তিয়ান পুতুই

লেখক এবং এক্টিভিস্ট।

মানবতাবাদ নয় নারীবাদ চাই

একজন নারীবাদী লেখকের একটি ফেসবুক পোস্টে নারীবাদ এবং মানবতা বাদ বিষয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু এড্রেস করা হয়েছে বিধায় এই পোস্টটা সম্পর্কে আমার নিজস্ব কিছু ভাবনা লিখার প্রয়োজনবোধ করলাম।

”কেউ যখন বলে, "আমার সামনে নিজেকে ফেমিনিস্ট বলে দাবী করবেন না, আমি মানবতাবাদী। "
তখন চিন্তায় পড়ে যাই।

অবশ্যই নারীবাদ মানবতাবাদের অংশ, কিন্তু বিষয় হচ্ছে, যখন হাজার বছরের সামাজিক কাঠামো, শুধু মাত্র লিঙ্গ পুরুষ না হওয়ার কারণে বৈষম্য শুরু করে। যখন ব্যক্তির জেন্ডার বা লিঙ্গ বা আচরণ নারী হওয়ার কারণে তার উপর নানান ভাবে নিপীড়ন ও শোষণ করে, তাকে বঞ্চিত করে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে, তখন অবশ্যই নারীবাদ নিয়েই কাজ করতে হবে।

ধরুন সাকিব আল হাসান এখন যদি বলে যে আমি ফেমিনিস্ট নই, সেই কথা ভুল হবে।
প্রতিটি পুরুষ যে তার স্ত্রী কন্যা বোন এবং মা কে ভালোবাসে, তিনি ফেমিনিস্ট।
মানুষকে ভালোবাসা মানে দয়া করে ছাড় দেয়া না, করুণা করা না। মানুষকে ভালোবাসা মানে মর্যাদার সাথে সেই মানুষটাকে সমতার দৃষ্টিতে দেখা।”

"মানবতাবাদী হলেই হয়, নারীবাদ লাগে না "এই বক্তব্যটা পুরানো একটা ক্লিশে। মানুষের চিন্তা, সময়, কর্মক্ষমতা ইত্যাদির কারণে মানুষ সীমিত কিছু বিষয়ে সময়ক্ষেপন করতে পারে আর মাথা ঘামাইতে পারে। কেউ যদি ভাবে-কেউ মানবতাবাদী হিসেবে নিজেকে দাবী করে মানে সে নারী, পুরুষ, শিশু, এলজিবিটকিউ, ক্লাইমেট চেঞ্জ, প্রক্সি যুদ্ধ, ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্স সব বিষয় নিয়ে এক জীবনে বলে শেষ করে ফেলবে- সেটা মোটেও প্র‍্যাক্টিক্যালও না। এখনকার দিনে বিজ্ঞানীরাও একগাদা টপিক কভার করতে পারেন না। এই প্রসঙ্গে রবার্ট স্যাপোলস্কির একটা কথা কোট করতেই হচ্ছে- 

Now the scientific arena is one in which a coherent picture of a problem emerges from the work of teams of people in dozens of laboratories, in which diseases often have multiple causes, in which biological messengers have multiple effects; in which a long, meandering route of basic research might eventually lead to clinical trials. The chances that one person can single-handedly bring closure to a biological research problem grow ever more remote.

স্যাপোলস্কি মনে করেন- একজন ব্যক্তির পক্ষে সম্পূর্ণ একা কোনো বায়োলজিকাল রিসার্চ প্রবলেম সমাধা করতে পারার সম্ভাবনা দিনকে দিন কমছেই। বর্তমানে রিসার্চারদের অনেকগুলা টিম লাগে একটা রোগের কারণ অনুসন্ধান করতে, বায়োলজিক্যাল মেসেঞ্জারের নানাবিধ ইফেক্ট শনাক্ত করতে এবং পরিশেষে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল অবধি পৌঁছাতে। 

ইমার্জেন্স থিওরিটা বোধহয় এখানে আনতেই হবে। ইমার্জেন্স হইলো এমন একটা ফেনোমেনা -যেখানে ছোটো ছোটো সরল কিছু কোনো জটিল ও বৃহৎ কিছু করে ফেলে যেটা কিন্তু ওই সরল ও ক্ষুদ্র গঠনমূলক এককের লিনিয়ার ইন্টার‍্যাকশান তথা যোগফলের থেকে আলাদা। 

এটা অনেকটা শ্রমবিভাজনের মতো- পিঁপড়ার কলোনীতে পিঁপড়ারা অনেক জটিল কিছু করে। আমরা প্রায়শই দেখি যে- পিঁপড়ারা একটা মড়া পিঁপড়াকে টেনে ওদের কলোনিতে নিয়ে যাচ্ছে। পিঁপড়াদের কোনো ক্লু নাই যে- ওরা কোনো শবদাহ করছে বা কার ফিউনারেল হবে? প্রত্যেকে মোটামুটি কোত্থেকে কই যাইতে হবে এই ধারনার বাইরে- মরা এক্সিস্ট্যানশিয়াল, ক্রাইসিস, মৃতদেহসৎকার ইত্যাদি সম্পর্কে কোনো ধারনাই রাখে না।

আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ প্রোটো-এমার্জেন্ট ফেনোমেনা হইলো উইজডম অফ দ্য ক্রাউড (একটি দলের জ্ঞান)। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় -কৌন বানেগা ক্রোড়পতি গেইম শোতে একটা অপশন ছিলো, কুইজার যদি কোনো গেইমের উত্তর না জানে তখন সে চারটা লাইফলাইন ব্যবহার করতে পারবে। তার মধ্যে একটা ছিলো যে অডিয়েন্স এর সাহায্য নেওয়া। যেটা প্রায়শই সঠিক হইতো কেননা অডিন্সদের উত্তরের গড় ৯১% সময় সঠিক ছিলো। 

আবার আরেকটা উদাহরণ বলা যায় একবার একজন বিখ্যাত পরিসংখ্যানবিদ একটা মেলায় এক ষাড়ের ওজন কৃষকদের আন্দাজ করতে বলেছিলো, যার আন্দাজ ঠিক হবে সে কোনো একটা প্রাইজ পাবে। কেউ সেই অমূল্য প্রাইজ পায় নাই- কেননা সকল কৃষক ষাড়ের ওজন ভুল আন্দাজ করছিলো। কিন্তু আশ্চর্যজনক বিষয় হলো যখন সকলের ওজনের গড় নেওয়া হলো তখন ষাঁড়ের সঠিক ওজন পাওয়া যাচ্ছে।

এভাবে দেখা গেছে কোনো একটা বিষয়ে এক্সপার্টদের আই রিপিট এক্সপার্টদের কালেক্টিভ নলেজ একিউরেট ফলাফল নিয়ে আসে যে কোনো একজন এক্সপার্টের পক্ষে একলা হাতে করা সম্ভব না- এটাই wisdom of the crowd ফেনোমেনা।

এইটা কেনো বললাম- মানবতার বিভিন্ন শাখাকে একক ও জেনারেল ফিল্ড থেকে আলাদা আলাদা ফীল্ডে ভাগ করে সেই ফিল্ডগুলা আলাভাভাবে কভার করে একত্রিত করলে বিষয়টা মানবতার জন্যই লাভজনক।

কিন্তু ফেসবুক সেলেবদের মধ্যে কোঅপারেশনের তুলনায় এটেনশানের মনোপলি হাতানোর একটা প্রচেষ্টা বরাবরই দৃষ্টিগোচর হইছে। এইজন্য একক নারীবাদীর থেকে আমার কাছে বরং বিভিন্ন নারীবাদী পত্রিকাকে বরং অধিক কার্যকরী মনে হয় কেননা যেখানে বিভিন্ন চিন্তার এবং অভিজ্ঞতার সমন্বয় হয়। 

এখন বলি কেনো "আমি নারীবাদী নই মানবতাবাদী" এই প্রচারণা চালায় মানুষ।

আমার ধারনা তিনটা কারণে- 

১) সাধারনের কাছে নারীবাদীদের ইমেজটা বেশ খানিকটা বাজে সেই ইমেজের হাত থেকে রক্ষা পাইতে। 

২) নারীদের যে নারী হয়ে জন্মানোর কারণে আসলেই কোনো সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় এই বিষয়টা অস্বীকার করতে। 

৩) নারীবাদীদের মধ্যে কোঅপারেশনের চেয়ে কম্পিটিশন জনিত কাঁদা ছোড়াছুড়ি বেশ খানিকটা বেশী, এই কাঁদা থেকে নিজেকে দূরে রাখতে।

আমি কেবল দুই নাম্বার পয়েন্টটা নিয়ে বলবো- নারীদের নারী হওয়ার কারণে যে পুরুষদের তুলনায় অধিক বৈষম্যের সম্মুখীন হইতে হয় এইটা অস্বীকার করে নারীবাদের প্রয়োজনীয়তাকে খারিজ করে দেওয়া খুবই অসাধু একটা এপ্রোচ।

ছোটবেলায় উচ্চমাধ্যমিকে একটা জিনিস পড়ছিলাম- "প্রকৃতিতে জৈব যৌগের প্রাচুর্যের কারণে জৈব রসায়নকে আলাদাভাবে পড়া হয়।" এবং রসায়ন দ্বিতীয়পত্র মোটামুটি জৈব রসায়নই। 

কোন ঘটনা হাই ফ্রিকোয়েন্সী(অনেক বেশী বার সংঘটিত)হইলে সেটাকে ক্যাটাগোরিতে ফেলাটা কোনো ভুল সিদ্ধান্ত না। নারীর প্রতি সহিংসতা আর বৈষম্য এত বেশী যে মানবতাবাদ টপিকের অধীনে এই ইস্যু কাভার করলে মেয়েদের সমান সুযোগ বা অধিকার কিছুই আসবে না, সর্বোচ্চ রেইপ আর চাইল্ড এবিউজ কমবে। ওয়েইজ গ্যাপ, জেন্ডার স্টেরিওটাইপগুলা ভাঙা, সম্পত্তিতে সমানাধিকার ইত্যাদি বিষয়গুলা বাদ পড়ে যাবে। উন্নত বিশ্বের অনেক দেশেই(স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলাতে)নারীবাদকে আলাদাভাবে স্টাডি করার খুব আহামরি দরকার নাই। কিন্তু বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে যেখানে উগ্র পিতৃতান্ত্রিকতা, অশিক্ষা, ডগমা আর প্রেজুডিসের অভাব নাই সে দেশে এটার প্রচন্ডভাবে দরকার আছে। 

রানী ম্যারি এন্টোনেটের সেই জনপ্রিয় মিথিক্যাল বাক্যটা মনে আছে? ফরাসী বিপ্লবের সময় ফ্রান্সে যখন দূভির্ক্ষ হয়, প্রজারা যখন খেতে পারে না, তখন ম্যারি এন্টোনেটকে বলা হয়- "মহারানী প্রজারাতো রুটিও খেতে পারছে না।" তখন ম্যারি এন্টোনেট উত্তর দেয়- "রুটি নেই? তবে ওদেরকে কেক খেতে বলো।"

বাংলাদেশের কিছু ফেমিনিস্টদের অবস্থা এমন যে বাংলাদেশের নারীরা যে রুটিও পাচ্ছে না এটা মনে থাকে না, তারা উল্টো নারীদের কেক খেতে বলতেছে প্রতিনিয়ত।

লেখাটা বড় হয়ে যাচ্ছে, শেষ করতে চাই লেখকের ভালোবাসার বিষয়টা দিয়ে। লেখক বলেছেন-

ভালোবাসলে মানুষকে নাকি মর্যাদার সাথে, সমতার দৃষ্টিতে ট্রীট করা হয়। এমন বাধ্যবাধকতা ভালোবাসায় আসলেই না। যুগ যুগ ধরে ভালোবাসা আর পুরুষাধিপত্য হাতে হাত রেখে চলছে। আমার তো ধারনা পুরুষেরা সেই সকল মেয়েদের অনেক বেশী ভালোবাসেন যারা তাদেরকে "বিশাল" বা "পুরুষ" ফিল করায় আর নিজে ঊনমানুষ সেজে বসে থাকে। সমতার ধারনাযুক্ত ভালোবাসা খুব বেশী মানুষের মধ্যে নাই। ভালোবাসা মূলতঃ সেক্সুয়াল আর কিঞ্চিৎ সাইলোজিক্যাল এট্রাকশান, মাঝে মাঝে বৈভবের লেনদেনও বটে। এখানে সমতার ধারনার কোনো বাধ্যবাধকতা নাই। প্রচুর ডমিনেটিং পুরুষেরা তার স্ত্রী কন্যাকে রাজরানীর মতো ধন সম্পদে চুবিয়ে রাখে, গদ গদ আহ্লাদে ভরিয়ে রাখে৷ অনেকে বলতে পারে ওটা প্রকৃত প্রেম না, আমি তা মনে করি না, নিজের উপার্জিত সম্পদ মানুষ মনের খুশিতে যারে তারে বিলায় না। ভালোবাসা মানেই সমতার ধারনা তা নয় কিন্তু ভালোবাসাকে আবেদন করে সমতার ধারনা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভবনাকে আমি সবৈর্ব সত্য বলে মনে করি। 

রেইপ আর চাইল্ড এবিউজ মানবতাবাদ কভার করলেও অন্য কোনো ক্ষেত্রে নারীদের উন্নয়ন নিয়ে তেমন শোরগোল হবে না বলেই আমি মনে করি -কেননা- নারী আর শিশুর প্রতি ঘটে যাওয়া দৃশ্যমান সহিংসতাকে পুরুষেরা প্রতিরোধ করে- তাদের হকের বা সম্পদের উপরে কেউ যাতে হামলা না চালায় এই মাইন্ডসেট থেকে। 

ব্যবহারিক অর্থনীতি খুব ভালোমতোই বুঝে মানুষ কতটা স্বার্থপর। যদিও তারা self interest কে স্যুগারকোট করে বলেন- optimizing behavior. মানুষ অবশ্যই নিরেট স্বার্থপর না তবে বেশ কাছাকাছি। 

স্টুয়ার্ট মিল এর একটা উক্তি ছিলো এমন- "পুরুষতন্ত্র পুরুষদের যতটা খারাপ হওয়ার সুযোগ দিয়েছে পুরুষেরা এতটাও খারাপ না, হলে পৃথিবী নরক হয়ে যেত। "পুরুষেরা মূলতঃ এতটা খারাপ হতে পারে নাই নারীর সাথে তার স্বার্থ জড়িয়ে যাওয়ার কারণে, খুব ক্ষুদ্র শতাংশ মানুষের মানবিক মোটিভেশন থাকতে পারে নারীদের পাশে দাঁড়ানোর কিন্তু বেশীরভাগেরই যেটা আছে সেটা হলো স্বার্থ।

1944 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।