কিরণ (ধারাবাহিক উপন্যাস -পর্ব-২)

রবিবার, সেপ্টেম্বর ১৬, ২০১৮ ৩:০৭ PM | বিভাগ : সাহিত্য


কিরণ পড়েছিলো হিরোশিমা – নাগাসাকির ভয়াবহতা। শুধু তো পড়ে নি, অনুভব করেছিলো সেই ভয়াবহতার গভীরতা।

তখন ১৯৪৫ সাল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চূড়ান্ত পরিণতি হতে চলেছে। জাপান, জার্মান, ইতালি মিলে গড়ে উঠেছে এক অক্ষশক্তি। যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ থামাতে এক চূড়ান্ত ও ভয়ঙ্কর পদক্ষেপ নেয়।

৬ই আগস্ট সকালবেলাটা আর সব দিনের মতোই সাধারণ ও স্বাভাবিক একটি দিন শুরু হয়েছিলো হিরোশিমায়। মানুষজন তাদের প্রাত্যহিক কাজে অগ্রসর হচ্ছিলো। ছাত্রছাত্রীরা স্কুলের জন্য বেরিয়েছিলো। সকাল সোয়া আটটা হবে তখন। আকস্মিকভাবে ভীষণ গর্জনে কেঁপে ওঠে হিরোশিমা। মানুষজন কিছু বোঝার সুযোগ পায় নি। কিছু বুঝে ওঠার আগেই মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় হিরোশিমা। হিরোশিমার গোটা আকাশজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক বোমা “লিটল বয়”-এর তাণ্ডব থেকে উৎপন্ন ধোঁয়া আর আর্তের তীক্ষ্ণ আর্তনাদ মিলেমিশে একাকার। বিশ্বের প্রথম পারমাণবিক হামলা। ভয়ঙ্কর হামলা।

পরবর্তী হামলা হয় ৯ই আগস্ট নাগাসাকিতে। এবার আরও একটি পারমাণবিক বোমা “ফ্যাট ম্যান” আছড়ে পড়ে নাগাসাকির ওপর। এই দুই বোমা বিস্ফোরণের পর টোকিওতে তৃতীয় আরেকটি বোমা বিস্ফোরিত হতে চলেছে, এমন আশংকায় জাপান আত্মসমর্পণ করে।

এই সমস্ত কথাগুলি কিরণের মনে চলে আসে। আবারও নানান ভাবনা ও চিন্তায় কিরণ আচ্ছন্ন হয়ে যায়। হঠাৎ ঢং ঢং করে বেজে ওঠে ক্লাসের ঘণ্টা। কিরণ চমকে ওঠে ঘণ্টার শব্দে। বুকের মধ্যে তখন যেন বেজে উঠেছে পারমাণবিক বোমার আওয়াজ!

সেদিন কিরণ কোনো ক্লাসেই ঠিকমতো মন দিতে পারছিলো না। যে দিকেই সে তাকায়, দেখে অস্বস্তিতে, ক্লান্তিতে থাকা দুর্বল মুখগুলো।

নিজের ক্লান্তি ছাপিয়ে কিরণের বারবার মনে হতে থাকে, “মুহূর্তেই এই অস্বাভাবিকভাবে ঢেকে যাওয়া আকাশ, এ কি তবে আধুনিক কোনো মারনাস্ত্র!”

কৌতূহল, রহস্যের গভীরে ঢুকে গিয়ে রহস্য সমাধান করা, এবং যতক্ষণ না সেই রহস্য ভেদ হয়, রহস্যের সমাধান হয়, কিরণ অস্থির হয়ে থাকে। এসব কিরণের চরিত্রের অন্যতম দিক। কিরণ ভাবতে থাকে। বাড়ি ফেরার পথে বাসে আসার সময় কিরণের মনে নানান প্রশ্ন তোলপাড় করতে থাকে।

-কি এই রহস্য!

-এ কি সত্যিই কোনো নাশকতা চলছে, নাকি নিছকই ..!

বাড়ি ফিরে অন্যান্য দিনগুলির মতো সে ঠাণ্ডা ঘরে মিনিট দশেকের বিশ্রাম নেয় না। কাঁধে থাকা ব্যাগটি টেবিলে নামিয়ে রেখে স্নান ঘরে চলে যায়। মনটাকে স্থির করা প্রয়োজন। স্নান ঘরে অনেক সময় ধরে দেওয়ালে হাত চাপা দিয়ে শাওয়ারের নিচে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকে। শাওয়ারের ঠাণ্ডা জল মাথা, চুল ভিজিয়ে চলেছে। মাথাটা ঠাণ্ডা করছে। চুল থেকে জল চুইয়ে গোটা শরীর ভিজিয়ে দিচ্ছে। ভিজিয়ে দিচ্ছে কিরণের মন। সারাদিন নানান চিন্তা – ভাবনা করে মাথার মধ্যে জট পেকে গেছিলো। এখন সবকিছু কিছুক্ষণের জন্য ভুলে যেতে হবে। ভুলে যেতে হবে আবার নতুন করে চিন্তা শুরু করার জন্য। এভাবেই প্রায় আধ ঘণ্টা স্নান ঘরে থাকার পর টাওয়েল দিয়ে মাথা, গা, হাত, পা মুছে সে বেরিয়ে আসে।

জলের সাথে সারাদিনের ক্লান্তি পর্যন্ত ধুয়ে স্নান ঘরের ড্রেন দিয়ে বেরিয়ে গেছে। মালতি বাড়ি যাওয়ার আগে রান্না করে দিয়ে যায়। মেয়েটি বেশ ভালো। বেশ কাজের। কিরণ রান্না ঘরে গিয়ে দেখে প্রিয় ডিমসুমের সাথে সুপ এবং ভাত করা আছে।

“মালতি যাওয়ার আগে কিছু বলছিলো ওর মেয়েকে নিয়ে। শরীর খারাপের কথা কিছু একটা বলছিলো। নানান চিন্তায় তখন শোনা হয় নি ঠিক করে। কাল শুনবো। আহা! মেয়েটি দুশ্চিন্তার মধ্যেও এভাবে সুন্দর করে রান্না করে রেখে গেছে। কাল স্কুল থেকে ফিরে একটিবার ওর বাড়ি গিয়ে মেয়েকে দেখে আসবো। সঙ্গে কিছু চকলেট ও উপহার নিয়ে যাবো। বাচ্চা মেয়েটি খুশি হবে।”

ডিমসুম, সুপ দিয়ে চট করে ভাত খেয়ে নেয় কিরণ। এখন সে কিছু চিন্তা করবে না। মাথাটা একেবারে হালকা করে ফেলবে, যাতে নতুন করে, আরও পরিস্কার করে চিন্তা করতে পারে।

খাওয়া শেষে সিডি প্লেয়ারে সে কিছুক্ষণ সারিন্দার সুর শোনে। সারিন্দার আওয়াজ তার বড্ড প্রিয়। সারিন্দার মিষ্টি আওয়াজ শুনতে শুনতে সে হারিয়ে যেতে পারে ছেলেবেলায়।

ছেলেবেলায় ..

সৌম্য!

ছেলেবেলায় সৌম্যর সাথে হাসিখেলার দিনগুলি মনে পড়ে যায় সারিন্দার আওয়াজ শুনতে শুনতে। ভীষণ চঞ্চল সৌম্য। সারিন্দার সুরের নেশা কিরণ সৌম্যর কাছ থেকেই পেয়েছে। 

( প্রথম পর্ব পড়ুন এখানে। )


  • ১৭৫৬৫ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

সৌম্যজিৎ দত্ত

লেখক, ব্লগার, আইএসআই তে লেকচারার এবং গবেষণারত ছাত্র।

ফেসবুকে আমরা