জেলা শহরের চিকিৎসাশৈলী ও ডেঙ্গুর শঙ্কায় একদিন

শুক্রবার, আগস্ট ১৬, ২০১৯ ৩:২৩ PM | বিভাগ : প্রতিক্রিয়া


আমার অনিয়ন্ত্রিত ভ্যাগাবন্ড জীবনের বিরুপ প্রভাব প্রায়ই আমার শরীরের উপরে পরে, পাত্তা দিই না, বিশেষ আমলে নেই না। এই ধরুন সপ্তাহখানেক আগে যখন খুলনায় সবে ডেঙ্গী তার উপস্থিতি জানান দিলো তখনই একবার জ্বর হয়েছিলো, পাত্তা দিইনি যথারীতি প্যারাসিটামলের ওপর দিয়েই গেছে।

হাসপাতালে নিয়মিত আসা যাওয়া থাকলে পরজীবী ছড়ানোটা বেশ স্বভাবসিদ্ধই মনে হতে পারে, এজন্যে কয়েকজন কর্তব্যরত চিকিৎসকও মারা গিয়েছেন, আমার কাছে তাদের মর্যাদা শহীদমাফিক, বাকিদের কাছে যাই হোক। তাদের আড়ম্বরহীন এ চলে যাওয়া নিয়ে সোস্যালে ঝড় ওঠেনি অথবা রাষ্ট্রীয় কুহুগীত বেজে ওঠেনি (এ নিয়ে আমি যে বেশ চিন্তিত তাও নয়)। যাহোক ও কথা আরেকদিন হবে এখন কাজের কথায় ফিরি যে উদ্দ্যেশ্যে এই সন্ধ্যার চায়ের দোকানে বসে পকেট থেকে মুঠোফোনটা বের করা- সেই মোদ্দাকথায়।

আমার বাসা একটা নিরিবিলি জেলা শহরে ঈদের ছুটিতে বলতে গেলে এক রকম মায়ের পীড়াপীড়িতেই বাড়িতে এলাম। বাসার সামনের ঢালু জায়গায় উপর্যুপরি বৃষ্টিতে দীর্ঘদিন বয়স্ক জল জমে কালো হয়ে গেছে, ডেঙ্গীর আদর্শ বাসস্থান। সেদিকে তাকালেই আমার ডেঙ্গী ওয়ার্ডের কথা মনে পড়ে -আরো বেশি চিন্তায় পড়ি। কর্পোরেশনের সেদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই (বরাবর যেমন থাকে না সামনের রাস্তাপাশের আটকে পড়া ড্রেনের দিকেও)-এটা আমাদের বরাবরই জানা কেননা এদেশের প্রেক্ষাপটে চোর পালালেই শুধুমাত্র গেরস্থের মগজাস্ত্রে সান ধরে। তা যাহোক বাসায় আসার পরদিন থেকে জ্বর, সাথে একটু মাথাব্যাথা, জয়েন্ট পেইন থাকায় উপরন্তু সামনে জমে থাকা কালো জল বারবার দৃষ্টিসীমায় চলে আসে বলেই আমি বেশ চিন্তিত ছিলাম। সকাল থেকে বৃষ্টির অনমনীয় মনোভাব দেখে দুপুরের দিকে ছাতা মাথায় বেড়িয়ে পড়লাম।

হাসপাতালে টিকিট কাউন্টারের কাছে দেখলাম আজ জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে চিকিৎসা ফ্রি -যদিও বুঝলাম না ওনারা চিকিৎসা বলতে ঠিক কী বোঝেন আর বা কী বোঝালেন! দেখলাম টিকিটের গায়েও সেই একই ফ্রি'র চোখে লাগা বিজ্ঞাপনচিত্র।

আগেই বলি এটা আমার বাসার অপজিটে জেলা সদর হাসপাতাল। কাউন্টারের চুলে ক্লিপ আটা টিপটপ আপুটি বললেন একশো চৌদ্দ নাম্বারে যেতে। যেতে যেতে দেখলাম ১১৪ বাদে অন্য কোনো রুমে হয়তো ডাক্তার নেই অথবা থাকলেও কেউ তখন রোগী দেখছেন না হয়তো- শুধু ১১৪ নাম্বারের সামনে উপচে পড়া ভীড়। টারশিয়ারি হেলথকেয়ার সেন্টারগুলোতে তবু রোগীরা দরজার বাইরে অপেক্ষা করে, ডাক পড়লে একে একে ঢোকে, এখানে দেখলাম সব চিচিংফাক- কুঁচো চিংড়ির মতো ভীড়ে ছিটকে পড়ছে আর সুযোগ খুঁজছে ডাক্তারের কাছাকাছি ঘেঁষার। এই ভীড়ে পরিচয় দিয়ে কিছু সুবিধা নিতেও ক্যামন একটা দ্বিধাবোধ করছিলাম, যদিও আমি খুব একটা বিবেকবান ও আদর্শবাদী নই। ১০-১২ জন রোগীর সাইনসিম্পটম শুনে বুঝলাম ঈদের ছুটিতে শহরবাসী মানুষ শুধু পকেটে বোনাস নিয়েই আসেনি-বরং ডেঙ্গীর জীবানুও বোনাস হিসেবে পেরিফেরি অঞ্চলগুলোতে ছড়িয়ে দিতে এসেছে। ডাক্তারের হিমশিম খাওয়ার অবস্থা-পারলে রোগীরা তার টেবিলের ওপর উঠে পড়ে। ইতোমধ্যেই আমি ভীড় টপকে বা সাঁতরেই বলুন ডাক্তারের ডেস্ক এ পৌঁছেছি, কোনোক্রমে সুযোগ বুঝে পরিচয় দিয়ে আসল কথাটা পাড়লাম- যে আমার ডেঙ্গুর সাইন সিম্পটমস দেখা যাচ্ছে আমাকে সিবিসি, প্লাটিলেট কাউন্ট আর ডেঙ্গী এনএস-১ টেস্টটা ফ্রি করার পারমিশনটা লিখে দিলে বিশেষ উপকৃত বোধ করি। উনি বললেন আজ জাতীয় শোকদিবস উপলক্ষে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প চালু আছে-সুতরাং সবই ফ্রিতে।

উপরন্তু এখানে বলে রাখি কিছুদিন আগে পত্রিকায় এবং হাসপাতালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি প্রজ্ঞাপনে চোখ রেখে দেখেছিলাম- যে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গীর টেস্টের খরচ কমিয়ে দেয়া হয়েছে এবং সরকারি হাসপাতালে তা বিনামূল্যে করার ঘোষণা দেয়া হয়েছে-যাকে বলে একদম ফ্রি! ফ্রি! ফ্রি- ছোটবেলার কোনো এক ওয়াশিং পাউডারের বিজ্ঞাপনগুলো কথা মনে পড়ে যায়।

কিন্তু এখানেই দেখলাম কথা ও কাজের মধ্যেকার ফারাক এবং কিভাবে এখানে একটা ভ্যাকুয়াম চ্যানেল তৈরি করে জনগণের মগজের সাথে খেলায় রপ্ত স্বাস্থ্যসেবা দপ্তর।

প্রথমেই এনএসওয়ান টেস্ট- এনএসওয়ান টেস্ট মোটেই বহির্বিভাগের রোগীদের জন্যে ফ্রি না, ইউজুয়াল রেটই বহাল-যদি না রোগী, ভর্তি রোগী হয়। আবার রোগীর খুবই খারাপ অবস্থা না হলে অথবা টেস্ট রিপোর্টে ডেঙ্গী কনফর্ম না দেখে শুধুমাত্র জ্বর দেখে রোগীর ভর্তি নেবার নিয়ম না, নিচ্ছেও না (যদিও এবারের ডেঙ্গী আগের মতো বেশী সময় দিচ্ছে না, দুয়েকদিনের জ্বরেই ড্রাস্টিক্যালি নেমে যাচ্ছে প্লাটিলেট এর সাংখ্যিক মান)

তাহলে আগে টাকা খরচা করে টেস্ট করো তারপরে -ভর্তি। মানে সোজাভাত ঘুরিয়ে খাওয়া মধ্যে থেকে জনরোষ ধামাচাপা দিতে ফাঁকা আওয়াজ তর্জন-গর্জনই সার

তাছাড়া সিবিসি, প্লাটিলেট কাউন্ট পরীক্ষা ভর্তি বা না- ভর্তিওয়ালা কারো জন্যেই মুফত মে হচ্ছে না।

যা হোক আমি আর,এম,ও'র কাছে গেলাম, পরিচয় দিলাম, উনি শর্ট স্লিপে প্লাটিলেট, সিবিসি ফ্রি করে দিলেন- এর মধ্যে শোক দিবসে মিষ্টি বিতরন করে যাচ্ছে একদল-দেখলাম, আর, এম, ও সাহেব স্নেহসুলভ ব্যবহারে শোক দিবসের মিষ্টিমুখও করলাম-বেশ মডারেট লোক। ভর্তির ফর্মও করে দিলেন যাতে এনএস-১ ও ফ্রি করতে পারি (যদিও টেস্টের পর ভর্তির কাগজটা রেখে দেয়া হয়েছে)। পারতপক্ষে দেখলাম স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ডেঙ্গী দমনে কতটা তৎপর!

এবার দ্বিতীয় আইমিন শিরোনামের প্রথম টপিকটাতে আসি। আমি যখন জনসমুদ্র পাড়ি দিয়ে আউটডোর মেডিকেল অফিসারের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম- (তার এক বাহিরের রোগী হাসপাতালে তাকে রিপোর্ট দেখাতে আসার সুবাদে) তার প্রেসক্রিপশনের ডিগ্রিটা আমার চোখে পড়ে- ডি_এ_এম_এস(ডি ইউ) মেডিকেল অফিসার (পিরোজপুর সদর হাসপাতাল), কিঞ্চিৎ অবাক লাগলো। 

এম বি বি এস ছাড়াই একজন সরকারি মেডিকেল অফিসার, বাইরে তো বহুলোক এম_বি_বি_এস শেষ করেও চাকুরীহীনতায় ভুগছে, বুভুক্ষের মতো চাকরির লাইনে আছে- সদ্যবিবাহিতরা যুবতী বউ বাসায় ছেড়ে হাসপাতালে হাসপাতালে ক্ষ্যাপ দিচ্ছে, কেউ আবার ক্যাডার চেঞ্জ করে এডমিন, পুলিশ ইত্যাদিতে যাচ্ছে- বহু সরকারি মেডিকেলের ছাত্ররাও যাদের দলভুক্ত।

পরে ইন্টারনেটের সুবাদে দেখলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (হয়তোবা অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও) এভাবে আয়ুর্বেদ মেডিসিন নামে একটা ডিপার্টমেন্ট আছে যাতে অনার্স করা যাচ্ছে- যদিও ওনার ট্রিটমেন্ট দেখলাম টিপিক্যালি এলোপ্যাথিক জেনেরিক মেডিসিনই, একটা কেস দেখলাম ফ্র‍্যাকচারের রোগী- এক্সরে তে বোঝা গ্যালো সেটা সিম্পল টাইপ অব টিবিয়াল ফ্রাকচার-তিনি সে রোগীর কেসটাও কমপ্লেক্স বলে ইদের ছুটির পর তাকে ঢাকা নিয়ে যেতে বলেছেন-তিনি এ কেসে হাত দিতে চান না।

এই কথায় বলি, ঢাকা ভার্সিটিতে সম্ভবত মেডিসিন নামে একটা ডিপার্টমেন্টও আছে, ডিইউর আয়ুর্বেদ মেডিসিন ও শুধু মেডিসিন দুটো এক ডিপার্টমেন্টও হতে পারে (বিপুলা এ ধরনীর কতটুকুই বা জানি!), আমি নিশ্চিত নই। যার একজন গর্বিত সদস্য বাড়ি আমার এলাকার, এই সেলিব্রিটি ডিগ্রিধারী প্রবল প্রতাপে নামের আগে ডাক্তার লাগিয়ে ঘুরে বেড়ান (যদিও আইনত শুধুমাত্র মেডিকেল প্রফেশনাল ছাড়া অন্যকারো নামের আগে ডাঃ বা অন্য পদবী যেমন, এডভোকেট ইত্যাদি লাগানোর এখতিয়ার আইনত নেই এবং তা দণ্ডনীয় হতে পারে- এমনকি অন্য বিষয়ে ডক্টরেটধারীদেরও না)। 

যদিও এদের ব্যাপারে আমার কোনো বিদ্বেষ বা আপত্তি নেই, যদিবা অনেকে ভাবতেই পারেন এটা প্রফেশনাল জেলাসি-বিশ্বাস্য না হলেও বলি বৈষয়িক-জাগতিক ব্যাপার স্যাপার মূলত টানে না আমাকে, কখনো টানেওনি- আমি সব সময়ই চেয়েছি জীবনানন্দের মতো কিছু জৌলুসহীন ব্যর্থ জীবন।

এইসব ডিগ্রীধারী মেডিকেল অফিসারদের ক্ষেত্রে আমার নিজস্ব মতামত হলো - এরা যদি এম বি বি এস ওয়ালাদের সাথে উপযুক্ত টেক্কা দিয়েই বিদ্যার জোরে এতদূরে এসে থাকেন অবশ্যই এদের যোগ্যতার সাবাসি দিতেই হয়- সেইসাথে শঙ্কাও হয় মেডিকেল কলেজগুলোর শিক্ষার মানের কথা চিন্তা করে। তাই সুবিবেচনায় সরকারের মেডিকেল কলেজগুলোর সংখ্যার সাথে মানের প্রতিও নজর দেয়া উচিত। শুধুমাত্র ভোটের এজেন্ডা বাস্তবায়নে জেলায় জেলায় উপাচারহীন নিম্নবর্গের মেডিকেল কলেজ স্থাপন করে জনগণের নজরে একটা কাঠামোগত উন্নয়নের দৃশ্যপট তুলে ধরাটা তবে কোনো কাজের কথা না (এই ধরুন উদাহরণস্বরুপ বলি খুলনার মতো বিভাগীয় শহরের মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সরকারি এম্বুলেন্সের সংখ্যা আশ্চর্যজনকভাবে ১ টি (কথায়ঃ এক), তার অবস্থাও বেহাল তার চালকের মতোই- বলাবাহুল্য।


  • ৯৪ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

কৌশিক মজুমদার (শুভ)

এমবিবিএস ছাত্র

ফেসবুকে আমরা