কৃতকর্মের জন্য কেনো অনুতপ্ত নয় বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীরা?

বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ৩০, ২০১৭ ৬:১৬ PM | বিভাগ : দেশ/রাজনীতি


রাজাকার আল বদররা কখনই তাদের লুটপাট, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ, হিন্দুদের জোর করে মুসলমান বানানো থেকে নারী ধর্ষণ, গণহত্যার জন্য অনুতাপ কিংবা অনুশোচনা করে নি। এদিকে আমরা দেখেছি পৃথিবীর নানা প্রান্তে ঘটা যুদ্ধপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত লোকজন অনেকে ধরা পড়ে জেলখানায় আত্মহত্যা করেছে। তাদের ধর্ষণ, গণহত্যার বয়ান প্রকাশিত হবার পর পরিবারের লোকজনের কাছে লজ্জ্বিত হয়ে নিজেদের জীবন শেষ করে দিয়েছে। গতকালই একজন বসনিয়া যুদ্ধের অপরাধী আদালতে রায় পড়ে শোনানোর সময় পয়জন পান করে আত্মহত্যা করেছে। এইসব আপরাধীদের পরিবারগুলো তাদের পিতার কিংবা সন্তানের অপরাধে সমাজে রাষ্ট্রে ছোট হয়ে থাকে। একজন ধর্ষক কিংবা গণহত্যাকারীর সন্তান হওয়া তো গর্বের বিষয় নয়। কিন্তু এক্ষেত্রে আমরা একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের দেখি নিজেদের অপরাধ প্রমাণিত হবার পরও বুক ফুলিয়ে হাঁটে। তাদের সন্তানরা পিতাকে নিয়ে গর্ব করে। বাবা একাত্তরে হত্যা করেছিলো বা হত্যায় সহায়তা করেছিলো কিংবা নারী ধর্ষণ করেছিলো বা ধর্ষণের ফতোয়া দিয়েছিলো জেনেও কেনো বাবাকে অপরাধী মনে করে না?

পাপ-পুণ্যে বিশ্বাস করা সাধারণ ধর্ম বিশ্বাসী মানুষ এক জীবনের অপরাধের কথা মনে করে নিজ নিজ ধর্মের ঈশ্বরের কাছে বিগত জীবনের অপরাধের ক্ষমা চেয়ে কান্নাকাটি করে। নারী ধর্ষণ করার মতো অপরাধ কিংবা অন্যের সম্পত্তি লুট করেছিলো এ ধরণের লোকদের কেউ কেউ বুড়ো বয়েসে অতিমাত্রায় ধার্মীক হয়ে তাদের পূর্ব কৃতকর্মের জন্য ধর্মের শরণাপন্ন হয়ে পানা চায়। কিন্তু বাংলাদেশের কোনো যুদ্ধাপরাধী, কিংবা পাকিস্তানী সোলজারদের কেউ ৭১ সালের যুদ্ধে নারী ধর্ষণ, গণহত্যা জন্য অনুতপ্ত হয় নি। এক্ষেত্রে তারা সব সময় যে কথাটি বলে তা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। তারা বলে একাত্তর সালে আমরা কোনো ‘অন্যায়’ করি নি। এই কথাটিতে কূটনৈতিক মারপ্যাচ আছে। কোনো অন্যায় করি নি মানে এটা নয় তারা যা করেছে তাকে অস্বীকার করছে- বরং বলতে চাইছে- একাত্তরে তারা যা করেছে তা কোনো মতেই কোনো অন্যায় কাজ নয়।

মানুষের স্বাভাবিক নৈতিকতাবোধের উপর ধর্মের চাপিয়ে দেয়া নৈতিকতা প্রভাবিত করে এবং মানবিক নৈতিকতা এক্ষেত্রে ধর্মীয় বিশ্বাসের কাছে পরাজিত হয়। যেমন অন্যের সম্পত্তি কেড়ে নিতে নেই- এটি সারা পৃথিবীতে নৈতিকতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। মানুষ পথে কুড়িয়ে পাওয়া টাকাও ভোগ করতে বিবেকে বাঁধে। কিন্তু ধর্ম যদি বলে বিশেষ এই এই ক্ষেত্রে অন্যের সম্পত্তি কেড়ে নেয়া কোনো অন্যায় কাজ নয়। কিংবা বিশেষ এই নারীদের সঙ্গে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সেক্স করা কোনো অন্যায় নয়- তাহলে কি মানুষ নৈতিক মান্ডেট পেয়ে যাবে না? রাজাকার আল বদরদের রাজনীতি ছিলো ইসলামী রাজনীতি। পাকিস্তানকে তারা মনে করতো মুসলিম মিল্লাতের শক্ত ভীত। তুরস্কের খেলাফত ভেঙ্গে যাবার পর ইসলামী রাজনীতি পাকিস্তানকে ঘিরে ভাবিকালে গোটা ভারতবর্ষ জুড়ে ইসলামী খেলাফত গড়ার স্বপ্ন দেখছিলো। সে সময় গোলাম আযম বলেছিলো, পাকিস্তান অখন্ড থাকলে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালী মুসলমান একদিন না একদিন ন্যায্য পাওনা আদায় করে নিবেই কিন্তু পাকিস্তান ভেঙ্গে গেলে ইসলামী শক্তি খর্ব হয়ে যাবে। মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিলো বাঙলী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে। কিন্তু পাকিস্তানের ইসলামী দল, পীর, আলেম, আউলিয়া, সুফি, দরবেশ সবার কাছেই মুক্তিযুদ্ধ ছিলো ইসলামের বিরুদ্ধে কাফের ভারতের ষড়যন্ত্র। আর এই ষড়যন্ত্রে জড়িত আওয়ামী লীগ। ইসলামের চোখে হিন্দুরা কাফের। ভারত সেই অর্থে কাফেরদের দেশ। আওয়ামী লীগ ভারতের সমর্থন নিয়ে স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলো। যে কারণে মুক্তিযুদ্ধের একদম শুরুতেই হিন্দু এবং আওয়ামী লীগ সমর্থক মুসলমান উভয়েই ছিলো পাকিস্তানী সোলজার এবং আল বদর রাজাকারদের টার্গেট। আওয়ামী লীগ সমর্থক মুসলমান হলেও তাকে হত্যা করা ইসলামপন্থিদের কাছে ছিলো জায়েজ। কারণ তারা দেখেছে কুরআনে আল্লাপাক ঘোষণা দিয়েছেন, ‘তারা চায় যে, তারা যেমন কাফের, তোমরাও তেমনি কাফের হয়ে যাও, যাতে তোমরা এবং তারা সব সমান হয়ে যাও। অতএব, তাদের মধ্যে কাউকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না, যে পর্যন্ত না তারা আল্লাহর পথে হিজরত করে চলে আসে। অতঃপর যদি তারা বিমুখ হয়, তবে তাদেরকে পাকড়াও করো এবং যেখানে পাও হত্যা করো। তাদের মধ্যে কাউকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না এবং সাহায্যকারী বানিও না’ (সূরা নিসা ৪:৮৯)।

এই আয়াত নাযিল হয়েছিলো মক্কার কাফেরদের সঙ্গে মদিনার নব দীক্ষিত মুসলমানদের বন্ধুত্ব ছিন্ন করতে। সে সময় মদিনায় হিযরত করা মুসলমানদের কেউ কেউ ইসলাম গ্রহণ করে মক্কায় ফিরে আবার পৌত্তলিক ধর্মের সঙ্গেও সম্পর্ক রাখতো। এইসব ‘মুনাফিকদের’ উদ্দেশ্যে বলা হয়েছিলো বন্ধুত্ব ছিন্ন করতে। কিন্তু তারপরও যদি বন্ধুত্ব চালিয়ে যায়, আহ্বানে বিমুখ হয় তাহলে পাকড়াও করে হত্যা করতে কুরআন নির্দেশ দিয়েছে। ৭০ সালের নির্বাচনের পর থেকেই লীগ সমর্থকদের ইসলামপন্থি দলগুলোর পক্ষ থেকে ভারতের চক্রান্তে বিভ্রান্ত না হতে বলা হচ্ছিলো। এটা না শুনে তারা স্বাধীনতার পক্ষে মত দেয়াতে যুদ্ধ তাদের ধরে পাকড়াও করে হত্যা করা অন্তত কুরআন অনুযায়ী কোনো অপরাধ নয়। বাকী থাকে কাফের হিন্দুরা। সে সময় শর্ষীনার পীর সাহেব ওপেন ফতোয়া দিয়েছিলো হিন্দু নারীরা গণিমতের মাল। তাদের ভোগ করা ইসলাম ও মুসলিম মিল্লাত রক্ষা করতে আসা পাকিস্তানী সোলজারদের জন্য হালাল। বলাই বাহুল্য পীর সাহেব এখানে তার ব্যক্তিগত মত দেন নি। প্রথমে হাদিস থেকে প্রমাণ দেখাই ইসলাম কিভাবে কুরআনে বিধর্মী যুদ্ধলব্ধ নারীদের পাইকারী হারে ধর্ষণ করতে অনুমোদন দিয়েছিলো। ‘আবু সাদ খুদরি বর্ণিত, হুনায়নের যুদ্ধের সময় নবী একদল সৈন্যকে আওতাস এ পাঠালেন, তারা সেখানে যুদ্ধ করলো ও একদল নারীকে বন্দী করলো। কিন্তু সৈন্যরা বন্দিনী নারীদের সাথে সেক্স করতে ইতঃস্তত করছিলো কারণ তাদের পৌত্তলিক স্বামীরা তখনও জীবিত ছিলো। আর তখনই নাজিল হলো ‘নারীদের মধ্যে তাদের ছাড়া সকল সধবা স্ত্রীলোক তোমাদের জন্যে নিষিদ্ধ; তোমাদের দক্ষিণ হস্ত যাদের মালিক হয়ে যায়-এটা তোমাদের জন্য আল্লাহর হুকুম( সূরা ৪:২৪)’। সহি মুসলিম, বই ৮, হাদিস ৩৪৩২

এই ‘দক্ষিণ হ্স্ত’ মানে দাসী এবং যুদ্ধলব্ধ বিধর্মী নারীরা। আমার কথা বিশ্বাস করার কোনো প্রয়োজন নেই। বরং হাদিস পড়ে দেখুন যুদ্ধলব্ধ নারীকে ইসলাম শো’কেসে সাজিয়ে রাখতে বলেছে নাকি কীর্তন গাইতে বলেছে। ‘আবু সাইদ আল কুদরি বর্ণিত, সে যখন নবির সাথে বসেছিলো জিজ্ঞেস করলো, হে নবী, আমরা কিছু নারী বন্দিনী হস্তগত করেছি আর আমরা তাদের সাথে যৌনমিলন করতে চাই। কিন্তু আমরা সতর্কভাবে তা করতে চাই। এই ব্যাপারে আপনার কি অভিমত? নবী বললেন- তোমরা কি সত্যিই সেরকম করে থাকো? আল্লাহ সমস্ত আত্মাই সৃষ্টি করে রেখেছেন, যারা জন্মের জন্য নির্ধারিত তারা জন্ম লাভ করবেই’। বুখারি, বই-৩৪, হাদিস-৪৩২

কোনো নারী নিশ্চয় হানাদার শত্রু পক্ষের লোকজনের সঙ্গে স্বেচ্ছায় সেক্স করতে রাজি হবে না। সেক্ষেত্রে ঐ নারীকে জোর করেই সেক্স করতে হবে। এবার আপনারাই বলুন এটাকে ধর্ষণ বলবেন নাকি প্রেম-ভালোবাসা বলবেন? গণিমতের আওতায় কেবল নারীই নয়, শত্রুপক্ষের ধন-সম্পত্তি, টাকা পয়সাও অন্তর্ভূক্ত। এইসব হাতিয়ে নেয়া তাই মোটেই কোনো অপরাধ নয়। যে কারণে একাত্তার সালে রাজাকার-আল বদররা হিন্দুদের সোনাদান টাকা পয়সা লুট করে কোনো অপরাধবোধেই আক্রান্ত হয় নি। বড় বড় কুরআন তাফসিরকারকরা হিন্দু বাড়ি লুটে নেতৃত্ব দিয়েছিলো। পাকিস্তানী ক্যাম্পে হিন্দু নারীদের সাপ্লাই দিয়েছিলো আর তার জন্য তাদের ধর্ম বিশ্বাস, পরকাল বিশ্বাস, আল্লার ভয় কিছুতেই সমস্যা হয়নি কারণ স্বয়ং আল্লাহ কুরআন হাদিসে এসবকে বৈধতা দিয়েছেন। কুরআন বলছে-

‘আপনার কাছে জিজ্ঞেস করে, গনিমতের হুকুম। বলে দিন, গণীমতের মাল হলো আল্লাহর এবং রসূলের। অতএব, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং নিজেদের অবস্থা সংশোধন করে নাও। আর আল্লাহ এবং তাঁর রসূলের হুকুম মান্য কর, যদি ঈমানদার হয়ে থাক। সূরা আনফাল’ (৮:০১)

‘সুতরাং তোমরা খাও গনিমত হিসাবে তোমরা যে পরিচ্ছন্ন ও হালাল বস্তু অর্জন করেছ তা থেকে। আর আল্লাহকে ভয় করতে থাকো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, মেহেরবান।সূরা আনফাল’ (৮:৬৯)

‘এবং বিপুল পরিমাণে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ, যা তারা লাভ করবে। আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। সূরা আল ফাতাহ’ (৪৮:১৯)

আল্লাহ তোমাদেরকে বিপুল পরিমাণ যুদ্ধলব্ধ সম্পদের ওয়াদা দিয়েছেন, যা তোমরা লাভ করবে। তিনি তা তোমাদের জন্যে ত্বরান্বিত করবেন। তিনি তোমাদের থেকে শত্রুদের স্তব্দ করে দিয়েছেন-যাতে এটা মুমিনদের জন্যে এক নিদর্শন হয় এবং তোমাদেরকে সরল পথে পরিচালিত করেন। সূরা আল ফাতাহ ৪৮:২০

পৃথিবীতে সেমিটিক এবং ইহুদীদের যত নবীর কথা জানা যায় তারা কেউই যুদ্ধবন্দিনী নারীদের ধর্ষণ, লুটপাট করে শত্রুদের ধনসম্পদ লাভ করার অনুমতি দিয়েছেন তার কোনো বর্ণনা নেই। সেটা যে সত্য তা এই হাদিস থেকে স্পষ্ট জানা যায়। ‘জাবির বিন আব্দুল্লাহ বর্ণিত, নবী বলেছেন, পাঁচটি জিনিস আমার জন্য বৈধ করা হয়েছে যা অন্য কোনো নবীকে বৈধ করা হয় নি, যেমন, ত্রাস সৃষ্টির দ্বারা আমাকে বিজয়ী করা হয়েছে, সারা দুনিয়া আমার প্রার্থনার জায়গা করা হয়েছে, গনিমতের মাল আমার জন্য বৈধ করা হয়েছে, কেয়ামতের মাঠে আমাকে মধ্যস্ততা করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে ও আমাকে সমস্ত মানব জাতির জন্য পাঠানো হয়েছে অথচ অন্য নবীদেরকে তাদের স্ব স্ব জাতির জন্য পাঠানো হয়েছে। বুখারি, বই -৭, হাদিস নং-৩৩১
জাবির বিন আব্দুল্লাহ বর্ণিত, আল্লাহর নবী বলেছেন, গণিমতের মাল আমার জন্য বৈধ করা হয়েছে। বুখারি, বই-৫৩, হাদিস-৩৫১।

এবার বলুন কেনো রাজাকার, আল বদররা তাদের ধর্ষণ, গণহত্যা, লুটপাটের জন্য অনুতপ্ত হবে? কেনো মনে হবে যুদ্ধের সময় তারা যা করেছে তা কোনো অপরাধ? একইভাবে পারিবারিক ইসলামী শিক্ষা পেয়ে একজন রাজাকার, আল বদরের সন্তান তাদের বাবা, চাচা, দাদাকে সাধারণ ধর্ষক, লুটতরাজকারীর মতো ঘৃণা করবে কিভাবে? এখানে ধর্ম সব কিছুকেই বৈধ করে দিয়েছে। তাই বসনিয়ার যুদ্ধাপরাধী বিষ পান করে আত্মহত্যা করলেও সাঈদীর বিন্দু পরিমাণ অনুশোচনা হয় না।


  • ১৪৪১ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

সুষুপ্ত পাঠক

বাংলা অন্তর্জালে পরিচিত "সুষুপ্ত পাঠক" একজন সমাজ সচেতন অনলাইন একটিভিস্ট ও ব্লগার।

ফেসবুকে আমরা