রুকাইয়া সাওম লীনা

ফ্যাশন ডিজাইনার।

নাম, বংশ ও পরিচয় সংকট

জয়া আহসান? নাকি জয়া মাসউদ? নাকি জয়া? কলকাতার কোনো এক পত্রিকায় জয়ার নাম জয়া এহসান লেখায় জয়া তার ফেসবুকে নাম সংক্রান্ত ভুলের জন্য ক্ষুব্ধ মতামত ব্যক্ত করেছেন।

এটা শুনে ইতালীয় আর্টিস্ট ফ্রান্সেস্কা ক্যারল রোলার এর মলিন মুখটা আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল। সদা হাস্যোজ্জ্বল, কর্ম পটিয়সী এ শিল্পী সুদূর ইতালি থেকে বাংলাদেশের অন্যতম খ্যাতনামা শিল্পী প্রিমা নাজিয়া আন্দালিব এর আমন্ত্রণে আমন্ত্রিত হয়ে আমাদের দেশে এসেছিলেন। আমার নাম শুনে তার মনে খটকা লাগে। তিনি আমার সারনেম মানে বংশগত নাম জানতে চান। আমি জানাই আদতে আমার সারনেম নেই। তিনি অবাক হন! আমি বিবাহিত কিনা জানতে চান এবং বিবাহের পর স্বামীর নাম বউয়ের নামের সাথে যুক্ত করা হয় কিনা জানতে চান। আমি না বলি। তখন তিনি অবাক নয়নে কয়েক সেকেন্ড স্তম্ভিত হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থেকে উপস্থিতদের উদ্দ্যেশ্যে একই প্রশ্ন ছুড়ে দেন।

সবাই সমস্বরে জানায় আমাদের এখানে স্বামীর নাম গ্রহণের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। ফ্রান্সেস্কার চোখ চকচক করে ওঠে! বলে ওঠেন, “ বাহ্! দারুন তো! এটা একটা বিশাল ব্যাপার! তোমরা তো মুক্ত!”

আইনে আমাদের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তবু কি আমরা মননে মুক্ত হতে পেরেছি? আমরা কি প্রগতিশীল হতে পেরেছি? আমরা যে তা পারিনি তা আমাদের এম্ব্যাসেডর জয়া মাসউদ ওরফে জয়া আহসান দেশে বিদেশে প্রমাণ করে বেড়াচ্ছেন!

পোশাকে মর্ডান হলেই আমি তাকে মুক্ত বলতে পারলাম না। যে নাম দিয়েই মানুষকে আলাদা করে চিহ্নিত করা হয় সে নামেই যদি তাকে খুঁজে না পাওয়া যায়, তবে সে কিসের মুক্ত! পুরোনো স্বামীর নাম নিজের নামে বহন করার যুক্তি আমার জানা নাই! তিনি সিনিয়র মানুষ! তিনি হয়ত আমার থেকে ভাল বুঝবেন!

তবে আমি বুঝি, জয়া তার আহসান সারনামের জন্য জনপ্রিয় হননি। আর মাসউদ নামের জন্যও তার জীবনে ক্ষয় বৃদ্ধি কিছু ঘটেনি। এমনকি তার চেহারা, গায়ের রং, ফিগার এসব তার উপযাজক মাত্র। তার জনপ্রিয়তা মূলতঃ তার অভিনয় দক্ষতার জন্যই। যদি তা না হতো, তবে অমন ফিগার, গায়ের রং বা চেহারা অনেকেরই আছে। তাদেরকে আমরা তার সমতুল্য দেখতে পেতাম।

এবার অন্য কথায় আসি, বংশের কথা। বংশ কথাটা শুনলেই আমার বংশ গৌরবের কথা মনে পরে, মনে পরে জাত ভেদ আর বংশ ভেদের কথা! বাংলা সিনেমার চৌধুরী সাহেবের বংশ অহমিকার কথা মনে পরে। এবার একটু গল্প হোক! আমার ছেলের জন্মের পর আমার এক বান্ধবী, যে বহুদিন যাবত নিউইয়র্ক এ থাকে, সে মেসেঞ্জারে বারবার আমার ছেলের সারনাম জানতে চাচ্ছিলো। আসলে সে হয়ত ছেলের বাবার বংশ পরিচয় জানতে চাচ্ছিলো!

সারনেম মানে তো তাই আমার কাছে! পুরুষের বংশগত নাম! বংশগত নাম যে পুরুষের নাম, এতে আমার কোনো সন্দেহ নেই! আপনার যদি থাকে আমাকে জানাতে ভুলবেন না কিন্তু! আমার টা আমি এখানেই ব্যাখ্যা করছি। আপনারটা আপনি কমেন্ট বক্সে ব্যাখ্যা করুন! দয়া করে গালমন্দ করবেন না বা লাঠি সোঠা- রাম দা নিয়ে দৌড়ে আসবেন না!

আমার বংশগত নাম শেখ (আমার বাবা শেখ, তার বাবা শেখ, তার বাবার বাবা শেখ, তার বাবার বাবার বাবা শেখ)। যদি শেখ লীনা বা লীনা শেখ নাম হতো আমার তবে আমি শেখের বেটি বা পুতি হিসেবে চিহ্নিত হতাম! যখনই আমি নাম বলতাম। মানুষ আমাকে একটি নির্দিষ্ট গোত্রে ফেলে দিতো। আমার নাম শুনেই মানুষ একটি নির্দিষ্ট দলে আমাকে ভেবে নিতো। আমার বাবা এবং তার বংশগত নাম থেকেই আমার পরিচয় তৈরি হতো। যেটা এখন হয় না। আমার নাম আমার পোশাক নয়, আমার নাম আমার। আমাকে চিহ্নিত করার উপায় মাত্র!

এবার বলি পরিচয় সংকট নিয়ে, এটা নিয়ে বলতে গিয়ে আমার আবারও আর্টিস্ট ফ্রান্সেস্কা ক্যারল রোলার কথা মনে পড়লো। ফ্রান্সেস্কা ক্যারল রোলার প্রকৃত নাম ফ্রান্সেস্কা রোলা, ফ্রান্সেস্কা তার নাম, রোলা তার বংশগত নাম। ক্যারল নামটি তাকে দিয়েছেন একজন বিখ্যাত ফেন্স চিত্রপরিচালক। তার নামের উপাখ্যান আমাদের বলতে বলতে তিনি আমাদেরকে পরামর্শ দিলেন, ” যদি নিজের নাম ভাল না লাগে পরিবর্তন করে নিতে পারো। যদি আইনত না পারো, যেখানে আইন তোমাকে বাঁধতে না পারে সেখানে পরিবর্তন করে নিও। নিজেকে নিজের পছন্দের নামে পরিচিত করতে পারাটা জীবনের এক বিশেষ মুক্তি।”

এবার বিশ্ব নারী দিবসের স্লোগান “#EachforEqual ”... “ #প্রত্যেকেরজন্যসমতা”। আমি বলি, পুরুষের নামের পোশাকে নিজেকে জড়িয়ে সমতা আনা কি আদৌ সম্ভব! সব কিছুর শুরু যখন নামেই হয় তবে আগে নামে সমতা আনুন! তবেই না সত্যিকারের সমতার সূচনা হবে! হবে প্রত্যেকের জন্য সমতা!

1350 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।