চটকদারী আর বিকৃত শিরোনামে নয়, শিল্পীদের সঠিকভাবে উপস্থাপন করুন

মঙ্গলবার, মে ৭, ২০১৯ ৫:৩৮ AM | বিভাগ : প্রতিক্রিয়া


এই লেখাটার শুরু ঠিক কেমন হওয়া উচিৎ আমি জানি না কিন্তু এই টুকু অনুধাবন করতে পারছি যে শুরুটা হোক কৃতজ্ঞতা জানিয়ে। আমরা যারা ছোট বা বড় পর্দা, কিংবা খুব বড় অর্থে মিডিয়ার নানা মধ্যমে অভিনেত্রী, অভিনেতা তথা শিল্পী হিসেবে কাজ করি তাঁদের কাজগুলো সকল ধরনের দর্শকদের কাছে পৌঁছে দেবার জন্য সাংবাদিক বোনদের ও ভাইদের হৃদয়ের গহীন থেকে কৃতজ্ঞতা আর ভালোবাসা না জানালে সেটি অন্যায় হবে বলেই আমি মনে করি। আমি ব্যাক্তিগত ভাবে অতীতে প্রতিটি সময় আমাদের সাংবাদিক বোন ও ভাইদের এই কৃতজ্ঞতা জানিয়েছি এবং আজও জানাই এবং জানাবও।

আমাদের কাজগুলো, কাজের সংবাদগুলো গণমাধ্যম কর্মীদের হাত ধরেই সাধারণের কাছে পৌঁছে যায়। আমাদের কাজের সাথে দর্শকদের যে একটি সংযোগ তার শুরুটা সকল সম্মানিত সাংবাদিকদের হাত ধরেই সুনিপুনভাবে সামনে উঠে আসে। এর ফলে একজন শিল্পী যেমন বিকশিত হবার, নিজেকে ছড়িয়ে ধরবার বা মেলে ধরবার সুযোগ পান ঠিক তেমনি করে একজন সম্ভাব্য দর্শকের সাথে আমাদের এক ধরনের মৌন মিথস্ক্রিয়া এই সংযোগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়। দর্শকের সাথে শিল্পীর এই যে সংযোগ আর পরিচয়, তাঁদের কাজের পরিধি বা ব্যাপ্তির ব্যাপারে যে বিস্তর আলোচনা সেটি সংবাদকর্মীদের এমন সাহায্য ছাড়া শুধু শিল্পীদের পক্ষে রীতিমত অসম্ভব।

গণমাধ্যমে সাংবাদিকদের কি করতে হবে বা তাঁরা কি করবেন বা কি লিখবেন এটি নিয়ে নির্দেশকসূচক বা উপদেশ সূচক বক্তব্য দেবার মত সেই ঔদ্ধত্য আমি কখনোই করি না। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বলতেই হয় খুব হাতে গোনা কিছু সাংবাদিকদের হলুদ সাংবাদিকতা এবং একই সাথে কিছু সংবাদপত্রের উদাসীনতা আর তাদের “হিট হবার” কিংবা নিজেদের “চটকদার” করে পরিবেশন করাবার যে রুগ্ন চর্চা, এটি আমাকে ব্যাথিত করে। ইনফ্যাক্ট, নানা সময়েই আমি এর শিকারে পরিণত হই অথবা হচ্ছি।

সাম্প্রতিক সময়ে আমি একটি লেখা ফেসবুকে স্ট্যাটাস আকারে দেই। এই স্ট্যাটাস দেশের বেশ কিছু পত্রিকাতে পুনরায় প্রকাশিত হয়েছে। অতীতেও আমার ফেসবুক স্ট্যাটাস নানা সময়ে বাংলাদেশের নানাবিধ গণমাধ্যমে (সেটি প্রিন্ট বা ইলেকট্রনিক মিডিয়া, দুই যায়গাতেই প্রযোজ্য) প্রকাশিত হয়েছে, হচ্ছে এবং আশা করি হবে। প্রত্যেকটি সময়েই যারা আমার স্ট্যাটাসগুলো তাঁদের পত্রিকাতে প্রকাশ করেন, তাঁরা আমার অনুমতি নেন এবং আমার লেখাটির শিরোনাম কি হবে সেটি নিয়ে আমি একটি ধারনাও দেই বা বলা চলে এ নিয়ে আমরা কথা বলে ঠিক করে নেই। আমি খুবই আনন্দিত যে বেশীরভাগ সময়েই সেই পত্রিকাগুলো বা সম্মানিত সাংবাদিকেরা আমার এই অনুরোধগুলো রক্ষা করেন।

কিন্তু কিছু কিছু পত্রিকা মাঝে মাঝে একটি সামান্য ঘটনাকে এমন সব অদ্ভুত চটকদার শিরোনাম দিয়ে লেখেন যে সেই পত্রিকার বা সেই সুনির্দিষ্ট সাংবাদিকদের রুচিবোধ নিয়েই ভাবতে হয়। যেমন গত ২৪ শে মার্চ দেশের একটি অতি পরিচিত অনলাইন পত্রিকায় লেখা হলো “বালিতে ঘোড়ার পিঠে উত্তাপ ছড়ালেন পরীমনি”। এটা কী ধরণের শিরোনাম? পরিমনি তাঁর সদ্যবিবাহিত স্বামীর সাথে ইন্দোনেশিয়াতে ঘুরতে গিয়েছিলেন এবং তাঁর কিছু ছবি ফেসবুকে দিয়েছিলেন। কয়েকটি ছবিতে দেখা যাচ্ছিলো তিনি ঘোড়ার পিঠে চড়েছেন। ব্যস লেখার শিরোনাম হয়ে গেলো, “বালিতে ঘোড়ার পিঠে উত্তাপ ছড়ালেন পরিমনি”। কি অদ্ভুত! কি অভিরুচি!!

আবার চিত্র নায়ক শাকিব খান আর অপু বিশ্বাসের যুগল জীবনের টানপোড়োনের সময় দেখেছি অনেক সংবাদপত্রের সাংবাদিক অদ্ভুত সব শিরোনাম দিয়ে সংবাদ প্রকাশ করে সেই কষ্টের অধ্যায় থেকে নিজেদের পত্রিকার কাটতি বাড়াবার জন্য ফায়দা নিয়েছেন। সেই নোংরা ভাবনা থেকে মুক্তি পাননি তাঁদের ইনফ্যান্ট শিশুটিও।

হুমায়ুন আহমেদ তাঁর কোনো এক বইয়ে এই নিয়ে বেশ রসিকতা করে লিখেছিলেন(যতদূর মনে পড়ে “কাঠপেন্সিল” নামের বইতে, লেখার নাম “নিষাদনামা”) ছেলে নিষাদ তাঁর ঘাড়ে উঠেছে, তাঁকে নিয়ে ঘোড়া ঘোড়া খেলবে। নিষাদ পিতার ঘাড়ে উঠেছে, হুমায়ুন আহমেদ ঘোড়া হয়ে হামা দিচ্ছেন। তাঁর স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন ঠিক এই মুহুর্তের একটি ছবি তুলতেই হুমায়ুন আহমেদ বললেন, "এই ছবিটি মানবজমিন পত্রিকায় পাঠিয়ে দাও। বহুদিন তাঁরা আমাকে নিয়ে সংবাদ করতে পারছে না। সংবাদের শিরোনাম হতে পারে, “হুমায়ুন আহমেদ এখন ঘোড়া”। সে সময় লেখাটি পড়ে হাসলেও এর ভেতরের কষ্টটি আসলে তখনো বুঝতে পারিনি আজ যেভাবে বুঝতে পারছি।

আমার শেষের যে ফেসবুক স্ট্যাটাসটি পোস্ট করেছিলাম সেটির ক্ষেত্রে একটি দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছে। দুঃখজনক বলছি নানা কারনেই। হলুদ সাংবাদিকতার মানসিকতা, রুচিবোধের পতন, অপেশাদারী আচরণ আমাকে দুঃখ দিয়েছে।

দেশ রূপান্তর নামে একটি পত্রিকা আমার সেই স্ট্যাটাসটি গতকাল তাঁদের পত্রিকায় প্রকাশ করেছেন এবং প্রকাশ করবার সময় আমার অনুমতি নিয়েছেন। কিন্তু দুঃখের ব্যাপার হচ্ছে এই স্ট্যাটাসটি নেবার সময় আমি তাঁদের সাংবাদিক সাহেব সুদীপ্ত সাঈদ খানকে (যিনি আমার স্ট্যাটাসটি নিয়ে সংবাদ প্রকাশে আগ্রহী হয়েছিলেন) সুনির্দিষ্টভাবে অনুরোধ করেছিলাম যাতে করে একটি ভালো শিরোনাম তাঁরা দেন। ভালো বলতে স্বাভাবিক ভাবে আমি আমার লেখার সাথে প্রাসঙ্গিক ও অর্থবহ একটি শিরোনাম দিতে বলেছিলাম কেনোনা একটি লেখার শিরোনাম আমার কাছে বরাবর-ই গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এই ব্যপারে আমি সব সময় অত্যন্ত মনযোগী থাকি ও সতর্ক থাকি।

আমার এই শিরোনাম বিষয়ে এত সুনির্দিষ্ট করে বলবার কারণ হচ্ছে অতীতে আমরা দেখেছি বিভিন্ন ব্যক্তির লেখা নিয়ে এমন সব শিরোনামে লেখা প্রকাশ করা হয় যেখানে সেই শিরোনামের সাথে লেখার মিল তো থাকেই না বরং লেখার পুরো অর্থকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করে ফেলে।

তো সেই সাংবাদিক সাহেব আমার লেখাটি প্রকাশ করলেন ঠিকই আর ভালো(!) শিরোনাম তিনি দিয়েছেন “আমরা শরীর ঢাকলে আপনারা বিনোদিত হবেন কি করে?” শীর্ষক বাক্যে। শিরোনামটি দেখেওই আমার মনে হলো এই সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে একটি চটকদার সংবাদ অর্থে আমার লেখাটিকে ব্যবহারের মাধ্যমে এবং লেখাটির অন্তর্নিহিত অর্থ এখানে সামান্যতম প্রাধান্য পায়নি বরং পত্রিকার কাটতি বাড়ানো আর একদম আনপ্রফেশনাল আচরণ এখানে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এই লেখাটি লিখবার আগে আমি সেই সাংবাদিককে জিজ্ঞেস করেছি যে আমি এই ধরনের কথা সুনির্দিষ্টভাবে কোথায় বলেছি? এবং আমি তৎক্ষনাত তাঁকে এই শিরোনামটি পরিবর্তনের অনুরোধ জানিয়েছি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে সেই সাংবাদিক আমার এই অনুরোধ এখন পর্যন্ত রাখেননি এবং আমার অনুরোধের প্রেক্ষিতে একটা জবাব দেবার প্রয়োজনও বোধ করেননি।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমার লেখাটিতে তিনি আমার বেশ কিছু ছবিও ব্যবহার করেছেন যেগুলো এই লেখার ক্ষেত্রে খুবই অর্থহীন এবং অপ্রাসঙ্গিক। সাংবাদিক সাহেব তাঁর লেখার শিরোনামের মতই আমাকে মূলত চটকদার করে ব্যবহার করতে চেয়েছেন। এতোটুকুন সম্মান, এতোটুকুন প্রাসঙ্গিক হবার মতো পেশাদারিত্ব তিনি দেখাতে পারেননি।

দেশ রূপান্তর পত্রিকার মত একটি পত্রিকা যাদের আমরা প্রমিজিং বলতে পারি, সম্ভাবনাময় বলতে পারি এবং বলতে পারি আমাদের গণমাধ্যমে একটা নতুন অর্থবহ সংযোজন; সেই পত্রিকা যখন তাঁর চলার শুরুতেই চটকদার ও অপেশাদার সাংবাদিকদের এমন কাজকে রিভিউ-এর আওতায় না আনেন কিংবা এইসব অপেশাদারিত্ব মনোভাবকে প্রমোট করেন, তখন ব্যাথিত না হয়ে উঠবার কোনো কারণ আমি খুঁজে পাইনা।

আমার লেখাটি আমি লিখেছি কাদের জন্য, কিসের জন্য কিংবা এই লেখায় এক ধরনের মৌন সারকাজম ছিলো, মৌন হতাশা আর যাতনা, মৌন বিষাদ ছিলো, সেগুলো ছাপিয়ে প্রধান্য পেলো আমার কিছু ছবি আর একটি উদ্ভট শিরোনাম। সোজা কথা আমাকে আমার লেখা দিয়ে নিজেদের উদ্দেশ্যে বিক্রির সকল রকমের প্রচেষ্টা। তাঁদের দেয়া শিরোনামের মতই যেন নিরব ভাবে তাঁরা বলছেন, “আপনাদের লেখা বিকৃত করে না ছাপালে বেঁচে থাকব কী করে?”

আমি এই লেখার শুরুতেই কৃতজ্ঞতা জানিয়েছি আমাদের সকল সাংবাদিক বোন আর ভাইদের এবং সে কারণগুলোও উপরে আমি কিছুটা ব্যাখ্যা করেছি। ফলে আমি শুধু ক্ল্যারিফিকেশনের কারনে আবার বলছি সব সাংবাদিক বা পত্রিকার বিরুদ্ধে আমার এই বক্তব্য বা অভিযোগ নয় একেবারেই। আমাদের দেশের বেশীরভাগ সাংবাদিকরা যে পেশাদারিত্ব, নিষ্ঠা আর বন্ধুৎপূর্ণ একটা আচরণের ক্ষেত্র আর পরিবেশ গড়েছেন সেটির জন্য আমি অন্তত অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে তাঁদের প্রতি সবসময় কৃতজ্ঞ। কিন্তু দুঃখ লাগে যখন দেখি কিছু অবিবেচক, অপেশাদার, দায়িত্বজ্ঞানহীন সাংবাদিকদের জন্য অন্য আরো দশজন সাংবাদিকদের কথা শুনতে হয়, মানুষের সমালোচনা শুনতে হয়; সেটি দেখে।

পরিমনি ঘোড়ায় চড়ে বালি উত্তপ্ত করেছেন বলে যারা মনে করেন, হুমায়ুন ঘোড়া হয়েছেন বলে যারা মনে করেন কিংবা আমরা শরীর না দেখালে অন্যরা বিনোদিত হবেন না, এই কথা বলতে বা লিখতে যারা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, তাঁদের আসলে বলবার কিছু নেই। কি-ই বা বলা যায় তাঁদের। শুভ বুদ্ধির উদয় হতে যে পারিবারিক শিক্ষা, বা রুচির বিকাশ ঘটাবার জন্য যে সংস্পর্শ বা পড়ালেখা দরকার সেটি মুকুলেই কারো না হলে আর আসলে একটা বয়সে গিয়ে হয়না। জোর করে কি রুচি তৈরি হয়? ভব্যতা তৈরি হয়? নাকি হতে পারে?

হয়না...হয়না...

Twisting someone’s statement is not excused under #Freedom_of_Expression.


  • ৪০০ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

মাকসুদা আক্তার প্রিয়তি

সাবেক মিস আয়ারল্যাণ্ড

ফেসবুকে আমরা