'মানি না মানবো না'-এদের মধ্যে আছে আপনার পরিবর্তনের দূত

মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০১৭ ১০:২৫ AM | বিভাগ : সমাজ/গবেষণা


আমার স্ত্রী আগেই এইটা নিয়ে আমার উপর রেগেছিলেন। কেন? যে বদমাশটা ঘরে বসে তারই সহকর্মী নারীকে নিচু ধরনের গালাগালি করতে পারে তাকে আমি বন্ধু বলেছি বলে, আর তাকে পেছনে লাথি মেরে ফেলে দিইনি বলে। তাই কি হয়! সমাজে চলতে গেলে কতো ধরনের মানুষের সাথে মিলে মিশে থাকতে হয়। চেপেচুপে কথা বলতে হয়। কতো কি। সকলে সেটা বুঝেন না।

আজকালকার পিচ্চি পিচ্চি মেয়েরা কিছু আছে, ওরাও সেটা বুঝবে না। কেউ ওদেরকে বাসে ট্রেনে অশ্লিলভাবে স্পর্শ করলে ওরা চিৎকার করে প্রতিবাদ করবে- স্পষ্ট অসংস্কৃত ভাষায়। কেউ ওদেরকে ইনবক্সে হ্যারাস করলে একদম ফটাফট স্ক্রিনশট মেরে দিবে- বোনাস হিসাবে সাথে একরাশ শুদ্ধ গালি। এদের কথাই হচ্ছে -মানি না, মানবো না। ভেঙে ফেলবো, চুড়ে ফেলবো, উপড়ে ফেলবো হাজার বছরের পুরনো শিকড়। আমি কপট ভ্রুকুঞ্চন করি

-যাহ্‌, এইসব কি ভাষা!

কিন্তু মনে মনে উল্লসিত হই। আমার চোখ চকচক করে ওঠে। আমার হাবড়া টাইপ বন্ধুরা গলায় হতাশা এনে বলে, বুঝলে ইমতিয়াজ -হবে না, কিসসু হবে না এখানে, আসছি- একটা হুইস্কি আনাও। আমি ওদেরকে বলি, না হুইস্কি তো ঠিকই আছে, কিন্তু কিসসু হবে না কেনো বলছেন। -কেনো বলছি? বলছি কারণ দেশের আনাচে কানাচে ঘুরে ঘুরে দেখেছি, দেশের মানুষের একটা বড় অংশ ইয়ে হয়ে গেছে। ইয়ে মানে? -ইয়ে মানে ঐযে, ইয়ে আরকি -বলদ রে ভাই বলদ। এরা সবকিছু মেনে নেয় -সবকিছু।

-বুঝলে ইমতিয়াজ, ওদের বিশাল আস্থা ঈশ্বরে, রাষ্ট্রে সরকারে আর সব প্রথা ও প্রতিষ্ঠানে। এরা দেশকে পাল্টাতে দেবে না। সবকিছু মেনে নিয়ে মেন্দা মেরে গেছে। পরিবর্তনের কথা বললেও ভয় পায়। হায় হায় করে, হাসিনা চলে গেলে হবে নাকি ওদের সর্বনাশ। হুম কথা ভুল বলেন নাই। কিন্তু তরুণদের দেখেছেন? কিশোর কিশোরী তরুণ যুবকেরা! না, বন্ধু বড় আশাবাদী হতে পারছেন না। ওরা যে সংখ্যায় বড় কম। তাছাড়া ওরা নাকি অতোটা সুশৃঙ্খল না। 'ওয়েল ডাইরেক্টেড' না ওদের কথা বার্তা কাজ কর্ম।

-না, কথা ঠিক আছে। ওরা সংখ্যায় কম। ওরা সুশৃঙ্খল না। ওয়েল ডাইরেক্টেড না গুরুজনদের মতো। মার্ক্সবাদ ওরা ঠিকমতো পড়ে নাই। পার্টির গুরুত্ব সংগঠনের গুরুত্ব ওরা বুঝে না। সবই ঠিক আছে। মানি। কিন্তু ঐ যে অল্প কয়েকজন আছে না! বেয়াদব বেমক্কা বেল্লিক ছেলেমেয়ে -অল্প কিছু। কিচ্ছু মানে না। কিচ্ছু কেয়ার করে না। ঐ যে পিচ্চি পিচ্চি ছেলেমেয়েরা, কথায় কথায় খালি বলে মানি না মানবো না। ভক ভক করে বিড়ি খায় আরও কি কি সব খায়। কাপড় চোপড়ের ঠিক নাই। কেউ কেউ আবার পিচ পিচ করে থুথু ফেলে।

-ওরাই আমাদেরকে রসাতলে যেতে দেবে না। ওরাই সভ্য আর ওরাই সভ্যতার অগ্রদূত। ওরা যতদিন থাকবে, আশা হারাবেন না, ওরা ঠিকই দেখবেন ঠিক সময়টাতে আমাদের দেশ ও সমাজের পেছনে লাথি মেরে সিধা করে দিবে। একদম। আমরা যারা বুড়ো আছি, আমরা তখন হা হা করবো -করে কি করে কি করে কি শয়তানেরা। ওরা তখন অট্টহাস্য দিয়ে বলবে, যা সভ্যতাকে পাল্টে দিয়ে গেলাম, বাতিলটা ভেঙে দিয়ে গেলাম। এখন এইগুলি নিয়ে করে খা আরও তিনশ বছর। পিছ ক্রে থুথু ফেলে যাবে আমাদের পেছনে।

-সংখ্যায় কম? ওরে বেকুব, বিপ্লব বলিস সভ্যতা বলিস অগ্রগতি বলিস পরিবর্তন বলিস, এগুলি কি ভোট দিয়ে আসে। সংখ্যা গুণিস শুধু। আরে কেরানী মিস্ত্রি করা আর সুদ তোলা লোক আর প্রোজেক্ট আর ইভেন্ট ম্যানেজ করা সাজুগুজু ছাগলারা পরিবর্তন আনবে? ওরা তো পরিবর্তনের বিপক্ষে। বই খুলে দেখেন। ঐ যে আপনার দাড়িওয়ালা সাহেব, তিনি ঠিকই দেখতে পেয়েছেন, গালে আর বুকে আর জামাতে সুগন্ধি মাখা আর সারা গায়ে তেল ঘষা সাহেব বিবিরা তো আলহামদুলিল্লাহ্‌ পার্টি। যেখানে যে অবস্থায় আছে সেইটাই ভালো সিস্টেম। ওদেরকে গুনতিতে ধরেন ক্যান? ওরা লাখ হলেও জিরো। আর আমার বেয়াদব মেয়েটা এক হলেও লাখ। আসেন, লড়ি।

-শোনেন, সাদা চোখে দেখলেই তো বুঝবেন। যীশু খ্রীস্ট কি এক লাখ ছিলেন? নাকি এক পিস ছিলেন? প্রফেট মুহাম্মদ? গৌতম বুদ্ধ? গ্যালিলিও গ্যালিলি? রুশো? মার্ক্স? লিস্টি বাড়াতে পারি। এরা কারা? যারা প্রচলিত প্রথা প্রতিষ্ঠান মানে নাই। বিশ্বাস মানে নাই। ভেঙ্গেছে। প্রচলিত প্রথা যারা মানে, ওদেরকে দিয়ে ঐটুকুই হবে- আরাম আয়েশ, সিস্টেম, গায়ে সুগন্ধি। মাঝে মাঝে দুই একবার কখনো কনডমবিহীন মিলনই ওদের কাছে বিরাট বিপ্লবী কাজ। ওদেরকে দরকার আছে বটে, ওয়েল, ইউরিনাল চিলমচি ঐসবও তো জরুরী জিনিস আরকি।

এই জন্যেই আমি পাগলা টাইপ ঐরকম ছেলেমেয়ে দেখলেই মুগ্ধ হয়ে যাই। ঈর্ষান্বিত চোখে তাকিয়ে থাকি- আহা যৌবন। ঐ যে মেয়েগুলি আছে না! ফটাফট ভরা মজলিশে মাসিক নিয়ে কথা বলে। ভদ্রলোকের মুখোশের উপর ছুড়ে দেয় নোংরা দুর্গন্ধ স্ক্রিনশট। আর ঐ যে বেয়াদব ছেলেগুলি- আপনাকে আমাকে ধুম করে প্রশ্ন করতে দ্বিধা করে না। কথায় কথায় লাফিয়ে নামে রাস্তায় আর আকাশে ঘুষি মেরে বলে 'মানিনা মানবো না'- এদের মধ্যে আছে আপনার পরিবর্তনের দূত। ওরা যেহেতু মানে না, সেজন্যেই ওরা ভাঙবে। যারা মানে ওরা কেন ভাঙবে?

আমি জানাজা মিলাদ শোকসভা শহীদ মিনারে লাশ ঐসব জায়গায় সাধারণত যাই না। যাই না তার একাধিক কারণ আছে। একটা কারণ হচ্ছে বুড়াদের মৃত্যু আমাকে শোকগ্রস্ত করে না। আমি ওখানে গিয়ে হাসি ঠাট্টা করতে থাকলে লোকে তো মারবে, সেইজন্যে আমি যাই না। বুড়োদের মৃত্যুও আমাকে কাঁদায় না- কিন্তু এইসব মানি না মানবো না ছেলেমেয়েদেরকে দেখলেই আমার চোখে পানি চলে আসে। আমি জানি এরা মরবে। আমাদের জন্যে বিপ্লব আনতে গিয়ে এইসব পাগলের দল মরবে, হাসতে হাসতে মরবে। মরবে, কিন্তু ভেঙে দিয়ে যাবে সবকিছু।

এরা না থাকলে হতাশায়ই মরে যেতাম।


  • ১৬৬৮ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

ইমতিয়াজ মাহমুদ

এডভোকেট, মানবাধিকারকর্মী

ফেসবুকে আমরা