লজ্জিত হই, ব্যথিত হই

বুধবার, জুলাই ১১, ২০১৮ ২:৪১ AM | বিভাগ : প্রতিক্রিয়া


সরকারি চাকুরী যেন এক সোনার হরিণ। বিশ্ববিদ্যালয় পাস করার আগেই বিসিএস পাশ করে সরকারী চাকুরী পাওয়ার প্রত্যাশা পরিবারের আর ছেলে মেয়েদের কাছে মুখ্য হয়ে উঠে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে। কিন্তু চাকরী পাবার এ প্রক্রিয়াতে কোটার কারণে অনেকে বঞ্চিত হয় বলে দাবি উঠে কোটা প্রথা সংস্কারের। বিশেষ করে মুক্তিযোদ্ধা কোটাকে কেন্দ্র করে আন্দোলন শুরু হয় গুরুতর ভাবে। আর বিষয়টিতে দেশের মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি অসম্মান দেখানো হয় নানা ধরনের বক্তব্যের মাধ্যমে। শুরু হয় নৈরাজ্যকর পরিবেশ। যার প্রেক্ষিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সকল ধরনের কোটা প্রথা বাতিলের ঘোষনা দেন গত সংসদ অধিবেশনে।

কিন্তু এরপর বেশ লম্বা সময় অতিবাহিত হলেও কোটা সংস্কার  নিয়ে কোনো সুনিদিষ্ট সমাধান এখন পর্যন্ত আসে নি সরকার থেকে। প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে সমাধানের পথ খুঁজে কাজ করতে যদিও বলেছেন।

কিন্তু যে প্রশ্নটি কোটা সংস্কারের বিষয়ে বার বার ঘুরে ফিরে আসে সেটি হলো আস্থা রাখার মতো অবস্থানটি শুধু ছাত্রছাত্রী নয় জনগন ও পাচ্ছে না এ বিষয়ে।

এর অন্তরালের কারণ, কোটা সংস্কারকে রাজনৈতিক ভাবে পুঁজি করা হচ্ছে নানাদিক থেকে নানাভাবে সব রাজনৈতিক দল। দলীয়ভাবে একটি দল মুক্তিযুদ্ধকে একমাত্র তাদের সম্পদ হিসাবে ধারন করে আন্দোলনরত সবাইকে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের বলে ঘটনা অন্যখাতে প্রবাহিত করছে এখন পর্যন্ত।

এতে করে ৭১' এর চেতনাকে যারা নীরবে মনের কোনে লালন করে তারা তাদের আন্দোলরত সন্তানদের বিষয় চিন্তা করে অনেক কিছু মেনে নিতে পারছে না। দেশের ১৬ কোটি মানুষ সবাই সরাসরি রাজনীতি করে না। কিন্তু তাই বলে যে কোনো ইস্যুতে যখন খুশী যে কেউ কাউকে রাজাকার বা রাজাকারের সন্তানের সীল মেরে দেবার অধিকার রাখে না। 

দল এবং সরকারকে ভাবতে হবে, ৭১-মুক্তিযুদ্ধ-মুক্তিযোদ্ধাকে তাদের আগামী দিনের নেতাকর্মী কতটা ধারন করে। দেশকে এগিয়ে যাবার পথে জনগনকে বিভক্ত করার সময় এটা নয়।

গণতান্ত্রিক একটি দেশে নানা ইস্যুতে জনগন তাদের অধিকার আদায়ে মিছিল মিটিং করবে। এটা তার গণতান্ত্রিক অধিকার। তবে দাবি আদায়ের বিপক্ষে অবস্থানকারীদের উপর হায়নার মতো আচরণ কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। আর যখন বলা হয় এসব কাজ করা হচ্ছে সরকারের কোনো অঙ্গসংগঠনের দ্বারা। তখন ক্ষমতাসীন সরকারের উন্নয়নের অনেক কিছু ম্লান হয়ে যায়।

এবারের কোটা সংস্কারের দাবির ঘটনাতে নারী কিংবা পুরুষ জেন্ডার ইস্যুটা আন্দোলনকারীদের বিবেচনাতে নাই বা আনা হলো। তারপর ও বলা যায় দাবি আদায়ের জন্য শান্তিপূর্ণ কোনো অবস্থানকে এভাবে অমানবিকতার দিকে নিয়ে যাওয়া হিতকর কিছু নয়। প্রকাশ্যে ফ্যাসিবাদীর মতো অত্যাচার, ধরপাকড় এসব দেখে শুধু মনে হয় 'এ কোন প্রজন্ম আমাদের'। 

যে মুক্তিযোদ্ধাদের কোটা নিয়ে আন্দোলন শুরু সেখানে একদল তরুণ রাজনীতির বিপথে গিয়ে ভুলে গেছে এদেশেরই মুক্তিযোদ্ধারা ৭১ এ নারীদের সম্ভ্রমহানীর প্রতিবাদে অস্ত্রের হুকার তুলেছে। বুলেটের আঘাতে হানাদার বাহিনীর বুক ঝাঁঝরা করে দিয়েছে কোনো স্বামী, কোনো ভাই, কোনো পুত্র কিংবা কোনো সন্তান।

গত কিছুদিন ধরে মেয়েটির ফেইস বুকের ভাইরাল হয়ে যাওয়া ছবিটি নিয়ে অনেক কথা উঠেছে। এমনকি মেয়েটিও তার উপর কি ধরনের অত্যাচার হয়েছে তা বলছে। সেই সাথে কেউ কেউ বলছে ও নারী হয়ে এমন দাবি নিয়ে রাস্তায় কেনো? এখানে ও বলতে হয় এদেশের এমন কোনো আন্দোলন নেই যেখানে নারী ছিলো না। আবার সব আন্দোলনে নারীদের উপর নির্যাতনের প্রতিবাদ প্রতিশোধ নিয়েছে মানুষ। ৭১ এর হানাদার বাহিনীর হিংস্রতা স্মরনে এলে মনে যে দাহ জন্মায় আজও, সেখানে কি করে এ দেশের ছেলেরা নিজেদের বিবেকবোধকে ভুলে নারীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে আন্দোলন দমনের নামে? এ প্রশ্নটা কেবল একবার ভেবে দেখা দরকার তরুণ সমাজের।

না, এহেন কাজ যারা করেছো তাদের  সে অতি সাধারন কথা, 'তোমার এমন কাজ করার সময় মনে হয় নি ঘরে মা বোন আছে' -বলাটা বাতুলতা মাত্র। কারণ এমন পাষবিক আচরণের জন্য ধিক্কার জানাতে লজ্জা বোধ হয় কন্যা জায়া জননী হিসাবে।

তার চেয়ে বরং বলি, সেই মুক্তিযোদ্ধাদের ঘরে ঘরে যাও। জানো তারা কি করে এ দেশের মা বোনদের ইজ্জত রক্ষা করেছে। কি করে লাল সবুজের পতাকা মনে করে নিজের গায়ের কাপড় দিয়ে মা, বোনের লজ্জা নিবারণ করেছে।

গণতান্ত্রিক সরকার তার জনগনের দাবি দাওয়া বিবেচনায় রেখে তার মতো করে এগিয়ে যাবে। কিন্তু সরকারের কোনো অংগসংগঠন যদি পেটোয়া বাহিনীর ভূমিকা পালন করে তাহলে তা আগামী প্রজন্মের জন্য সুফল বয়ে আনবে না।

কাউকে ভুলে গেলে চলবে না বাংলার ইতিহাসে ছাত্র রাজনীতির ভূমিকা সমুজ্জ্বল। তবে এখানে উল্লেখ্য- ছাত্র রাজনীতি এখন আর শিক্ষণীয় স্থান নয়। বরং ক্ষমতার মোহে ছেলেমেয়েরা ছাত্র সংগঠনের লেবাস লাগায়। এ কারণে আজ তারা হুকুমের গোলামের মতো ব্যবহৃত হচ্ছে যত্রতত্র। কোনো মানুষকে হাতুড়ি দিয়ে পেটানো কিংবা নারীদের জঘন্য ভাবে হামলা করাতে কোনো বীরত্ব নাই। এটা পশুত্ব আর ধিক্কার জনক কাজ।

তাই ছাত্র রাজনীতিতে পশুর এর মত ন্যাক্করজনক আচরণ করে কালিমাযুক্ত বীরত্ব দেখানো মানে মুক্তিযুদ্ধকে অপমান করা।


  • ৫৩৬ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

হাসিনা আকতার নিগার

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে পাশ করে সাংবাদিকতা পেশাতে কাজ করে আসিছ ২০০৪ সাল থেকে।মুক্তিযুদ্ধ, নারী, উন্নয়ন মূলক বিষয় নিয়ে বই ফিচার তথ্য চিত্র নিরমান সহ গল্প ও চলমান ইস্যু ভিত্তিক লেখালেখি করি বিভিন্ন পত্র পত্রিকাতে।

ফেসবুকে আমরা