কোটা সংস্কার প্রসঙ্গ

মঙ্গলবার, এপ্রিল ১০, ২০১৮ ৭:৩৭ PM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


দেশের প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয় আর কলেজের ছাত্রছাত্রী একযোগে আন্দোলন করে চলেছে চাকুরীর ক্ষেত্রে কোটা সংস্কারের জন্য। গতকাল মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি হিসেবে দলের সাধারন সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, মাহবুবুল হক হানিফ এবং জাহাঙ্গীর কবির নানকসহ আরও ১১ জন নেতার উপস্থিতিতে ছাত্রদের প্রতিনিধি দলের সাথে বৈঠক হয়। ।সুস্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত না দিলেও পরীক্ষা নিরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত জানানো হবে বলে বলা হয় এবং ৭ই মে অবধি আন্দোলন স্থগিত করার সিদ্ধান্ত আসে।

কিন্ত বারবার হতাশ হওয়া ছাত্র-ছাত্রীরা আবার আজ সকাল ১১ টা থেকে আন্দোলন করবে বলে ঘোষনা দিয়েছে। যদি তাদের ক্যাম্পাসে আন্দোলন করেন তা করতেই পারেন। এবং শুরুতে তা সহিষ্ণু আন্দোলনই ছিলো। পরে ভিসির বাসভবনে হামলা অবধি বিষয়টি গড়ায়। কেউ কেউ মনে করেছেন চাকরীর কোটা নিয়ে ভিসির কি করার আছে?

একটা বিষয় স্পষ্ট করে বলা দরকার যে, অনার্স পাশ করেই চাকুরীর জন্য আবেদন করা যায়। অনেক ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পরপরই চাকুরীর পরীক্ষা দিতে প্রস্তুতি শুরু করেন। সে মাস্টার্স কিংবা এমফিল এর পাশাপাশি চাকুরীর আবেদন ও পরীক্ষাগুলি চালিয়ে যায়। সেখানে প্রত্যাশিত ফল না পাওয়া তাকে হতাশ করবেই। তাদের এই যৌক্তিক আন্দোলনে তাদের প্রতি সমবেদনা না জানানোতে যা প্রকাশ পায় তা হলো ছাত্র-ছাত্রী যথেষ্ট যোগ্য নয় বলে তাঁর নিরব সমর্থন আছে। কিন্ত আমি  মনে করি যে ছাত্র-ছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া অবদি যোগ্যতা রাখলো সে চাকুরীতে গিয়ে যোগ্যতা হারালো মানে সে দায় তার নিজের নয় বরং তার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের। আর ভিসি মহোদয় যদি তার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা এবং শিক্ষকদের প্রতি যথেষ্ট ভরসা রাখেন তবে অবশ্যই আমাদের ছাত্র-ছাত্রীদের এই যৌক্তিক দাবিকে সমর্থন জানাবেন এবং তাদের হয়ে উপর মহলের কাছে সুপারিশ করবেন। কারণ তিনি ছাত্র-ছাত্রীদের অভিভাবক। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির এই ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর বাবা-মায়েদের যতটা না শাসন থাকে তার বেশী তাঁর এ অধিকার। আর ছাত্রছাত্রীদের বর্তমান ঠিকানাই এই ক্যাম্পাস। সুতরাং তাদের অবস্থান নেয়ার আর কোনো জায়গাও নাই। তাদের ওপর আক্রমন হলে তা থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব ভিসি মহোদয়েরই ওপর বর্তায়। এবং আশা করি তিনি তা শক্ত হাতে করবেন।

দেশের কত ছাত্র-ছাত্রী বেকার সমস্যায় ভুগছে তা ভেবে দেখেছেন? এ বিশাল সংখার বেকারত্বের দায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থার ওপর অনেকাংশে পড়ে। বেসরকারী খাতে যদি পর্যাপ্ত নিয়োগের সুযোগ থাকতো আর সম্মানীও পর্যাপ্ত হতো এবং  ছাত্র ছাত্রীরা পড়াশোনা শেষে  ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা পায় তবে সরকারী চাকুরী সেক্ষেত্রে অনেকের না হলেও চলে। কিন্ত প্রথমত বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের নিয়োগকর্তাদের কাছে প্রায়শঃই দক্ষ কর্মীর অভাব আছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। চাকুরী পরবর্তী প্রশিক্ষণ খরচ বিবেচনায় তারা কর্মীর বেতন সীমিত ধার্য করেন। চাকুরীর সংকটে বেকার ছাত্র-ছাত্রী বাধ্য হয়ে কম বেতনে চাকুরী নেন। উপরন্তু সরকারের যথেষ্ট নজরদারি না থাকায় এ সকল প্রতিষ্ঠান পরবর্তীতে বেতন সুবিধা বৃদ্ধি করে না এমনকি জনশক্তি রপ্তানীকারক বিভিন্ন এজেন্সীর কাছ থেকে ন্যূনতম বেতনে নতুন কর্মী নিয়োগ দেন। অগত্যা কিছুদিন পর চাকরী হারানোর হুমকির মুখে থাকে আমাদের মেধাবী ছাত্রছাত্রী।

সরকারী চাকুরীর ক্ষেত্রে এ পর্যন্ত দেখা গেছে ৫৬% কোটা আর ৪৪% মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ হয় ১ম ও ২য় শ্রেণির চাকুরীতে। আর ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণির চাকুরীতে এ কোটা বেশী বৈ কম নয়। তাই ছাত্র-ছাত্রীদের দাবি কোটা ১০ শতাংশে কমিয়ে আনা হোক। আর মন্ত্রণলায় থেকে বলা হচ্ছে ৩৩ তম বিসিএস এ মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ ছিলো ৭৭.৪৪% যা ৩৫ ও ৩৬ তম বিসিএস এ ছিলো যথাক্রমে ৬৭ % ও ৭০%। উপরন্তু কোটায় যোগ্য প্রার্থী না পাওয়া গেলে মেধাতালিকা থেকে প্রার্থী  নিয়োগ করা হয়। সম্প্রতি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে কোটার ফাঁকা পদ পূরণ নিয়ে একটি ব্যাখ্যা দেয়া হয় যা আরও পরীক্ষা নীরিক্ষা করতে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দেন। সুশীল সমাজ, গবেষক সবারই মন্তব্য কোটাকে সহনীয় পর্যায়ে আনতে হবে।

বলতে পারেন যারা প্রতিযোগিতায় যুদ্ধ করে টিকে গেলেন তাদের কতজনই বা উপযুক্ত ক্যাডার কিংবা পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা পান? আমাদের বিসিএস এর মতন গুরুত্বপূর্ণ সরকারী চাকুরীর নিয়োগে পদ্ধতিগত ত্রুটির কথাই বলি। কিছুদিন আগে বিসিএস পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম হওয়া মেডিকেল ছাত্রী ডা. সুবর্না তার উপযুক্ত উদাহরণ। এর ফলে পরবর্তীতে অ্যাম্বেসী, হাইকমিশনে দেখা যায় কর্মকর্তাদের খারাপ ব্যবহার,অদক্ষতা আর কাজের প্রতি ভীষণ অমনোযোগ।

ডাক্তার, ইন্জিনিয়ার সহ বিভিন্ন বিশেষায়িত ক্যাডার সুবিধা থাকা স্বত্তেও প্রশাসন, পুলিশ, পররাষ্ট্র ক্যাডারের মতন স্পর্শকাতর ক্যাডারে নিয়োগ সুবিধা থাকলে এমনটি হবেই। কিন্ত একই সাথে তাদের বিশেষায়িত ক্যাডার ভিত্তিক সুবিধাদিও বাড়াতে হবে। তবেই যার যার ক্যাডারে থাকার সহনীয়তা বাড়বে। ওদের সিলেবাসে পদন্নোতি,প্রেষণ, কর্মী ব্যবস্থাপনা পড়ানোর সুযোগ থাকে না। তাহলে এ বিষয়ে সীমাবদ্ধতা থাকবেই।

বরং পিএসসির অধীনে বিশেষায়িত ইন্সটিটিউট গড়ে তুলে প্রশাসন, পুলিশ,পররাষ্ট্র ক্যাডারের মতন স্পর্শকাতর ক্যাডারে নিয়োগের আগেই বিশেষ কোর্সের মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রীদের দক্ষ করে নিতে হবে।

এসকল ক্ষেত্রে মনোযোগ না দিয়ে শুধু কোটাকে গুরুত্ব দেয়া আপাতদৃষ্টিতে রাজনীতিকরণ করা ছাড়া কিছূ নয়। মুক্তিযোদ্ধার উত্তরাধিকার অপেক্ষা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সম্পন্ন একটি জাতি বেশী দরকার। যাদের মধ্যে দেশপ্রেম থাকবে। যারা সে প্রেমেই দূর্নীতিমুক্তভাবে দেশ ও প্রশাসন চালাবে। আপনারা তো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সম্পন্ন ছাত্র-ছাত্রীও তৈরি করতে পারেন নি। যার বাবা দাদা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না তার জন্মের কি দোষ? তার মেধার কি কোনো দাম নাই? সে কি কোনো সুযোগ পাবে না? তার মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অনুগ্রহ করে নষ্ট করে দেবেন না। তাকে এ হতাশায় অপরাধী আর দূর্নীতিপরায়ন করে তুলবেন না। কেননা এ সুবিধা বঞ্চিত যে স্কুল কলেজে কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির বেলায়ও হয়েছে। তাঁর জীবনে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে টিকে থাকবার গল্পে আশা আর প্রত্যাশা দিয়ে প্রাণ-চাঞ্চল্য আনবেন আর দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবার প্রত্যয় তৈরি করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যোগাবেন। তাকে দেশকে ভালোবাসতে সাহায্য করবেন এবং উন্নয়নের মুক্তিযুদ্ধে এদের মেধাকে হাতিয়ার করবেন। নচেৎ এরাই হতাশ হয়ে বিদেশে অভিবাসনের পথ বেছে নেয়। আমাদের মেধা পাচার হয়ে যায়। আমাদের মেধা কাজে লাগিয়ে বিশ্ব যখন তুঙ্গে আপনারাই তখন মেধাহীনকে পদাধিকার বলে বসিয়ে দূর্নীতির তুঙ্গে।

মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানে কোটা অবশ্যই বহাল থাকবে কিন্ত তার শতাংশ কম হোক। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী আর প্রতিবন্দী কোটার এখনো প্রয়োজন আছে। নারী কোটা, জেলা কোটা, পোষ্য কোটাসহ সব কোটা প্রয়োজনের চেয়ে রাজনীতিকরণ আর স্বজনপ্রীতি বেশী। এগুলোর জরুরি সংস্কার আসুক।


  • ৫২৪ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

রুমানা রশিদ রুমি

রুমানা রশীদ রুমী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগ হতে স্নাতক আর স্নাতকোত্তর ড্রিগ্রি নেবার পর মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনায় এম বিএ করেন। বর্তমানে আইন বিজ্ঞানে অধ্যায়নরত। পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন সাংবাদিকতাকে। ছিটকে পড়ে যোগ দেন ব্যাংকে। লেখালিখি আর কাটখোট্টা ব্যাংকিং এক সাথে তাল মেলাতে না পেরে বর্তমানে আছেন ‘দি বাংলাদেশ মনিটর’ এর ‘ফিচার রাইটার”হিসেবে। তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ম্যাগাজিন ‘রংঢং’। নিয়মিত লেখেন ‘দি বাংলাদেশ অবজারভারে”। লিখছেন বিভিন্ন অনলাইন পত্রিকায়। কাজ করছেন নারী সম্পদ নিয়ে। ‘শূন্য প্রকাশ’ প্রকাশনী থেকে ২০১৫ সালের ‘একুশে বইমেলায়’ বের হয় তাঁর প্রথম ফিউশন ‘জয়িতা’। পাঠকের উৎসাহে চৈতন্য প্রকাশনী থেকে বের হচ্ছে “এ শহরের দিদিমনি “।

ফেসবুকে আমরা