতিপক্ষের সাথে এই অসম সমাজে আইনের লড়াইটা শেষ পর্যন্ত চালিয়ে যাওয়ার মনোবল ধরে রেখেছিলো বলেই শেষ পর্যন্ত আসামী ধরা পড়েছে।

আমাদের ঘোর অমানিশায় পূর্ণিমা হয়ে আসে বনানীর নিচুতলার সেই মেয়েটির মাঝে যার খবর তেমন কোনো কাগজে আসে নি। গণধর্ষণের শিকার হয়ে এর চেয়েও ভয়ঙ্কর এক যুদ্ধ কিন্তু একা একা নিসঙ্গ ভাবেই করে গেছে করাইল বস্তির পোষাক কর্মি মেয়েটি। বখাটেদের হয়রানি থেকে বাঁচতে থানায় জিডি করেছিলো। কিন্তু থানা কেমন নিরাপত্তা দিয়েছিলো কে জানে! তার পরদিনই জুনায়েদ, নায়েব আলী, সোহাগ ও বালি নামের চার ধর্ষকের হাতে গ্যংরেপ এর শিকার হয় মেয়েটি। মুমূর্ষ অবস্থায় আট দিন চিকিৎসা নিয়েছে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে।

না, সেই মেয়েটিও আত্মহত্যা করে নি। বিচার চাইতে গেছে। বনানী থানা মামলা নেয় নি, গুনে গুনে সতেরদিন ঘুরিয়েছে। অপমান করেছে, থাপ্পড় মেরে, গলাধাক্কা দিয়ে, থানা থেকে বের করে দিয়েছে। কিন্তু দমে নি আগুন গেলা মেয়েটি। আদালতে গিয়েছে, আদালতের নির্দেশনা নিয়ে আবারো থানায় এসেছে মামলা করতে। থানা ১৪ দিন ঘুরিয়ে মামলা নিতে বাধ্য হয়েছে। এক মাসের বেশী সময় ধরে থানার বারান্দা, ওসির ধমক, ওসিসি’র চিকিৎসা, আদালতের দৌড়ানি, উকিলের ঘুরানি সব কিছুকে জয় করে মামলা নিতে বাধ্য করেছে ওইটুকু মেয়ে।

মেয়েরা শোন, এতোদূর পর্যন্ত এগুতে যে সাহস তোমরা দেখিয়েছো, কি ভীষণ ভয়ংকর অসম লড়াই তোমরা করে এসেছো, কী ভীষন দুঃখকে সয়েছো তা তোমাদের চাইতে ভালো কেউ জানে না। এতদূর পারার জন্য নিজেকে অভিনন্দন জানাও।

নিশ্চয়ই তোমরা বুঝে গেছো, আরো অনেক ভয়ঙ্কর নগ্ন নিপীড়ন তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। একবার ধর্ষণের শিকার হয়েছো বলে বারবার তোমাদের ধর্ষণ করতে চাইবে কামমোত্ত পুরুষ। জানোইতো, ধর্ষণের জন্য ধর্ষণের শিকার মেয়েকে দায়ী করার লোকের অভাব কখনো ছিলো না বাংলাদেশে, এখনো নেই। এই সমাজের পুরুষেরা আসলে ছলে কৌশলে ধর্ষকদের ক্ষমা করে, ধর্ষকের পক্ষে যুক্তি খোঁজে, যে কোনো অজুহাতে ধর্ষণকে জাস্টিফাই করে। কিন্তু ধর্ষণের শিকার হওয়া মেয়েকে ক্ষমা করে না এ সমাজ।

এদেশের বিচার প্রক্রিয়ায় তোমাদেরকেই প্রমাণ করতে হবে তোমরা ধর্ষিত হয়েছিলে। তোমাদের বারবার বর্ণনা দিতে হবে, তোমাদের প্রশ্নের ছুরিতে ছিঁড়ে খুবলে খাবে প্রতিদিন। এই অসভ্য দেশে আদালতে দাঁড়িয়ে তোমাদেরকে উত্তর দিতে হবে কেনো তোমরা পা ফাঁক করেছিলে? সেইসব রগরগে খবর ছাপাবে এদেশের গণমাধ্যম। তোমাদের বিবস্ত্র করে, ব্যবচ্ছেদ করে টিআরপি বাড়াবে।

আমরা জানি, তোমরা তখনো ভেঙ্গে পড়বে না। তোমরা অবিচল থাকবে। প্রবল উন্নাসিকতায় উড়িয়ে দেবে এসব জঞ্জালকে। কারণ, তোমরা সাধারন কেউ নও। তোমাদের ভেতরে ঘুমিয়ে আছে জ্যাকি ক্লার্ক, চিওমারা, লরেনা বববিট, সনেট ইহলারস এর পরমাত্মা, যাঁরা ধর্ষকামী পুরুষের সামনে মৃত্যুদূত হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। তোমরাই পালটে দেবে এই ধর্ষকামী সমাজের মানচিত্র।

তোমরা ইতিমধ্যেই প্রমাণ করেছো, যতো সম্পদশালীই হোক না কেনো, লড়াইটা শেষ পর্যন্ত চালিয়ে যেতে পারলে প্রতিটা ধর্ষককে আইনের মুখোমুখি হতে হয়। সেই পথটুকু এভাবেই লড়ে যাবে তোমরা। শেষ হাসি তোমরাই হাসবে। পা শক্ত করে দাঁড়িয়ে অস্বীকার করবে ধর্ষকামী এই চোরবালির সমাজ।

ফাইট মাস্ট বি গো অন, গার্লস। মেয়েরা, জীবনের লড়াই এভাবেই চালিয়ে যেতে হয়। জীবনের লড়াই জীবন দিয়ে করতে হয়, জীবন থাকতে করতে হয়। পথ চলতে ক্লান্ত হলে মনে করো, অসংখ্য মেয়ের মুক্তির জন্য এই লড়াইটা তোমরা করছো।

লড়াইটা তোমাদের, কিন্তু সাথে আছে অসংখ্য অগণিত সহযোদ্ধা। এ লড়াই তোমাদের থেকে আমাদের হবে। আমরা এক থেকে এক’শো হবো, অসংখ্য হবো, অগণিত হবো। এ দেশের প্রতিটি সচেতন সভ্য মানুষ তোমাদের পাশে আছে, জেনে রেখো। তোমরা হালটা কষে ধরে রাখো, পালটা আমরা ঠিক বেঁধে রাখবো।

"যদি মাতে মহাকাল, উদ্দাম জটাজাল 
ঝড়ে হয় লুন্ঠিত, ঢেউ উঠে উত্তাল,
হয়ো নাকো কুন্ঠিত, তালে তার দিয়ো তাল
জয়-জয় জয়গান গাইয়ো।"


  • ১৩৪৪ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

সাদিয়া নাসরিন

লেখক ও এক্টিভিস্ট

ফেসবুকে আমরা