আমাদেরকে যেভাবে অমানুষ বানানো হয়!

শুক্রবার, মার্চ ৮, ২০১৯ ৫:৪৪ PM | বিভাগ : দেশ/রাজনীতি


আমার বড় বোনকে বিয়ে দেয়া হয়েছিলো তেরো বছর বয়সে। তখন আমি যথেষ্ট ছোট ছিলাম। কিন্তু আমার মনে আছে, বিয়ে থেকে আপাকে বাঁচাতেে আমার মা তার মাথা টাক করে দিয়েছিলেন! বিধিবাম, বিয়ে ঠেকানো যায় নি, টেকোমাথায় হিজাব পেঁচিয়েই বিয়ে দেয়া হয়েছিলো বোনকে। দুলাভাই এবং তার পরিবার দেরি করতে রাজি ছিলেন না, তাই মাথা কামানোর পরে বিয়ের দিন তারিখ আরো এগিয়ে এনেছিলেন আমার বাবা এবং দুলাভাইয়ের তাবলীগী মুরুব্বি বাবা।

আমি যখন তেইশে বিয়ে করেছি তখন আমার স্ত্রীর বয়স ছিলো চৌদ্দ বছর! আমার শাশুড়ির বিয়ে হয়েছিলো এগারো বছর বয়সে। পীর বংশের মেয়ে তিনি। সমাজের সবার খুব শ্রদ্ধার চোখ পীর বংশের প্রতি। সমাজের সবাই চায় পীর বংশের মেয়েদের তাড়াতাড়ি বিয়ে হবে, মেয়েরা সবাই খাস পর্দা মেনে চলবে, তাদের অনেকগুলি বাচ্চাকাচ্চা হবে।
আমার নানা শ্বশুর বদর পীর সাহেবের একসাথে চারটে বিবি ছিলো (যদিও হিল্লা বিয়েসহ তার মোট বিবির সংখ্যা সাতটা ছিলো বলে শোনা যায়!) ওনার সন্তান সংখ্যা উনিশ, (ভালো করে গুনিস!) এই চারটে বউ থাকা নিয়ে আমার শাশুড়ি এবং তার কন্যার মধ্যে কখনো আপত্তি দেখি নি, কারণ এটি আল্লাহ’র পক্ষ থেকে জায়েজ করা। আল্লাহ’র জায়েজের ওপর প্রশ্ন তুললে ঈমান থাকে না!

এই যে বাল্যবিয়ে, এসবের বর-কনে, পরিবার, পাড়া প্রতিবেশী সবাই কি দোষী? আমি কি আমাকেও বাল্যবিয়ের কারণে দোষ দিতে পারি? কেনো আমি দোষী হবো? আমাকে আপনাদের সুশীল সমাজের লোকেরা মাদ্রাসায় পড়িয়েছে -অল্প বয়সী বিয়ে করার ফাজায়েল তথা উপকারিতা আমাকে পড়িয়েছে এবং লিখিয়েছে! 

আমার আত্মীয়স্বজন, আমার শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়স্বজন, অধিকাংশই এখনও তাদের মেয়েদেরকে বিয়ে দিচ্ছে ষোলো থেকে আঠারোর মধ্যে, আঠারো পেরোলেই পাপ থেকে বাঁচার জন্য তড়িঘড়ি করে বিয়ে দেয়া হয়। এসব অপরাধের দায়ভার কার? বিয়ের পর বছর যেতে না যেতেই কোলজুড়ে আসে সন্তান! 

আমার বাবা ছিলেন ঢাকার এক মসজিদের ইমাম। ছিলেন অসম্ভব রকমের প্রতিভাবান একজন মানুষ। ছবি আঁকা, গজল (ইসলামি সঙ্গীত) গাওয়া, কোরআন তেলাওয়াত করা, হাতের লেখায় তার ছিলো অনন্য প্রতিভা। তিনি নিজে নিজে কবিতাও লিখে ফেলতেন কখনো কখনো, যদিও সেসবের হেফাজত করা হয় নি। ধর্মের কারাগারে আবদ্ধ প্রতিভাগুলি গুমরে মরে মরেই শেষ হয়ে যায়, সেসব প্রকাশিত হয় না। আপনাদের সুশীল, হাসিনা-খালেদা মার্কা সেকুলারদের প্রতিপালিত আমি এবং আমার বাবা, এবং আমার  শিক্ষক আহমদ শফি, জুনায়েদ বাবুনগরীরা। আপনাদের সুশীলরা দেশী এবং সৌদি অর্থায়নে আমার ওপর, শফি রাজ্জাক বাবুনগরীর ওপর চাপাতি ধরে রেখেছে। চাপাতিতে ব্যর্থ হলে তখন ৫৭ ধারা নামের এক সুশলামির ধারাও রয়েছে! ধর্মকে অনুভূতিতে মাইগ্রেট করে অনুভূতি-সুরক্ষার নামে আপনাদের সেকুলার (?) রাজনীতিবিদেরা খাঁচায় পোষা হায়েনাকে (মোল্লাকে) খাঁচায়ই ভরে রেখেছে! কাউকে কামড়ানোর দরকার হলে তখন তাদেরকে সাময়িকভাবে খাঁচা থেকে রাস্তায় ছেড়ে দিচ্ছে! যেমন এখন রাশেদ খান মেননের বিরুদ্ধেে আপনাদের সুশীলেরা হায়েনাদের মাঠে নামিয়েছে। প্রচুর টাকাপয়সা উড়ছে হেফাজতে ইসলামের আঙিনা জুড়ে।

আমার বাবা কখনও প্রাণীর ছবি আঁকতেন না, কারণ সমাজের চোখে এটি অপরাধ। তিনি আঁকতেন প্রকৃতির ছবি। সমাজ আমার বাবার জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছে - জন্মনিয়ন্ত্রণ করা হারাম, গান গাওয়া হারাম, ছবি তোলা হারাম, গান শোনা এবং নাচ দেখা হারাম, জেহাদি ট্রেনিং ছাড়া সর্বপ্রকারের খেলাধুলা ও শরীরচর্চাও হারাম! আমার শ্বশুর হুজুর ছিলেন না, তিনি ছিলেন সরকারি অফিসার। চরমোনাই পীরের কড়া মুরিদ তিনি। মেয়ে হওয়ার পর শ্বশুর এবং শাশুড়ির মনের মধ্যে একান্ত আশা ছিলো, তাদের মেয়েকে একজন হক্কানী আলেমের কাছে বিয়ে দেবেন। তাদের আশা পূরণ হয়েও শেষে ভেস্তে গেলো -তাদের জামাইবাবা আলেম হওয়া সত্ত্বেও এখন একজন ইসলাম-ত্যাগী মুরতাদ! তারা ধোঁকাপ্রাপ্ত হয়েছেন। কে এর জন্য দায়ী? আমি? অমানুষ হওয়ার শিক্ষার সাথে বিদ্রোহ করে মানুষ হয়েছি, এটি কি আমার অপরাধ?

আমি অনন্য আজাদ নই, আমি হুমায়ুন আজাদের মতো আলোকিত মানুষের সন্তান নই। আমি আমার বাবার কাছ থেকে, শিক্ষকদের কাছ থেকে, প্রতিবেশ থেকে মানুষ হওয়ার কোনো শিক্ষা পাই নি। যা পেয়েছি তা শুধুই অমানুষ হওয়ার শিক্ষা। আমার বাবা পড়াশোনা করেছেন মাদ্রাসায়। মাদ্রাসায় কি শেখানো হয় তা আমরা সবাই জানি। কখনো কি ভেবে দেখেছেন, যে কুশিক্ষা পেয়েছেন আমার বাবা তার জন্য কে দায়ী? যে কুশিক্ষা পেয়েছে আহমদ শফি তার জন্য কে দায়ী? যে কুশিক্ষা গ্রহণ করেছেন আমার শ্বশুর তার জন্যেও বা কে দায়ী? কলেজে পড়াশোনা করেও ধর্মীয় যে কুশিক্ষা নিয়েছেন তিনি, এর জন্য কে দায়ী?

আমার যে শৈশবে ছবি আমার আঁকার কথা, গান শেখার কথা, রবীন্দ্র-নজরুল-জীবনানন্দ পড়ার কথা সে সময়ে আমাকে কি শেখানো হয়েছিলো? যে বয়সে আমার জীবে প্রেম, প্রকৃতি প্রেম, স্বাস্থ্য সচেতনতা, জনসচেতনতা শেখার কথা সে বয়সে আমাকে কি শেখানো হয়েছিলো? কলেজ-ভার্সিটির শিক্ষার মধ্যে থাকার কথা সেকুলারিজম, নৈতিকতা ও মানবিকতার কথা; কিন্তু সেখানেও কেনো হানা দিচ্ছে হিংসার শিক্ষা, সাম্প্রদায়িকতার শিক্ষা, অমানবিক হওয়ার শিক্ষা?

আর মাদ্রাসা? সে কথা কি বলতে? কি না শেখানো হয় সেখানে? জিহাদের বিজ্ঞান, নারী নির্যাতনের বিজ্ঞান, হিংসার বিজ্ঞান, মুর্খতার বিজ্ঞান শেখানো হয় সেথায়।

কে অর্থায়ন করছে এই মাদ্রাসা নামক কুশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে? কারা এখনো বানাচ্ছে এবং অর্থায়ন করছে এই কুশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে? কারা বানিয়েছে আহমদ শফি, বাবুনগরী, নিজামী, সাঈদী, রাজ্জাক, আমির হামজাদেরকে? হঠাৎ করে যদি আমির হামজার বোধোদয় ঘটে, সে যদি মানবতার কথা বলে, নারী পুরুষের সমানাধিকারের কথা বলে তাহলে কারা তাকে খুন করার জন্য অকাতরে টাকা ওড়াবে? আর যদি রাজ্জাকের বোধোদয় ঘটে, যদি সে নারীর স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলে তাহলে কে তাকে গ্রেপ্তার করার জন্য পুলিশ পাঠাবে?

অমানবিকতার পথ ছেড়ে মানবতার পথে হেঁটে চলেছি আমি, কিন্তু আমার জন্য আমার দেশ এখন হয়ে আছে মৃত্যুকূপ! আমি তো কোন ছার, কত আলোকিত মানুষের জন্যই তো এ দেশটা এখন মৃত্যুকূপ হয়ে গেছে? কে দেশটাকে আমার জন্য, আমার বন্ধুদের জন্য, সর্বোপরি সমস্ত আলোকিত মানুষের জন্য বসবাসের অযোগ্য বানিয়েছে? কে দেশটাকে সংখ্যালঘু, ভিন্নমতাবলম্বী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের জন্য বসবাসের অযোগ্য বানিয়েছে?

যে জঞ্জাল তৈরি করেছেন আপনি আপনার পূর্বপুরুষ, যে জঞ্জাল তৈরি করে চলেছেন আপনি বা আপনার নেতানেত্রীরা, সে জঞ্জালকে কি একটি ফুঁ দিয়েই উড়িয়ে দিতে চান? হেফাজত কি একদিনের তৈরি? কওমি জিহাদিরা কি একদিনের তৈরি? এটি কি শুধু বাংলাদেশেই তৈরি? কওমি সন্ত্রাসীদের মূল ঘাঁটি কি ভারতের দেওবন্দ নয়? তাবলীগী সন্ত্রাসীদের মূল ঘাঁটি কি ভারতের দিল্লীর নিজামুদ্দিন নয়? পৃথিবীর সব জিহাদিদের সব’চে মজবুত ঘাঁটি কি মক্কা, মদিনা, জেদ্দা এবং রিয়াদ নয়? ইসলামি জিহাদিদের যতটা শক্ত ঘাঁটি বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গও কি ততটা শক্ত ঘাঁটি নয়? পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী যদি ত্রিশ পার্সেন্টের লোভে ইসলামি সন্ত্রাসীদের মাথায় তুলতে পারে তাহলে নব্বই পার্সেন্টের লোভে শেখ হাসিনা বা খালেদা জিয়া কেনো দেশকে জিহাদিদের কাছে বর্গা দেবে না? তেলের জন্য যদি আমেরিকা সৌদি জঙ্গিবাদকে প্রশ্রয় দেয় তবে রাহুল গান্ধী মুসলিম পুরুষ ভোটারদের খুশি করতে তিন তালাকের আইন বাতিলের পক্ষে সওয়াল করবে না কেনো? মাসুদ আজহারের মতো ভয়ংকর জঙ্গির পক্ষে যদি চীন জাতিসংঘে তার ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করে তাহলে পাকিস্তান সন্ত্রাসের ডিপো হতে সমস্যা কোথায়? ভারতের মতো নামকাওয়াস্তের সেকুলার দেশে যদি ইসলাম ত্যাগ করে নাস্তিক হলে জেলখানায় যেতে হয় তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশে চাপাতি দিয়ে নাস্তিক কোপালে অসুবিধা কোথায়?

গুলশান হামলার আগ পর্যন্ত সন্ত্রাসী জাকির নায়েককে তোল্লাই দিয়েছে যে দেশ সে দেশে বারবার জিহাদি হামলা হলে আপনি অবাক হলেও আমি অবাক হই না!

শেষ কথা: মাসুদ আজহারের শিষ্যরা আমাকে এবং আমার মতো লাখো কওমি মাদ্রাসার ছাত্রদেরকে জিহাদী ট্রেনিং দিয়েছিলো। ২০০১ সালে ২০১৬ সালে মানবতার সামনের (?) সারির দেশ চীন জাতিসংঘে মাসুদ আজহারের পক্ষে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করেছিলো! এখনও মাসুদ আজহারের পক্ষে তাদের দরদ অত্যন্ত ঈর্ষণীয়!!

টীকাঃ স্বার্থ এবং এর সিদ্ধির জন্য আমাদের দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিকেরা দুর্ধর্ষ অভিনয় করেন - কখনও তারা শাহজাহান খানের মতো কিছুই দেখেন না, কখনও আবার গওহর রিজভীর মতো সবকিছুই দেখে ফেলেন!


  • ৫৪৮ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

ফেসবুকে আমরা