জয়গুনরা যেন হেরে না যায়

শনিবার, মার্চ ৯, ২০১৯ ৫:২৩ AM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


শহরে এখন ঘটা করে পালিত হয় ৮ই মার্চ। মেয়েরা পার্পেল কালারের শাড়ি পরে সেজেগুজে নানা অনুষ্ঠানে যায়। নারী স্বাধীনতা আর অধিকার নিয়ে তারা কতো কথাই না বলে। মোটর শোভাযাত্রা, মিছিল মিটিং আর কতো কিছু হয়। এই দিনে কিছু প্রতিষ্ঠান নারীকর্মীদের একদিনের জন্য জন্য ‘বস’ হওয়ার সুযোগ দেয়। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান নাকি নারীকর্মীদের নারী দিবসের দিনে ছুটিও দেয়। তাই বলে নারীরা এখন অনেক বেশি অধিকার পাচ্ছে বা অধিকার সচেতন হয়েছে এমনটি কিন্তু নয়।

এখনও এই দেশে নারীশ্রমিকরা পুরুষদের তুলনায় অনেক কম মজুরি পায়। দেশে এমন অনেক প্রতিষ্ঠান আছে যেখানে যোগ্যতা থাকা সত্যেও নারীদের প্রমোশন হয় না, কেবল নারী বলেই। এখনও বাসে উঠার সময় নারী যাত্রীদের শুনতে হয়, ‘অই লেডিস উঠাইস না, মহিলা সিট নাই।’ এখনও কত গৃহবধূকে হত্যার পর ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে দেয়া। এখনও এই দেশে একজন কন্যাশিশু জন্ম দেবার কারণে মাকে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে হয়। প্রতিদিন যে কত মেয়ে বইখাতা ফেলে খুন্তী হাতে তুলে নেয় তারই বা খবর রাখে কে! তবে তারপরও নারীদের এগিয়ে যাওয়ার পথে তারাই কিন্তু আমাদের পাথেয়। তাদের সংগ্রামের গল্প শুনে বহু মেয়ে আন্দোলিত হয়, স্বপ্ন দেখে। এমনই এক হার না মানা নারী জয়গুন।

যদিও আজ তার নিউজ করতে করতে আমার কেবল সূর্য দীঘল বাড়ি উপন্যাসের জয়গুনের কথাই মনে পড়ছিলো। এই উপন্যাসটা নিয়ে সিনেমা হয়েছে যেখানে অভিনয় করেছিলেন প্রখ্যাত অভিনয় শিল্পী ডলি আনোয়ার। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের ওপর রচিত আবু ইসহাকের উপন্যাসের নায়িকা জয়গুন গ্রামের একজন সহজ সরল নারী। স্বামী পরিত্যক্তা এই নারী নিজের ছেলেমেয়েদের নিয়ে একা একটা নিরিবিলি শান্তিময় জীবন কাটাতে চেয়েছিলো। কিন্তু সমাজের লোভী পুরুষেরা তাকে সেই স্বপ্ন পূরণ করতে দেয় নি। একদিন সব কিছু ছেড়ে তাকে চলে আসতে হয়েছে ছেলেমেয়েদের হাত ধরে অজানা গন্তব্যে।

আমাদের এই জয়গুনকেও বিতাড়িত করা হয়েছে তার স্বপ্নের স্থাপনা থেকে। যদিও আপাতদৃষ্টিতে তিনি একজন সাহসী নারী। তার বাড়ি পঞ্চগড় জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে। যেখানে একমাত্র ছেলেকে নিয়ে একাই গড়ে তুলেছেন নিজের ছোট্ট সংসার। পঞ্চগড় জেলা শহর থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে হাড়িভাসা ইউনিয়নের খোপড়াবান্দি চৌরাস্তায় যে ছোট্ট বাজারটি রয়েছে তার নাম জয়গুন মার্কেট। এই নারীর হাত ধরেই এই বিরান ভূমিতে জমজমাট মার্কেটের পত্তন। যে কারণে তার নামেই পরিচিতি পেয়েছে এই এলাকাটি।

জয়গুন বেগম দু’মুঠো খাবারের জোগানের জন্য একমাত্র ছেলেকে নিয়ে ২০০১ সালে এখানে একটি ছোট্ট চায়ের দোকান শুরু করেছিলেন। সেটিই ছিলো এই বাজারের প্রথম দোকান। জয়গুনের চায়ের দোকানে মুড়ি, চিড়া, পান, বিড়ি, বিস্কিট বিক্রি হতো। আস্তে আস্তে জায়গাটার পরিচিতি বাড়ে, জয়গুনের দেখাদেখি সেখানে অন্যরাও এসে দোকান দেয়। ফলে জমে ওঠে চৌরাস্তার বাজারটি যা জয়গুন মার্কেট নামে পরিচিতি পায়। বর্তমানে সেখানে দোকানের সংখ্যা অর্ধশত ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু এখন জয়গুন মার্কেটে আর জয়গুনের দোকানই নেই। তাকে সেখান থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে।

বাজারটি জমে উঠলে ব্যক্তি মালিকানায় থাকা তার দোকানটি জোর করেই দখলে নেয় মালিক আছিমদ্দিন। এমনকি দোকানের কোনো মালামালও তাকে নিয়ে যেতে দেয়া হয় নি। তখন টাকা পয়সা দিয়ে যে দোকানটার মালিকানা কিনে নেবে সেই সেরকম আর্থিক সঙ্গতি ছিলো না জয়গুনের। তাই চোখের পানি মুছতে মুছতে সেদিন ছেলের হাত ধরে ওই বাজার ছেড়ে আসে জয়গুন। তবে দোকান না থাকলেও নামটা ঠিকই রয়ে গেছে। যদিও নামটা বদলানোর জন্য কম চেষ্টা করে নি কুচক্রী মহল। এখনও তারা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। একেতো এটা একটা নারীর নামে নাম, তার উপর এই নামটা একটা নির্যাতন আর অধিকার হরণের ঘটনার সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাই এটা যত তাড়াতাড়ি বদলে ফেলা যায় ততই তো ওদের মঙ্গল, দখলটা আরো পাকাপোক্ত হয়।

এ নিয়ে আক্ষেপ করে জয়গুন বেগম বলেন, ‘শুরুতে তারা আমাকে দোকান করার জন্য অনুমতি দিয়েছিল। খুব কষ্ট করে আমি দোকানটি সাজিয়েছিলাম। আমার দেখাদেখি অনেক মানুষ সেখানে দোকান তোলে। এক পর্যায়ে মালিক আমাকে দোকান থেকে বের করে দেয়। আমার খুব সাধ ছিলো দোকান করে জীবিকা নির্বাহ করবো। কিন্তু তারা আমাকে আর তা করতে দিলো না।... আমি নারী তাই আমার নামটিও মুছে দেয়ার চেষ্টা করেছে অনেকে। এখনো করছে। তারা এটি মেনে নিতে পারছে না।’

তবে দোকান থেকে বিতাড়িত হলেও জয়গুন কিন্তু হেরে যান নি। একমাত্র সন্তানকে নিয়ে ভালোই আছেন জয়গুন। দোকান কেড়ে নেয়ার পর দিন মজুরি করে সংসার চালিয়েছেন। গতর খেটে ১৩ শতক জমি কিনে বাড়িও করেছেন। সব মিলিয়ে জয়গুন আজ সফল নারী। লড়াই করে বেঁচে থাকার জন্য আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিও পেয়েছেন। ২০১৩ সালে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে জয়িতা হিসেবে সম্মাননাও দেয়া হয়েছে জয়গুনকে।

তাই বলে জয়গুনের দোকান হারানোর কষ্টটা কিন্তু কমে নি। এখনও ভাবেন ‘আহা, ওই দোকানটা যদি আবার ফিরে পাওয়া যেতো।’ এই স্বপ্ন নিয়েই কাটছে তার দিন। জয়গুনের এই স্বপ্ন কোনোদিন পূরণ হবে কিনা তা জানি না। তবে জয়গুন মার্কেটের নামটা যেন মুছে না যায় কোনোদিন, এই বিশেষ এটাই একান্ত চাওয়া। জয়গুন হেরে গেলে হেরে যাবে এ দেশের গ্রামের প্রান্তিক নারীরা, পরাজিত হবে তাদের বেঁচে থাকার লড়াই। তাই নারী দিবসে আমার একান্ত চাওয়া যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকুক জয়গুন মার্কেট, একজন নারী দোকানীর সংগ্রামের সাক্ষী হয়ে।


  • ২৭৫ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

মাহমুদা আকতার

লেখক ও সাংবাদিক। কাজ করেছেন ইউএনবি, দৈনিক ইনকিলাব, দৈনিক ডেসটিনি, বিএনএসসহ আরো বেশ কিছু পত্রিকা ও সংবাদ সংস্থায়। বর্তমানে কাজ করছেন দৈনিক বাংলাদেশ জার্নাল পত্রিকায় শিফট ইনচার্জ হিসেবে। পড়াশোনা করেছেন ঢাকার কামরুন্নেসা স্কুল, সেন্ট্রাল উইমেন্স কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। নিয়মিত গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, অনুবাদ ইত্যাদি নানা বিষয়ের উপর লিখছেন। প্রকাশিত গ্রন্থ পাঁচটি।

ফেসবুকে আমরা