প্রিজনার অব তেহরানঃ মারিনা নিমাতের নির্মম উপাখ্যান - পর্ব ১

মঙ্গলবার, নভেম্বর ৭, ২০১৭ ১২:৫১ PM | বিভাগ : সীমানা পেরিয়ে


অগাস্ট ২৮, ১৯৯১ সাল।

ডানায় উজ্জ্বল রোদ মেখে পিয়ারসন বিমানবন্দরের রানওয়েতে নেমে এলো সুইস এয়ারলাইনের বিশাল বিমানটা। বাইরের অদ্ভুত সুন্দর একটা দিন অপেক্ষায় রয়েছে। বিমান থেকে নেমেই আকাশের দিকে চোখ গেলো মারিনা নিমাতের। বিশাল এক নীল চাদরকে দিগন্ত জুড়ে ছড়িয়ে দিয়ে উদাসিনভাবে দাঁড়িয়ে আছে ক্যানাডিয়ান আকাশ। মুগ্ধ বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে সে অপার এই নীলের দিকে। পারস্যের একটা প্রাচীন প্রবাদের কথা মনে পড়ে যায় তার। সেই প্রবাদে বলা হয়েছে, পৃথিবীর যেখানেই যাও না কেনো, আকাশের রং সব জায়গাতেই একই থাকে। টরন্টোর আকাশ দেখে মারিনার মনে হলো, প্রবাদটা আসলে ভুল। ইরানের যে আকাশ সে দেখে এসেছে আজন্ম জুড়ে, সে আকাশের সাথে এই আকাশের কোনো মিল নেই। এখানে আকাশের রং গাঢ় নীল, আকাশটাও অসীম, দিগন্ত পেরিয়ে চলে গিয়েছে দূর কোনো অচেনা ভুবনে।

জুরিখ থেকে ক্যানাডা আসার জন্য সুইস এয়ারে উঠেছিলো মারিনা। যাত্রা শুরু অবশ্য বুদাপেস্ট থেকে। সেখানেই আট মাস থাকতে হয়েছে পেপারওয়ার্ক তৈরি করার জন্য। ক্যানাডাই হতে যাচ্ছে তার এবং তার পরিবারের জন্য স্থায়ী ঠিকানা। সাথে রয়েছে প্রিয়তম স্বামী এ্যান্ড্রে আর তার কলিজার টুকরো একমাত্র সন্তান মাইকেল। মাইকেলের বয়স তিন বছরের চেয়েও কম। যে নরকময় জীবন ছিলো তার ইরানে, তেহরানের সবচেয়ে কুখ্যাত জেলখানা এভিনের যে বন্দিদশা ছিলো তার, সেগুলোকে ধুয়ে মুছে ফেলে সামনের দিকে এগোনোর স্বপ্ন নিয়ে জুরিখ এয়ারপোর্টে প্লেনের জন্য অপেক্ষা করছিলো সে।

তার মনের স্বপ্নকে সে মাইকেলের মাঝেও ছড়িয়ে দিতে চেয়েছে কিছুদিন ধরে। ক্যানাডা নামের এক অপূর্ব সুন্দর দেশের গল্প সে শুনিয়েছে মাইকেলকে। সেই সুন্দর দেশে শীতকালে অঝোরে তুষার পড়ে। সেই তুষার দিয়ে মাইকেল তুষার মানব বানাতে পারবে। গ্রীষ্মে সেই দেশ হয়ে ওঠে উষ্ণ আর সবুজ। নীল পানির লেকে মাইকেলকে সাতার কাটতে নিয়ে যাবে, এই প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে সে। এই সব গল্প শুনে মাইকেলের চোখ বড় বড় হয়ে উঠেছে উত্তেজনায়।

বোর্ডিং লাইনে মারিনার সামনেই এসে দাঁড়িয়েছিলো কয়েকজন ক্যানাডিয়ান ছাত্র।

“টরন্টোতে যাবার জন্য আমি অস্থির হয়ে আছি।” এদের একজন বলে।

“আমিও।” অন্য একজন বলে। “এখানে আমাদের সময় ভালোই কেটেছে। সবকিছুই ভালো এখানে। তারপরেও নিজের দেশের মতো আপন আর কিছু নেই।”

হাসিখুশি এইসব হোমসিক ক্যানাডিয়ান টিন এজারদের দেখে বুকের মাঝে জমে থাকা অনিশ্চিত উৎকণ্ঠাটা দ্রবীভূত হয়ে যায় মারিনার। ক্যানাডাতে নিশ্চিতভাবেই ভালো থাকবে সে, এই বিশ্বাসটা চলে আসে বুকের ভেতর। ওটাই হবে তাদের নতুন ঠিকানা। সেই নতুন ঠিকানায় জীবন হবে নিরাপদ এবং নিশ্চিত। এই নিরাপদ আশ্রয়ে সে আর এ্যান্ড্রে মিলে মানুষ করবে তাদের সন্তানদের। ইরানে যে অনিশ্চিত এবং অবরুদ্ধ জীবন তারা কাটিয়েছে, কিশোরী বয়সে যে বন্দিদশায় মৃত্যুকে হাতের মুঠোয় নিয়ে তাকে চলতে হয়েছে, যে ভয়াবহ যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে তাকে যেতে হয়েছে, যার অনেক অংশ এ্যান্ড্রেও পর্যন্ত জানে না, সেগুলোকে ধুয়ে মুছে ফেলার, অতীতের গর্ভে বিলীন করে দেবার সুবর্ণ এক সুযোগ এসে গেছে তার হাতে।

বিমানবন্দরে তাদের অভ্যর্থনা করার জন্য অপেক্ষা করছিলো তার ভাই। ভাইয়ের গাড়িতে করে পিয়ারসন থেকে বের হয়ে আসার পর জানালা দিয়ে বাইরে তাকায় মারিয়া। অচেনা দেশের বিশাল-বিস্তৃত এলাকা দেখে বিস্ময় বাধ মানে না তার। দুঃসহ অতীত এখন শুধুই অতীত। একে পিছনে ফেলে অচেনা, অজানা এই বিচিত্র ভূবনেই নতুন করে জীবন শুরু করতে হবে তাদের। নতুন এই ভূমিতে টিকে থাকার জন্য শরীরের সবটুকু শক্তিকে নিংড়ে নিয়ে ব্যবহার করতে হবে তার।

সেটা করতে কোনো আপত্তি নেই তার। এটা তার দ্বিতীয় জীবন। ভাগ্যের ফেরে পাওয়া আকস্মিক এক নতুন জীবন। দ্বিতীয় জীবনের সুযোগ সবাই পায় না। বিশেষ করে ইসলামি মৌলবাদীদের দ্বারা অবরুদ্ধ ইরানে এমন সৌভাগ্য খুব কম মানুষেরই হয়। মানুষের জীবনকে জ্বলন্ত এক জাহান্নাম বানিয়ে ছেড়েছে সেখানে একদল মধ্যযুগীয় মানসিকতার মোল্লা ।

 


  • ৬০৯ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

ফরিদ আহমেদ

লেখক, অনুবাদক, দেশে থাকা অবস্থায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। দীর্ঘ সময় মুক্তমনা ব্লগের মডারেশনের সাথে জড়িত ছিলেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায়ের অনুবাদ করেছেন। বর্তমানে ক্যানাডা রেভেন্যু এজেন্সিতে কর্মরত অবস্থায় আছেন। টরন্টোতে বসবাস করেন।

ফেসবুকে আমরা