সৌদি যুবরাজের দেশ থেকে কেনো পালাচ্ছে নারীরা?

বুধবার, জানুয়ারী ১৬, ২০১৯ ১০:৩১ PM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


নানা রকম নারীবান্ধব কর্মকাণ্ডের জন্য জন্য সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের বিশ্ব জোড়া বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলোতে বেশ সুনাম আছে। সেখানে নারীরা এখন গাড়ি চালায়, সিনেমায় যায়, কনসার্ট উপভোগ এমনকি উন্মুক্ত মঞ্চে সঙ্গীত পরিবেশনও করতে পারে, ক’দিন আগেও যা ছিলো নারীদের জন্য নিষিদ্ধ। আর সেই যুবরাজের রাজ্য থেকেই কিনা পালিয়ে এসেছে ১৮ বছরের কিশোরী রাফাহ বিন কুনুন। সম্প্রতি এ ঘটনা গোটা বিশ্বে আলোড়ন তৈরি করেছিলো।


গত ৫ জানুয়ারি পরিবারের সঙ্গে কুয়েত যাওয়ার পথে ব্যাংককে পালিয়ে যান কুনুন। ব্যাংকক বিমানবন্দরে আটক হওয়ার পর সে অস্ট্রেলিয়া যাবার কথা জানায়। থাই অভিবাসন কর্তৃপক্ষ তাকে জোর করে সৌদি আরবে পরিবারের কাছে ফেরত পাঠাতে চাইলে সে বিমানবন্দরের এক হোটেলকক্ষে নিজেকে ‘আটকে’ রাখে এবং দেশে ফিরতে অস্বীকার করে। হোটেল কক্ষ থেকেই নিজের ছবি ও বক্তব্য পোস্ট করেন কানুন। তাকে পরিবারের কাছে ফেরত পাঠানো হলে মেরে ফেলা হবে বলেও আশঙ্কার কথা জানিয়েছিলো মেয়েটি। এরপর নানা নাটকীয়তার পর প্রেসিডেন্ট জাস্টিস ট্রুডোর বদান্যতায় কানাডায় শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় মিলেছে তার। এক্ষেত্রে কুনুনকে তো ভাগ্যবতীই বলতে হবে। কেননা তার বিদেশ যাবার স্বপ্ন সফল হয়েছে, ফিরে যেতে হয় নি সৌদিতে, নিজের রক্ষণশীল এক ধর্মান্ধ পরিবারের কাছে।


কিন্তু সে দেশের আর যে সব মেয়েরা, যারা কুনুনের মতোই অন্য কোনো দেশে পাড়ি জমােেনার পরিকল্পনা করছে, তারা এত সহজে সফল হয় না। সৌদি আরব থেকে পালিয়ে আসার চেষ্টা করেছে এমন হাজারো নারী আছে, যাদের জোরপূর্বক দেশে ফিরিয়ে নেয়া হয়েছে, কিংবা পালিয়ে আসার পথেই আটকে দেয়া হয়েছে। সৌদিতে এগুলো এখন নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা।


২০১৭ সালের এপ্রিলে ঠিক একই ঘটনা ঘটেছিলো ম্যানিলার এক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। তার নাম ছিলো লাসলুম (২৪), অস্ট্রেলিয়ার সিডনি যাবার পথে ম্যানিলায় বিমানের যাত্রাবিরতির সময় তাকে নিনয় আ্যাকুইনো ইন্টারন্যাশনাল বিমানবন্দরে আটক করেছিলো সৌদি দূতাবাসের কর্মকর্তারা। এরপর বিমানবন্দর থেকে প্রচারিত বার্তায় সে সাহায্যের আবেদন জানিয়ে লিখেছিলো, ‘তারা আমার পাসপোর্ট কেড়ে নিয়েছে এবং ১৩ ঘণ্টা ধরে আটকে রেখেছে। আমার পরিবার এখানে আসলে আমাকে মেরে ফেলবে। আর সৌদি আরব ফিরে গেলে আমি এমনিতেই মরে যাবো। দয়া করে আমাকে সাহায্য করুন।’ কিন্তু তার সে আবেদনে কান দেয় নি ফিলিপাইন কর্তৃপক্ষ। জাতিসংঘের কনভেনশন মেনে নিয়ে তাকে আশ্রয় দিতে অস্বীকার করে। উল্টো তারা সৌদি সরকারকে সহযোগিতা করে। পরে তার দুই চাচা এসে তাকে জোরপূর্বক সৌদি এয়ার লাইন্সের জেদ্দাগামী ফ্লাইটে তুলে নিয়ে যায়।


এর মাত্র এক মাস পর ঠিক একই ঘটনা ঘটেছিলো আশওয়াক (১৮) ও আরিজ হামুদ (১৯) নামের দুই বোনের সঙ্গে। সৌদি থেকে পালিয়ে তারা তুরস্কে চলে আসে এবং আশ্রয় চায়। অনলাইনে প্রচারিত এক ভিডিওতে তারা দাবি করে, তাদের পরিবার তাদের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালাচ্ছে এবং নিজের বাড়িতেই তাদের জেলখানার বন্দিদের মতো দিন কাটাতে বাধ্য করা হচ্ছে। ফলে তাদের আশ্রয় চাই। তুরস্ক সরকার তো তাদের আশ্রয় দেয়ই নি, উল্টো সৌদি দূতাবাসের অনুরোধে তাদের জোরপূর্বক দেশে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছিলো। একটা বা দুটো নয়, এরকম অসংখ্য কাহিনী রয়েছে।


সৌদি যুবরাজ নারী উন্নয়নের নামে যেটা করছেন বা করেছেন সেটা স্রেফ ভাওতাবাজি, অন্য কথায় বলতে গেলে পশ্চিমা বিনিয়োগের জন্য কিছু উদ্যোগ নেয়া মাত্র। এতে নারী সমাজের প্রকৃত কোনো ধরনের উন্নয়ন হয় নি। তারা না পেয়েছে স্বাধীনতা, না মানুষের মর্যাদা। এখনও সেখানে জঘন্য ওয়ালিয়া (অভিভাবকত্ব) প্রথা প্রচলিত। এই প্রথার ফলে একজন প্রপ্তবয়স্ক নারীর পক্ষে পরিবারের পুরুষ অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া কিছু করার সুযোগ নেই। তা সে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিয়ে, চাকরি, ভ্রমণ, বীমা যাই হউক না কেনো। বিয়ের আগে তারা থাকে বাবা বা ভাইয়ের অধীনে আর বিয়ের পর পাকাপাকিভাবে তারা হয়ে যায় স্বামীর সম্পত্তি। স্বামীর অবর্তমানে তাদের অভিভাবক হন ছেলে সন্তান, যাকে তিনি জন্ম দিয়েছেন এবং কোলে পিঠে করে বড় করেছেন। এমনকি স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা হাসপাতালে ভর্তি হতে গেলেও মেয়েদের পুরুষ অভিভাবকদের সম্মতিপত্রের প্রয়োজন হয়।


দ্বিতীয়ত; সৌদি আরবের মেয়েদের এভাবে ঘর ছেড়ে পালানোর পিছনে আরো একটি বড় কারণ হচ্ছে নারীদের নিরাপত্তা দিতে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা। মেয়েদের সবকিছুতেই পুরুষ অভিভাবক মাত্রাতিরিক্ত খবরদারি রয়েছে। আগের যুগে তো সে দেশের মেয়েরা খুব একটা লেখাপড়া করতো না। তাই তারা এসব পুরুষদের শাসনকে ঐশ্বরিক নিয়ম ভেবেই মেনে নিতো। কিন্তু এখন যখন মেয়েরা লেখাপড়া শিখছে, সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে পৃথিবী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হয়ে উঠছে, তখন একটা মেয়ে তো এভাবে মুখ বুঁজে অভিভাবকত্বের নামে এসব পুরুষ শাসন মেনে নিতে চায় না। আর যে মেয়েরা এসব নিয়মের প্রতিবাদ করে তাদের পাঠিয়ে দেয়া হয় রাষ্ট্র চালিত সংশোধনাগারে। পুরুষ অভিভাবকের সম্মতি পেলেই সেখান থেকে তাদের মুক্তি জোটে। ধরুণ, একটা মেয়ের ওপর তার বাবা শারীরিক নির্যাতন চালালো, সে ঘর ছেড়ে পালিয়ে গেলো। তখন তাকে আটক করে সংশোধানাগারে (এক প্রকার কারাগার) নিয়ে যাবে কর্তৃপক্ষ। কিংবা তার বাবাই সেই অবাধ্য মেয়েকে সেখানে দিয়ে আসবেন। আর সেই কারাগার থেকে কেবল তখনই তার মুক্তি মিলবে যখন তার অত্যাচারী বাবা কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ করবেন। আসলে এইসব নির্যাতন ও অনিয়ম থেকে রেহাই পেতেই দেশ থেকে পালাতে চায় সৌদি নারীরা।


গাড়ি চালানো আর মাঠে গিয়ে খেলা দেখার অনুমতি পেলেও এখনও মারাত্মক সব লিঙ্গ বৈষম্যের শিকার সৌদি নারীরা। সেটা রাজনীতি, অর্থনৈতিক, সামাজিক যাই বলুন না কেনো।


চলাফেরার ওপর বিধিনিষেধ, অভিভাবকত্ব সিস্টেম, গৃহবন্দি জীবন, বলপূর্বক বিয়ে এবং এক তরফা তালাক প্রথা এসবই সে দেশের নারীদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। আপনারা হয়তো অনেকেই জানেন, সেখানে একজন পুরুষ শুধু চার বিয়ে নয়, যত বার ইচ্ছা ততবার বিয়ে করতে পারেন এবং কোনো রকম অজুহাত বা কারণ দর্শানো ছাড়াই স্ত্রীদের ত্যাগ করতে পারেন। কেউ কেউ তো আবার বিদেশে বসেই তালাকনামা পাঠিয়ে দেন। আর সে দেশে তালাকপ্রাপ্ত নারীরা এ নিয়ে আইনের আশ্রয় নেয়া তো দূরের কথা কোনো রকম প্রতিবাদ করতে পারেন না। আর দেনমোহর বা অন্য কোনো রকম আর্থিক সুবিধা তো দূরের কথা। আর এতসব বৈষম্যের কারণেই অপেক্ষাকৃত অল্প বয়সী মেয়েরা উন্নত ও স্বাধীন জীবনের আশায় সৌদি আরব থেকে পালাতে চাইছেন।


আর সময়োপযুগী আইন তৈরির করার বিষয়ে দেশটির সরকারের কোনো রকম সদিচ্ছাই নেই। ধরুন, পরিবারের অত্যাচার সইতে না পেরে একজন মেয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে গেলো। তাকে ধরার পর জোর করে ফের সেই পরিবারের কাছেই পাঠাবে সৌদি কতৃপক্ষ। মেয়েটা কেনো পালালো তা খতিয়ে দেখা কিংবা দোষীদের শাস্তির কোনো ব্যবস্থা না করেই।


সৌদি সমাজে স্বামী বা অন্য কোনো পুরুষ অভিভাবকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার কোনো সুযোগই নেই। ফলে পারিবারিক নির্যাতনের দায়ে মামলা করার সুযোগ দেশটিতে নেই বললেই চলে। তবে গত এক দশকেরও বেশি সময় আগে এক সৌদি নারী তার মদপ্য স্বামীর বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ এনে বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা করে গোটা বিশ্বে আলোড়ন তৈরি করেছিলেন। তিনি হলেন সৌদি আরবের বিখ্যাত টিভি উপস্থাপক রানিয়া আল বাজ। আর এ কাজে তাকে সহায়তা করেছিলো স্থানীয় এক দাতব্য সংস্থা। আর এ কারণেই তিনি নিজের লড়াইয়ে বিজয়ী হতে পেরেছিলেন। তবে তালাক নেয়ার পর তার আর দেশে থাকার সুযোগ হয় নি। বিবাহ বিচ্ছেদের পর ওই নারী স্থায়ীভাবে ফ্রান্স চলে যান। সেখান থেকে ২০০৫ সালে তিনি নিজের এই লড়াইয়ের ওপর একটি বই প্রকাশ করেন।


ঘর পালানো রাাহাফ কানাডায় আশ্রয় পাওয়ার পর সেখানে সে একজন মানুষ হিসেবে পরিপূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করবে, যা তার দেশে কখনই সম্ভব ছিলো না। কেননা সৌদি আরব হচ্ছে এমন এক দেশ যেখানে রাষ্ট্র, পরিবার, সমাজের সমস্ত সুযোগ সুবিধা কেবল পুরুষদের জন্য। যত রকম স্বাধীনতা ও অধিকার সবটাই তারা ভোগ করে থাকেন। আর মেয়েদের কাজ হচ্ছে কোনো রকম প্রশ্ন ছাড়াই পুরুষদের বশ্যতা বা অধীনতা স্বীকার করে নেয়া। এর অন্যথা হলেই জুটবে অকথ্য নির্যাতন।


এসব নিয়ে কেউ গলা উঁচু করে কথা বলতে চাইলে তার ভাগ্যে জুটবে কারাদণ্ড বা অমানবিক কোনো শাস্তি। যুবরাজ সালমানের দেশে এখনও অনেক নারী অধিকারকর্মী বিনা বিচারে আটক রয়েছে। তাদের মুক্তি দিতে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আর্ন্তজাতিক সম্প্রদায়ের অনুরোধ অগ্রাহ্য করেছে সৌদি সরকার। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করেই গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে কানাডার সঙ্গে সব ধরনের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছে সৌদি। তাই নারী অধকিার বা মানবাধকিার নিয়ে সেখানে কেউ মুখ তুলে কথা বলার সাহস করে না। তার বদলে ব্যক্তি স্বাধীনতার পায়রা মুঠোবন্দি করার স্বপ্ন নিয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করছেন অনেক সৌদি নারী। যতদিন পর্যন্ত রাজনৈতিকভাবে এইসব সমাধান না করা হবে, ততদিন পর্যন্ত এই ঘর পালানো চলতেই থাকবে। তারা সবাই কুনুনের মতো সফল হউক বা না হউক।


  • ৪৫৯ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

মাহমুদা আকতার

লেখক ও সাংবাদিক। কাজ করেছেন ইউএনবি, দৈনিক ইনকিলাব, দৈনিক ডেসটিনি, বিএনএসসহ আরো বেশ কিছু পত্রিকা ও সংবাদ সংস্থায়। বর্তমানে কাজ করছেন দৈনিক বাংলাদেশ জার্নাল পত্রিকায় শিফট ইনচার্জ হিসেবে। পড়াশোনা করেছেন ঢাকার কামরুন্নেসা স্কুল, সেন্ট্রাল উইমেন্স কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। নিয়মিত গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, অনুবাদ ইত্যাদি নানা বিষয়ের উপর লিখছেন। প্রকাশিত গ্রন্থ পাঁচটি।

ফেসবুকে আমরা