মনজুরুল হক

লেখক।

পরীমনির বিচারক সমাজ

বাংলাদেশের মানুষের পার-ক্যাপিটা ইনকাম যদি সকল উন্নত দেশকে ছাড়িয়ে যায়। যদি ১০০% শিক্ষিতের হারও হয়। দেশে যদি দুধের নহর আর ক্ষীরের পাহাড় গড়ে ওঠে, তবুও দুটো সেক্টরে কোনোদিন উন্নয়ন ঘটবে না। এমনকি উপমহাদেশীয় তুলনাতেও নয়। তার একটি পর্যটন, আরেকটি চলচ্চিত্র। পর্যটন তো শেষ! জনসংখ্যা অনুপাতে বিশ্বের সবচেয়ে কম পর্যটক আসে এদেশে। এবার সেটাও বন্ধ হবে। পরীমণির কেসে বিশ্বের কাছে যে মেসেজ পৌছেছে তাতে বিদেশি পর্যটক এবার এদেশে আসার আগে দশবার ভাববে। আজকের বিষয় চলচ্চিত্র। আমরা জানি প্রায় ২৮ ধরণের শিল্পকলার সম্মিলনে একটা সিনেমা নির্মিত হয়। টিভি, ভিডিও, ইন্টারনেটের আগে এই সিনেমাই ছিলো সাধারণ মানুষকে সচেতন করবার, তাদের সুখ-দুঃখের কথা বলার এবং জীবনের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরবার অন্যতম মাধ্যম। সে কারণে ঋত্বিক ঘটক আক্ষেপ করে বলেছিলেন; “সিনেমা বানিয়ে যদি সাধারণ মানুষের কাছাকাছি না যাওয়া যেতো, তাহলে কবে এই সিনেমার পাছায় লাথি মেরে চলে যেতাম”!

সেই ২৮ ধরণের শিল্পকলার সম্মিলন এদেশে হয় না। বরং ২৮ ধরণের বিধিনিষেধ আর কালকানুন দিয়ে সিনেমার গলা টিপে ধরা হয়। যে কারণে তা কোনো সিনেমা হয়ে ওঠে না। তারপরও সাদাকালো যুগে যখন মোল্লাতন্ত্রকে সরকারীভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করা হতো না, সে সময় কিছু ভালো সিনেমা তৈরি হতো। রঙিন যুগে সব শেষ। কী কী কারণে ‘সব শেষ’ বলছি তা বিস্তারিত বলতে ঘেন্না করে। এখানে চুমু খাওয়া পাপ, বদনা নিয়ে পায়খানা করতে যাওয়া অসংস্কৃত। গর্ভবতীর পেট দেখানো গুনাহ। কিন্তু হাত-পা কেটে নেয়া, মুণ্ডু কেটে ব্যাগে ভরে উপহার দেয়া, পেটের মধ্যে তলোয়ার ঢুকিয়ে দেয়া বিভৎসতা নয়। ফুলে ফুলে টোকা দিয়ে পরাগায়ন দেখানো হয়। আবার জঘন্য শিৎকারধ্বণিতে ধর্ষণ দেখানো হয়। 

বিষয়-পরীমণি। পরীমণি খুব উঁচু দরের শিল্পী না হলেও হিপোক্র্যাট নন। বিশেষ করে খ্যামটা আর ঘোমটা আবরণের বদমাশদের কাতারের নন। এই মেয়ে মদ খায়। আর সেটা লুকিয়ে-ছাপিয়ে না। পুরুষের এবং পুরুষতন্ত্রে চোখে চোখ রেখে কথা কয়। সেটাই এই ক্ষমতাদর্পী শিশ্নসর্বস্ব পুরুষকুলের গাত্রদাহ। ধরা যাক পরীমণি সিনেমার কেউ নন। একটি গরিব পরিবার থেকে উঠে আসা অনাথ মেয়ে। যে নিজের চেষ্টা আর শ্রম দিয়ে এই পর্যায়ে উঠে এসেছে, যেখানে তার পাণিপ্রার্থী সমাজের তাবড় তাবড় টাকাঅলা ক্ষমতাবানরা। তাদের কাছে পরীমণি ‘সানি লিওনে’ কিংবা ‘মিয়া খলিফা’! তারা কারা? কেনই বা তারা মেয়েটাকে ধ্বংস করার জন্য জোটবদ্ধ হয়ে ‘যুদ্ধে’ নেমেছে? পরীমণি কি শিল্পের বারটা বাজিয়েছে? মোটেও না, কারণ এখানে তো শিল্পই নাই!

মেয়েটার বিরুদ্ধে কারা লেগেছে? তারা পাওয়াবেল্টর একটা একটা টুলস। ক্ষমতাবলয়ের গ্রহ-নক্ষত্র। ক্ষমতার রুলেতের আইভরি। কীভাবে? বোট ক্লাব কার? কীভাবে নদী দখল করে এই ক্লাব গড়ে উঠতে পারলো? কেনো নাসির ধর্ষণচেষ্টার আসামী হয়েও খালাস পেলো? কোনও কোনো টকশোজীবী সেলিব্রেটি সাংবাদিক আবার নাসিরের ভাড়া খাটতে নগ্নভাবে ময়দানেও নেমেছে। তা বাদেও আরেক শ্রেণি আছে যারা পরীমণির ধারেকাছে ঘেষতে না-পারার হতাশায় তার ধ্বংস কামনা করছে! এই সব প্রশ্নের উত্তর মিলবে- সরকারের ‘কৃপাদৃষ্টির’ বলে। ‘কৃপাদৃষ্টি’ কেনো? কারণ এরাই সরকারের প্রশ্নবিদ্ধ ন্যাক্কারজনক নির্বাচনে জেতানোর কুশিলব। এদেশে মোট ১০ টি সাধারণ নির্বাচন, জিয়াউর রহমানের নিকৃষ্টতম ‘হা-না’ ভোট, ৮৬ সালে এরশাদের পাতানো নির্বাচন, ২০০৬ সালে ইয়াজ উদ্দিনের নোংরা খেলার ইতিহাস প্রতিষ্ঠিত। এদেশে কখনওই ‘ফেয়ার ইলেকশন’ হয়নি। এর মধ্যে সবচেয়ে বিতর্কীত আর প্রহসনের নির্বাচন হয়েছিলো ২০১৮ সালে। সেই নির্বাচনে আমলা-পুলিশ-ধনাঢ্য ব্যাপারি আর পাওয়াবেল্টর প্রত্যেকটা টুলস ‘ভূমিকা’ রেখেছিলো। সেই তারাই এখন বোটক্লাব ধরণের এমিউজমেন্ট হাউস, রিসোর্ট, আর বাগানবাড়ি, শিল্পগোষ্ঠী এবং টর্চারসেলের মালিক। এরাই সেজান জুস। এরাই বোটক্লাব। এরাই গুলশান-বনানীর অভিজাত সব প্রমোদপ্রসাদের মালিক। তারা জানে সরকার ‘অকৃতজ্ঞ’ নয়। তাই তাদের সাহস কখনও কখনও সরকারের ক্ষমতাকেও ছাপিয়ে যায়। তাদেরকে জনগণের ট্যাক্সের টাকায় লালিত-পালিত রাষ্ট্রের পুলিশ যেভাবে তোল্লাই দিচ্ছে তা অভাবনীয়! যদিও হিসাবটা সিম্পল- ‘অবদানের অবদান’! কৃতজ্ঞতার পরাকাষ্ঠা!

আর তার নির্মম বলি একজন পরীমণি।

এফডিসি নামক প্রতিষ্ঠান চালায় দেশের নিয়মানুযায়ী মূর্খ, ধামাধরা, দালাল, অপদার্থের দল। তাদের নিয়ে একটি লাইন লেখাও সময়ে অপচয়।পার্শ্ববর্তী ভারতের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি যেটা বিশ্বের সবচেয়ে বড় আর ক্ষমতাধর, সেখানেও বহু বছর আগে থেকেই ডজন ডজন নারীকে পণ্য বানিয়ে শুষে-খেয়ে ছোবড়া করে রাস্তায় ছুঁড়ে দেয়া হয়েছে। কাউকে মেরে ফেলতে হয়েছে, কাউকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দিতে হয়েছে। আর সেই হারামজাদারা এইসব করেছে শিল্পের নামে, সংস্কৃতির নামে। এখানে এরাও তাই করে। তার আগে সরকারের কৃপা লাভের আশায় ক্ষমতাবানদের পায়ের শুকতলা চেটে পরিষ্কার করে!

দেশে মদ হারাম নয়। সরকারী কারখানাতেই মদ তৈরি হয়। লাইসেন্স দেয় যে পণ্যের তা নিষিদ্ধ তো নয়ই। পরী কেনো খায়? আইনের কোথায় বলা আছে মেয়েরা মদ খেতে পারবে না? মদ তৈরির ইতিহাস ২৬০০ বছর আগের। মুসলিম দেশেও মদের প্রচলন আছে। মালয়েশিয়াতে মদ নিষিদ্ধ, তবে পর্যটন জোনে সিদ্ধ। ক্লাব-বার সবই আছে। সৌদি আরবে প্রকাশ্যে দোকান না থাকলেও ঘরে ঘরে মদ আছে। লাইসেন্সের পরিমাণের বেশি থাকলে তার জন্য জরিমানা আছে। কিন্তু পরীমণিকে নিয়ে পুলিশ-র‌্যাব যা করছে তা আইন নয়। আইনের অতিব্যবহার।

আজকে শিল্পী সমিতি বা শিল্পী গোষ্ঠীর সবাই হাত-পা ধুয়ে সাফ-সুতোর হয়ে সাধু সেজেছেন। এদের অনেকেই আছেন এত গেলা গেলেন যে সাধারণ কথাও জড়িয়ে যায়। এদের প্রায় প্রত্যেকের ফ্রি-তে মদ গেলার অভ্যেস আছে। যে রূপসী নায়িকা, হাফ নায়িকা, এবং ‘পলিটিক্যাল নায়িকা’রা পরীকে সমাজের জন্য ক্ষতিকর বলে নসিয়ত করছেন তারা যে স্রেফ ঈর্ষা থেকে করছেন তা বুঝতে এ্যাস্ট্রোনাট হতে হয় না। তারাও মদ গেলেন। একজন যিনি দুই বাংলায় নাম করেছেন, তিনিও নসিয়ত করছেন। তার যে কত কী খেয়ে নেশা করার কাহিনী আছে…। একটা সমিতির কাজ কী? সরকারী অনুদানের জন্য সরকারী লোকজনের টয়লেট সাফ করা? তারা তাদের সদস্যকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে দোষী বলার সাথে সাথে রায় দেয়ার সাহস পেলেন কোথায়? তারা কি আদালতের দায়িত্ব পেয়েছেন? এই ভণ্ডগুলো, রস খোঁজা কথিত সাংবাদিক আর ক্ষমতাদর্পী প্রশাসন যা করছেন তা যে আইনসিদ্ধ নয় সেটা আদালতেই প্রমাণ করে। তারা এসব করছেন ‘রিভেঞ্জ’ থেকে, আর রূপালী জগতের নারীর প্রতি ঈর্ষায়।

এদেশে কখনও সিনেমা শিল্প হিসাবে গড়ে উঠবে না। এমনকি সাধারণ মানুষ যাদের একমাত্র বিনোদন এইসব বস্তাপচা নিকৃষ্ট গার্বেজ, তারাও এখন এসব ছুঁড়ে ফেলেছে। এটা কোনো ইন্ডাস্ট্রি নয়। এটাও একটা ‘বোট ক্লাব’ এর মত কয়েকজন ক্ষমতাবানের ‘বাগানবাড়ি’। এখানে সুবোধ বালিকা হলে তাদের কথামত কাপড় খুললে এক ধরণের অভ্যর্থনা, না খুললে আরেক ধরণের স্ক্রু-টাইট। তাই পরীমণি হোক বা অন্য যে কোনো নারী হোক, যারা নিজের পায়ে দাঁড়াতে গিয়ে ক্ষমতাবানদের ক্রিড়নক হওয়া থেকে বাঁচতে পারে না, তাদের পক্ষে এইসব ক্ষমতাবানরা থাকবেন না জানা কথা। তাই বলে সাধারণ মানুষ কেনো তাদের শ্রেণির পক্ষে থাকবেন না? চরম অনিশ্চয়তায় বেড়ে ওঠা অনাথ পরীমণি টাকা হওয়ার পরও কী তার অনাথ-দশা, তার নানা-নানি, গ্রামের বিয়ে অস্বীকার করেছে? না তো। আমি মনে করি যেসব ‘অপরাধে’ তাকে আটক করে তার নামে মামলা হয়েছে তার একটাও টিকবে না আইন যদি কারও ভয়ে ভীত না হয়। কোটি টাকা লোপাট, চিকিৎসা বিভাগের চরম ব্যর্থতা, লুটপাট, নদী চুরি, ভবন চুরি, ব্যাংক লোপাট, আকণ্ঠ দুর্নীতি, শত কোটি টাকার অবৈধ্য বাণিজ্য করে পার পাওয়া যেখানে ‘প্রচলিত’ সেখানে যে পরীমণি বা এই ধরণের তেজদীপ্ত কেউ পার পাবে না জানা কথা। তারা হয়তো পরীকে পঙ্গু কর্মহীন করে ছাড়বে। নতুন পরীমণি ম্যানুফ্যাকচার করবে….. সমাজে ইসলামের সাথে সাথে বোট ক্লাবও চলবে, বড় বড় ক্লাবে মদ-জুয়া চলবে আর কারখানায় শ্রমিক পুড়িয়ে ২৫ হাজার টাকায় রফা করা চলতে থাকবে….

এই সমাজ নিয়ে এত অহম আর পুতঃপবিত্রতার বড়াই কিসের আমাদের?

যারা পরীমণির কেক কেটে চুমাচুমি দেখে খিল্লি নিচ্ছেন তাদের জন্য এই ছবিগুলো। এফডিসির কলাকুশলীদের দরিদ্র শিশুদের নিয়ে ওর ২০১৯ সালের জন্মদিনের কেক কাটার দৃশ্য। ফিল্মের আর কোনো আন্টি বা আঙ্কেলকে দেখেছেন এভাবে জন্মদিন উদযাপন করতে?

356 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।