লজ্জা'র অবৈধ ঘোষনা আমাদেরকে এখনও লজ্জা দিয়ে যাচ্ছে

বুধবার, মে ২৩, ২০১৮ ৯:৩০ PM | বিভাগ : প্রতিক্রিয়া


তসলিমা নাসরিন তাঁর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুক কমেন্ট বক্স পাবলিকের জন্য উন্মুক্ত করেছিলেন দুদিনের জন্য, পরে এই পবিত্র রমজানের মোমিন মুসলমানদের অকথ্য গালাগালির কারণে আবার সেটা বন্ধ করেছেন। প্রবাদে আছে 'সোনার চামচ মুখে নিয়ে সকলের জন্ম হয় না', তসলিমার মতই জার্মান রোমান্টিক যুগের কবি ও কথা সাহিত্যিক বেটিনা ভন আরনিম তাঁদেরি একজন যার সোনার চামচ মুখে নিয়েই জন্ম হলেও রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে এবং মা হিসাবে তার ভূমিকার জন্য তাঁর সমাজ সন্তুষ্ট ছিলেন না। তাই তিনি বিদ্রোহ ঘোষণা করেন সেই অষ্টাদশ শতাব্দীতেই। সেসময় উচ্চ সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া মেয়েরা এমন বিদ্রোহ ঘোষণা করতে সাহস করতো না, যেটি তার সময়ের রাজনৈতিক বিতর্কের সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের বেগম রোকেয়ার তো শতবর্ষের ইতিহাস আছেই।

সে যুগে সেই রক্ষণশীলতার ধারা পাল্টেছে, এখন শুধু সামাজিক অসন্তুষ্টি নয় রীতিমত শারীরিক আক্রমণ চলে। ১৯৯৪ সালের ৩ জুন থেকে ৪ অক্টোবর ঢাকার রাজপথে কি বিভৎস তাণ্ডব, তসলিমার বিরুদ্ধে লাখো মৌলবাদী গোষ্টির মিছিল, হাতে ব্যানার 'তসলিমা নাসরিনের কল্লা চাই'। তাঁর লেখা বইটি 'লজ্জা' আগুনে পুড়িয়ে ফেলার ছবি দূর প্রবাসে বসেও প্রথম এক ফরাসী পত্রিকায় দেখে আঁতকে উঠেছিলাম। পরে এক ফরাসী সংসদ সদ্যস্যের সহায়তায় তসলিমার প্যারিসে নিরাপদে পোঁছাবার খবরটি যখন পেলাম, তখনই আমরা কিছু হিউম্যান রাইটস এক্টিভিস্ট বার্লিনে একত্র হয়ে নাৎসি ইতিহাসের সেই বিভৎসতম অধ্যায়ের সাথে তসলিমা নাসরিনের দেশছাড়ার কাহিনী এক যোগসুত্র খুঁজেছি।

১৯৩৩ থেকে ১৯৪৫ ঠিক এমনি করেই নাৎসিরা নিজ দেশের শত শত কবি, সাহিত্যিক, চিত্রশিল্পী ও বুদ্ধিজীবীদেরকে দেশ থেকে বের করে দিয়েছিলো, নাৎসি শাসক গোষ্ঠী, তাদের শিল্প কর্ম, বই পুস্তক আগুনে পুড়িয়ে ফেলেছিলো।  

কি লিখেছিলো তাসলিমা তাঁর  লজ্জা উপন্যাসটিতে? কাহিনীর প্রটাগনিষ্ট, সুধোময় একজন দেশপ্রেমী। দেশকে নিজের মায়ের মতো দেখে সে। তার বিশ্বাস, মায়ের মতো করে বাংলাদেশও তাকে রক্ষা করবে। কিরণমায়া একজন বিশ্বস্ত স্ত্রীর মতো পতিদেবের আদর্শকেই মানে। তাদের ছেলে সুরঞ্জন মনে করে, জাতীয়তাবাদ সম্প্রদায়প্রীতির চেয়েও শক্তিশালী। অবশ্য তার হতাশ হতে সময় লাগে না। সে আবিষ্কার করে সাম্প্রদায়িকতা তার জানা দেশপ্রেমের সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। নীলাঞ্জনা তার দাদার এরূপ ভাবলেশহীনতাকে অবজ্ঞা করে এবং পরিবারের নিরাপত্তার জন্য ভাইকে কোনো মুসলমান বন্ধুর বাসায় ওঠার কথা বলতে থাকে। 

জার্মানভাষী বোহিমিয়ান উপন্যাসিক ফ্রান্স কাফকা যেমন তাঁর রুপান্তর বা মেটামর্ফোসিস রচনা, যা দিয়ে সমাজকে বোঝাবার চেষ্টা করেছেন যে সমাজের অতি আদরের বা প্রয়োজনীয় মানুষটিরও যখন "রুপান্তর" ঘটে তখন তার প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়। তসলিমার উপন্যাস লজ্জা'ও তেমনি একটি সমাজের রূপান্তর হওয়ার গল্প। এই কাহিনীতে  সর্বনাশা ঘটনার প্রভাবে মোহমুক্তি ঘটিয়ে ধ্বংসপ্রবণ হয়ে উঠার গল্প। 

চেনাইতে এক সাক্ষাকারে তসলিমা তাঁর নাস্তিকতা নিয়ে দাবি করেন, স্রষ্টার নীতি পরীক্ষা করার জন্য মজা করে কথা বলে দেখছেন যে তার জিহ্বা কাটা যায় কিনা। মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দিতে তা সার্বভৌম বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘কারো মত পছন্দ না হলে তার বিরোধিতা করার অধিকার সবারই থাকা উচিৎ।’

রাজনীতি নাকি ধর্মভিত্তিক রাজনীতি কোনটা বেশি উদ্বেগের?
এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা আসলে ধর্মনিরপেক্ষতা বনাম অন্ধবিশ্বাস, যুক্তিবাদিতা বনাম অযৌক্তিকতা, নতুনত্ব বনাম ঐতিহ্য।’

১৯৯২ সালের ৬ই ডিসেম্বর, ভারতের উত্তর প্রদেশের অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ধ্বংস করার খবরে প্রভাব পড়ে পার্শ্ববর্তী দেশ বাংলাদেশে। দাঙ্গার প্রভাবে দত্ত পরিবার এলাকাবাসীর ঘৃণার পাত্রে পরিণত হয়। পরিবারটির প্রতিটি সদস্য সেই সময়টুকু নিজের অনুভূতি দিয়ে নিজের মতো করে দেখে। সেই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর কবে থেকে অত্যাচার হচ্ছে, কী করে হচ্ছে, কেনো হচ্ছে মূলত এগুলো নিয়েই লেখা লজ্জা উপন্যাস। 

বইটিতে ধর্মীয়ভাবে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের সাথে হওয়া বৈষম্য সেক্যুলারিজমের ছায়ায় বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে।

১৯৯৩ সালের সেই ঘটনার পরে কিন্তু খালেদা জিয়ার সরকার লজ্জা বইটি নিষিদ্ধ করেছিলো মৌলবাদীদের চাপে, শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে সাধারণত খালেদা যা করেন, তার উল্টোটা করেন, কিন্তু লজ্জা থেকে নিষেধাজ্ঞা তিনিও তোলেন নি। 

এই প্রসঙ্গত আর একটি ঘটনা অনেকেই মনে আছে নিশ্চয়, কাশ্মীরের এক মুসলিম পরিবারের সন্তান সালমান রুশদি। বিলেতে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে সেখানেই এক প্রকাশনী সংস্থায় কাজ নেন। কাজের ফাঁকে লেখেন উপন্যাস ‘মিডনাইটস চিলড্রেন’। পাঠকের হৃদয় জয় করে সেই বই। তারপর আর বসে থাকা নয়, ম্যাজিক রিয়েলিজম ও পোস্টকলোনিয়ালিজম নিয়েই ঐতিহাসিক ঘটনা কে কেন্দ্র করেই তার বেশির ভাগ লেখা।

অবশেষে তার চতুর্থ উপন্যাস ‘স্যাটানিক ভার্সেস’ গোটাবিশ্ব তোলপাড় করে তোলে। এই উপন্যাসে ইসলাম ও নবী মুহাম্মদকে অবমাননার অভিযোগে চরম বিতর্কের মুখে পড়েন তিনি। ইরানের আয়াতুল্লাহ খোমেইনি তার মৃত্যুদণ্ডের ফতোয়া জারি করে। তাকে হত্যা করতে সশস্ত্র ইসলামী দল হিজবুল্লাহ লন্ডনে বোমা হামলা করে। আল-কায়েদার হিটলিস্টে ওঠে তার নাম। বিভিন্ন দেশে তার বইয়ের প্রকাশকদের ওপর সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটে। দেশে দেশে পোড়ানো হয় তার বই। মুসলিম বিশ্ব বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ব্রিটিশ রাষ্ট্র ব্যবস্থা কিন্তু সালমান রুশদিকে তাঁর জীবনের নিরাপত্তা দিয়েই সারা সারা বিশ্বের ফতোয়াবাজদের হাত থেকে রক্ষা করেছে তাঁকে, এটাই হলো রাস্ট্রের কর্তব্য, পশ্চিমা বিশ্ব ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে আলাদা করেছে সেই ফরাসী বিপ্লবের পর থেকেই। বাংলাদেশ সরকার কিন্তু সেটা পারে নি, সারা বিশ্বতো দুরের কথা নিজের দেশের মৌলবাদীদের কাছেই পরাহত।  

আজ ২৫ বছর পর তসলিমা একটা ছোট্ট উদাহারণ দিয়ে বুঝিয়ে দিলেন আবার, তাঁর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুক কমেন্ট বক্স উন্মুক্ত করে দিয়ে দেখিয়ে দিলেন যে, কত ভয়াবহ এক সাম্প্রদায়িক বীজ বপন করা হয়েছে মানুষের অন্ধবিশ্বাসে ২৫ বছর আগেই।

হাজার হাজার ফেসবুক ইউজার যারা গালাগালি দিয়ে কমেন্ট করছে তাদের বেশিরভাগেরই কিন্তু ১৯৯৩ সনে জন্মই হয় নি। তারা হয়তো তসলিমার লজ্জা বইটি পড়েই নি। আমি প্রথম তাঁর লজ্জা বইটির জার্মান ভার্সন হাতে পাই ১৯৯৫ এর ডিসেম্বরে।

হামবুর্গে এক প্রকাশনী উৎসবে তসলিমা নিজের উপস্থিতিতে, এবং সেদিনই প্রথম তসলিমার সাথে আমার দেখা হয়। লজ্জা বইটি পৃথিবীর ৩০টি ভাষায় অনুবাদ হয়েছে আর বাংলাদেশ সেটা অবৈধ ঘোষনা করেছে সেই ১৯৯৩ সালে। মুক্তিযুদ্ধের সেক্যুলার সরকার ৯ বছর হয় ক্ষমতায়, এর মাঝে অনেক ঘটনাই ঘটেছে, যুদ্ধাপরাধী দের বিচার হচ্ছে এমনকি বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট মহাবিশ্ব প্রদক্ষিণ করছে, কিন্তু লজ্জা'র অবৈধ ঘোষনা আমাদেরকে এখনো লজ্জা দিয়ে যাচ্ছে।


  • ৫২৫ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

মোনাজ হক

সম্পাদক আজকের বাংলা ডট কম

ফেসবুকে আমরা