মানুষের যৌন বিকৃতি ঘটে তার শারিরীক মগজে নয়, সামাজিক মননে

বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারী ৭, ২০১৯ ১২:৫১ AM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


Self-care বা আত্ম-যত্নশীলতা হচ্ছে, এমন সক্রিয় সচেতন উদ্যোগ, যা দুর্বিষহ আবেগগত অভিজ্ঞতা ও নানা রকম মানসিক চাপ থেকে আমাদের রক্ষা করতে পারে। মানসিক চাপের ফলে কেবল মনে নয়, শরীরেও অনেক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ঘটে। আমরা শারীরিক ভাবেও অসুস্থ্য হয়ে পড়ি।

মানসিক চাপ নেয়ার ক্ষমতা সবার সমান থাকে না। অনেকে অল্পতেই ভেঙ্গে পড়ে, আবার অনেকের স্নায়ু যাকে বলে ইস্পাতের মতো। তবে, সকলেরই একটি সহ্য মাত্রা আছে, যার বাইরে গেলে, যত শক্তিশালী স্নায়ু হোক, মানসিক চাপ স্বাভাবিক কাজে ব্যাঘাত ঘটাবে।

দুর্বিষহ মানসিক চাপ তৈরির ক্ষেত্রে ইদানিং ফেসবুকের অনেক সংবাদ/তথ্য ভূমিকা রাখে। যেগুলোকে আমরা বলি ডিস্টারবিং যা মানুষকে মর্মাহত, বিচলিত ও অসুস্থ্য করে দিতে পারে, এরকম দুঃসংবাদ। দুঃসংবাদ মানে যে প্লেন ক্রাশ হোল, বা জঙ্গি হামলায় মানুষ মারা গেলেঅ, কেবল এমন সংবাদই নয়। একজন স্ত্রীকে শারীরিক আঘাত করে তাঁর স্বীকৃতি আদায় করার ভিডিও কিংবা গতকাল দেখা একটি হিজাবি মেয়ে "ধর্ষণের জন্য দায়ী মেয়েরা যারা হিজাব পরে না" এই ধরনের পোস্টার নিয়ে জনসমক্ষে আসতে পারার অবস্থাও একটি মর্মঘাতী দুঃসংবাদ হতে পারে। দুঃসংবাদ হতে পারে ঢাবিতে হিজাব উৎসব, এই ২০১৯ সালে।

আজকের একজন মায়ের তাঁর কন্যা সন্তানের প্রতি যৌন সহিংসতার জন্য অসহায় আহাজারি, পুলিশের ভূমিকা, মিডিয়ার প্রশ্নের ধরন, -ইত্যাদি সংবাদের একটি ভিডিও আমাকে এতটাই বিচলিত করেছে যে, আজকের পরিকল্পনা মতো কোনো কাজ করার মানসিক অবস্থায় আর নেই।

মানসিক চাপ মোকাবেলা করতে বা Self-care করার জন্য, আমার নিজের একটি কৌশল হচ্ছে সমস্যাটিকে বোঝার চেষ্টা করা। এটি এক ধরনের কগনিটিভ থেরাপি। দুঃখের ব্যাপার, নারীর প্রতি সহিংসতা নিয়ে প্রত্যক্ষ গবেষণা, লেখা ও সেকেন্ডারি অনেক লেখাজোখা পড়ার ফলে, এই সমস্যাটির ব্যক্তিগত, মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অনেক দিক আমি জানি। আর জানি বলে, আগামী দশ বছর সামনে যখন তাকাই, যখন ট্রেন্ড এনালাইসিস করি, আমি আতঙ্কিত বোধ করি। আমি আরও অসুস্থ্ বোধ করি।

যে সামরিক কর্মকর্তা তাঁর বালিকা শিশুকন্যার প্রতি যৌন সহিংসতা করতে পারে, সে এই সমাজের একজন মানুষ। সে একটি সময়কালের মানুষ। সে একটি সংস্কৃতির (প্রান্তিক পুঁজিবাদী-ধর্মাশ্রয়ী) মানুষ। তার সন্তানের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গী, তার শোষণের ইচ্ছা, তার আত্মজের প্রতি সহিংসতার প্ররোচনা কি কেবলই মানসিক বিকৃতি? নাকি, এই সমাজে অধিকাংশ পুরুষের যে ইহকাল ও পরকালে নারীমাংসের লোভ, দুর্বলের (অভাজন শ্রেণি, কম বয়েসি, নারী, সন্তান) উপর ক্ষমতা চর্চাকে স্বাভাবিক ভাবা, সুযোগ পেলেই দুর্নীতি করা, সর্বোপরি সব কিছুকে "ভোগের" বিষয় হিসেবে ভাবতে পারা, -পুরোটাই এই সমাজের সাথে তার আন্তঃসম্পর্কের ফল নয় কি? এই বিকৃতির জন্ম তার শারীরিক মগজে নয়, সামাজিক মননে।

কিন্তু এই সামাজিক মননের সাথে শারীরিক মগজের একটি যোগ আছে। সম্প্রতি নিউরো ফিলসফি ও নিউরো বায়োলজি বুঝতে গিয়ে মানুষের নিউরনের (মস্তিষ্ক কোষ) একটি বৈশিষ্ট্যের কথা জানতে পারি। সেটি হচ্ছে, মানুষের চিন্তাধারার প্রভাব রয়েছে তাঁর নিউরনের কাঠামো ও কার্যকারিতার বিবর্তনের উপর। আমি যেভাবে বুঝেছি, ধর্ষকের প্রাথমিক ধারনাটি মগজে আসার পর সেটি তার নিউরনের চরিত্রকে বদলে দিয়ে তাকে ধর্ষক করে তুলবে। সে ধর্ষণের বিরুদ্ধে কিছু শুনলেও তার নিউরন সেটি প্রত্যাখ্যান করবে। এটির জেনেটিক প্রভাব আমি জানি না, কিন্তু এটি কারো স্থায়ী হয়ে গেলে সেটি হয়তো বংশ পরম্পরায় পরবর্তী পুরুষে পৌঁছে যাবে। আমরা কি ভয়ংকর ধর্ষক প্রজাতি পেতে চলেছি, চলমান শ্রেণি শোষণের ও পিতৃতন্ত্রের সহিংসতার কারণে।

অর্থাৎ, একটু যদি সরলীকরণ করি, আমাদের প্রচলিত অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতি যে মানুষের মননের ও আচরণের জন্মদিয়ে চলেছে, তা প্রধানতঃ লোভীর, অপরাধীর, দুর্নীতিবাজের এবং ধর্ষকের। সমাজে কি এই মননের লোকের সংখ্যা বাড়ছে? বিপরীতে, পরার্থপরতা, সমানুভুতি, যত্নশীলতার ও ভালোবাসার মননের মানুষের সংখ্যা কি কমছে? জানি না।

ব্যক্তি একটি সামাজিক সম্পর্কের যোগফল। সমাজকে বাদ দিয়ে ব্যাক্তির মনন ও আচরণ এবং সেই মনন ও আচরণের বিকৃতি ব্যাখ্যা করা যায় না। আশা করি, আমরা এই বিকৃতির মনন ও সামাজিক প্রেক্ষাপট -এই দুটো নিয়েই ভাববো এবং কিছু রাজনৈতিক উদ্যোগ নেবো।

আমার খুব খারাপ লাগছে। আমি এখন Self-care এর জন্য রবীন্দ্র সঙ্গীত শুনবো।


  • ৫০০ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

খান আসাদ

সমাজকর্মী

ফেসবুকে আমরা