মা হওয়া এক সার্বক্ষনিক কাজ

শনিবার, অক্টোবর ২৮, ২০১৭ ১:৪০ PM | বিভাগ : সমাজ/গবেষণা


শুধুই মা হতে পারাটা সহজ কিছু নয়। মাকে হতে হয় ধৈর্যশীল, সহিষ্ণু। সংসারের সব দায়-দায়িত্ব শেষ করে, চারপাশের মানুষের নানান মিঠা কথা আর তেতো কথা শুনে, নিত্যদিনের নানা প্রতিবন্ধকতাকে পার করে প্রাণের সন্তানকে বুক দিয়ে আগলে রাখা অনেক বড় আর গুরু দায়িত্ব। তাই শুধু মা হওয়াটাও একটা ক্যারিয়ার।

আমার স্কুল জীবনের শেষ দিনটায় ফেয়ারওয়েলের দিনে আমি সব শিক্ষকের কাছে খাতা নিয়ে তাদের স্বাক্ষর নিচ্ছিলাম। সাহেরা বেগম নামে আমাদের গার্হস্থ্য অর্থনীতির শিক্ষিকা আমার খাতায় গোটা গোটা করে লিখে দিলেন দোয়া করি বড় হয়ে খুব ভালো মা হও। তখন তো আমার মনে মনে বড় হয়ে ডাক্তার হবার শখ। একটা লাল রঙের গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে যাবো। খুব রাগ হয়েছিলো ম্যাডামের লেখাটা পড়ে। যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লোক প্রশাসনে পড়ি সামাজিক বিজ্ঞানের শিক্ষক লুৎফল হক স্যার বলতেন একজন মায়ের তাঁর সন্তানকে সময় দেয়াটা অনেক জরুরি। বিদেশে এ জন্য বাড়তি সুবিধা দেয়া হয়। যাতে মা তাঁর সন্তানকে লালন পালনে বেশী মনোযোগী হতে পারেন। আমার ছয় মাসের ছোট্ট ছেলেটাকে বাসায় রেখে তখন স্যারের ক্লাসে আমি। স্যার বললেন তুমি চলে যাও, তোমার ছেলেটাকে গিয়ে সময় দাও। আজ ক্লাসে তেমন কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে না। আমার মন খারাপ হতো, ভাবতাম আর ক্যারিয়ার হলো না। যখন এমবিএ করতাম রিসার্চ্ অ্যানালাইসিস এর এক শিক্ষক বলতেন তার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও তাঁর স্ত্রী উভয়ই নিজেদের কর্মক্ষেত্র নিজে এত ব্যস্ত থাকতো যে, তাদের সন্তানটি অবশেষে মাদকাসক্তিতে আক্রান্ত হয়ে গেছে। মায়ের ভূমিকায নেহাৎ কম নয়, তিনি বারবার কথার মাঝে বুঝিয়ে দিতেন।

তাই অফিসে ক্যারিয়ার আর মা হয়ে ক্যারিয়ার এই দু’য়ের মাঝে দোদুল্যমান সময়টাতে শুধু মা হয়ে ক্যারিয়ার করার সিদ্ধান্ত নেয়াটা খুব সহজ কিছু নয়। আজকাল বিজ্ঞাপনে দেখি এক স্থপতি মা বলছেন মা হ্ওয়ার কোনো ডিগ্রি তো আমার নেই আমি কি আমার সোনাকে ঠিকমত যত্ন নিতে পারছি?

আবার অন্য বিজ্ঞাপনে আছে আমার সন্তানের ঠিকমত যত্ন নিতে না পারলে আবিরের মায়ের সাথে চোখে চোখ মেলাবো কি করে?

বিষয় এইটাই যে, শুধু মা হ্ওয়া যে একটা ক্যারিয়ার হ্ওয়া উচিত, পড়াশোনা করা উচিত, শিশুর বেড়ে ওঠা নিয়ে আর তা কাজে লাগানো উচিত সন্তান লালন পালনে, তা নিয়ে কেউ ভাবছে না।

এখন দিন বদলেছে, অর্থনৈতিক জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে নারীবাদ মায়ের অংশগ্রহণকে cost benefit analysis হিসেবে দেখতে চায়। অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল হতে চাওয়া নারীকে যারা স্বাধীনচেতা স্বেচ্ছাচারিনী, এমনকি উত্তরাধিকারের রক্ত শুদ্ধির প্রশ্নে জর্জরিত করে পরাধীনতার শেঁকলে বাঁধতে চেয়েছে তাদের মুখে ছাই দিয়ে 3R ফর্মুলা এনেছে নারীবাদীরা।

তার প্রথমটি Reorganization দেয়া যাতে বলা হয়েছে যে নারী ২৪ ঘন্টার ১৮ ঘন্টা সাংসারিক কাজে ব্যস্ত থাকেন। বাকি ৬ ঘন্টা তার ঘুমের সময়। কিন্তু এই ৬ ঘন্টাও অবসরের অংশ নয়। তিনি তার এই শ্রমঘন্টা গৃহব্যবস্থাপনায় ব্যয় করেন। মজার বিষয় হলো নারীর এই গৃহব্যবস্থাপনার সহায়তায় পুরুষের কর্মক্ষেত্রে দক্ষতা প্রমাণে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখে। সে বিশ্রাম নেয়, মানসিক তৃপ্তি পায়। সর্বোপরি, জীবিকা অর্জনের যে মূল তাগিদ তার সংসার, সন্তানকে নিয়ে পরিপূর্ণ নিরাপদ জীবন–যাপনের যে অন্তহীন যুদ্ধ সে প্রতিনিয়ত চালাচ্ছে তার মূল আশায় সে নারীকেই চেতন-অবচেতনে বেছে নিয়েছে। সে অর্থে পুরুষের আয়ের একাংশে নারীর অংশ গ্রহণ আছে। যা ব্যাপক অর্থে জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নারীর অংশগ্রহণ বলে মনে করেন তারা। এজন্য দ্বিতীয়ত Reduce শব্দ কে ব্যাখা দেন এই হিসেবে যে পুরুষ ৮-১০ শ্রমঘন্টা এবং ৬ ঘন্টা ঘুম দেয়ার পরও ৬-৮ ঘন্টা অবসর যাপনের সুযোগ পান। যে সময়টা নারীর গৃহস্থালীর কাজে সাহায্য করতে পারেন। এবং Redistribution এ এসে বলছেন নারী পুরুষের যৌথ প্রয়াসে বা সম বন্টনের মধ্য দিয়ে আদি প্রতিষ্ঠান পরিবারটিকে টিকিয়ে রাখবে। আর পরিবারকে কেন্দ্র করে সচল থাকা অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে নারীর অবদানকে যুক্ত করা হবে এক ভাবে নারী-পুরুষের সমঝোতা ও সহযোগিতাকে কেন্দ্র করে ।

সুতরাং বিষয়টাতো পরিষ্কার সংসার পরিচালনার জন্য মায়ের হাতে পর্যাপ্ত অর্থ প্রদানের বিষয়টি নিশ্চিত করা এবং পরিবারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে মায়ের সিদ্ধান্তকে মেনে নেয়ার মন মানসিকতাকে শক্ত জায়গায় দাঁড় করাতে পারলে একজন শুধু মা হতে পারাটা্ও একটা ক্যারিয়ারে পরিণত হতে পারে ।

ভেবে দেখো তো কাঁচা আমের আঠাতে আপনার ছোট্ট মেয়েটার মুখে লাল দাগ হয়ে যাওয়াতে তুমি আনন্দে হেসে উঠলে আর মেয়ের নাকে নাক ঘষে কাঁচা আমের মধুর রসে রঙিন করি মুখ বলতে থাকলে। কবি জসীমউদ্দিনের এই কথাটায় এতদিন শুধু কবিতায় পড়েছো, মা হয়ে জীবনেই না হয় তা লেপ্টে নিলে ।

কিংবা সুফিয়া কামালের–খুশিতে বিষম খেয়ে আরো উল্লাস বাড়ায়েছি মনে মায়ের বকুনি খেয়ে। মা মেয়ের এই আনন্দের মুহূর্তগুলো জীবনে মা হয়ে ক্যারিয়ার করাটা ছাড়া আর কিসে হতে পারে?

ভয় পেয়েছ; ভাবছ, এলেম কোথা?

আমি বলছি, ‘ভয় পেয়ো না মা গো,

ঐ দেখা যায় মরা নদীর সোঁতা।’ -রবীন্দ্রনাথের এই কবিতা পড়াতে গিয়ে আপনার গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে, কিন্তু জানো কি ওই কবিতাটি মায়ের কাছে রপ্ত করা তোমার ছোট্ট ছেলেটি মনে মনে কত বেশী আত্নপ্রত্যয়ী হয়ে উঠলো। সে যেন নিশ্চিত ভবিষ্যত খুঁজে পেলো তার জীবনে, তার লক্ষ্য সে সেদিনই অর্জন করে ফেলেছে যে তাঁর মাকে তার নিরাপদে রাখতে হবে। এ শিক্ষাটি অন্য কোনো শিক্ষকের কাছে পাওয়া সম্ভব হবে না, যতটা না মা দিতে পারে ।

কিংবা নিশ্চিন্তপুরের বাঁকে বাঁকে অপু ও খুঁকির বেড়ে ওঠার গল্প একসাথে শোনার পরিবেশ তৈরি করে তুমি মা অবচেতন মনে চারপাশের এই স্বার্থপর সময়ে ভাই-বোনের মধ্যে যে পরম মমতার ছোয়াঁ মেলে দিলেন তা হয়তো কোনো কর্পোরেট ওয়ার্ল্ডের নির্বাহী কর্মকর্তার চেয়ারে বসে দেয়া সম্ভব হ্ওয়া কঠিন হবে।

তাই মনের টানাপোড়ন দূর করে ক্যারিয়ারের পাশাপাশি শুধু মা হিসেবে নিজেকে গড়ার মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে ফেলো। অকারণ সন্তান লালন পালনে আমার জীবনে কিছু হলো না, এই সংসার না থাকলে জীবনে এই হতো সেই হতো সেসব বলে সোনার হরিণের পেছনে অন্তহীন ছুটে চলা থেকে বিরত হও।

একদম ভাববে না একজন মা হতে উচ্চ শিক্ষার প্রয়োজন নেই। একজন মা হতেই সবচেয়ে বেশী উচ্চ শিক্ষার প্রয়োজন। তোমার কথায়, চলায়, আচরণকে তোমার সন্তান অনুকরণ করে। তাকে যে পরিবেশ দিবে পরবর্তী সময়ে তার ব্যক্তি জীবন, শিক্ষা জীবন, সংসার জীবন এমনকি কর্মজীবনে্ও এর প্রভাব পড়বে। সে প্রশংশিত হতে পারে, সমালোচিত হতে পারে। আর সবচেয়ে বড় বিষয় সকল প্রতিবন্ধতকা পেরিয়ে সামনে এগিযে যেতে সে বারবার মা, মায়ের শিক্ষাকে আঁকড়ে ধরতে চাইবে। সুতরাং আজ তুমি মা। তোমার আদর্শ তোমার সন্তানের চলার পথের পাথেয়, কখনো ভেবে দেখেছ কি?

অনেক মা আছেন যারা দক্ষতার সাথে চাকরির পেশাদারিত্বের সাথে সাথে মা হিসেবে দায়িত্বটিও সুনিপুণভাবে পালন করছেন। সেক্ষেত্রে তাদের কর্মদক্ষতা প্রশংসার দাবি রাখে। তবে কেউ যে শুধু মা তাই সন্তানের স্কুলের সামনে বসে টিভি সিরিয়ালের গল্প করবেন, গয়না, শাড়ির আলাপ পাড়বেন, কিংবা শ্বাশুড়ি ননদকে কিভাবে জব্দ করেছেন তা বলে টিপ্পনী কাটবেন তা নয়। নিজ কর্মের জায়গাটিকে শ্রদ্ধার বিবেচনা করে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে।

মা হয়ে এ এক অন্য ক্যারিয়ার আর এটা অনেক সম্মানের আর অনেক বড় দায়িত্বেরও বটে।

 

 


  • ৬১৩ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

রুমানা রশিদ রুমি

রুমানা রশীদ রুমী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগ হতে স্নাতক আর স্নাতকোত্তর ড্রিগ্রি নেবার পর মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনায় এম বিএ করেন। বর্তমানে আইন বিজ্ঞানে অধ্যায়নরত। পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন সাংবাদিকতাকে। ছিটকে পড়ে যোগ দেন ব্যাংকে। লেখালিখি আর কাটখোট্টা ব্যাংকিং এক সাথে তাল মেলাতে না পেরে বর্তমানে আছেন ‘দি বাংলাদেশ মনিটর’ এর ‘ফিচার রাইটার”হিসেবে। তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ম্যাগাজিন ‘রংঢং’। নিয়মিত লেখেন ‘দি বাংলাদেশ অবজারভারে”। লিখছেন বিভিন্ন অনলাইন পত্রিকায়। কাজ করছেন নারী সম্পদ নিয়ে। ‘শূন্য প্রকাশ’ প্রকাশনী থেকে ২০১৫ সালের ‘একুশে বইমেলায়’ বের হয় তাঁর প্রথম ফিউশন ‘জয়িতা’। পাঠকের উৎসাহে চৈতন্য প্রকাশনী থেকে বের হচ্ছে “এ শহরের দিদিমনি “।

ফেসবুকে আমরা