কিছু কথা

শুক্রবার, মার্চ ৯, ২০১৮ ৩:২৩ PM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


আজ ৮ই মার্চ। চারদিকে উৎসবের আমেজ। কেমন যেন আনন্দ আনন্দ ভাব। সকালে বের হয়ে শহিদ মিনার গেলাম-আম্মাকে শেষ বিদায় জানাতে। সেখানেও কেমন যেন ফাঁকা বোধ করছিলাম। যে মানুষটিকে বিদায় জানাতে এত মানুষ সে মানুষটির আর্দশবোধ ক''জনের মধ্যে আছে! এ কথা ভাবতে ভাবতেই সাংবাদিকদের মধ্যে লেগে গেলো মারামারি। যাহোক, প্রিয়ভাষিণী "আম্মা" এসব দেখে মিটিমিটি হাসছিলেন! আহা, এটুকুতেই এত গণ্ডগোল!

রিকশা চেপে পল্টনের উদ্দেশ্যে রওনা। সুপ্রীম কোর্ট পানির ফোয়ারার কাছে যেতেই ভয়াবহ জ্যামে পড়লাম। প্রেসক্লাব থেকে মাইকের শব্দে কান দুটো ঝালাপালা। এই সামান্য জায়গায় কত মাইক, কত মত, কত আর্দশ, কত সংগঠন! কেউ বলছেন, "নারী দিবসের রক্তিম শুভেচ্ছা শেখ হাসিনাকে", কেউ বলছেন, "আজ থেকে আর কোনো নারী নির্যাতন হবে নাা, শপথ নিলাম", কেউ বলছেন "সমাজতন্ত্রই একমাত্র পথ" কারো কারো কথায় তো মনে হচ্ছে, সমাজতন্ত্র, নারীমুক্তি হয়েই গেলো!

যাক্, এবার আসি মূল কথায়: 

৮ই মার্চে আপনি আপনার বাসার কাজের মেয়েটিকে/শিশুটিকে ছুটি দিয়েছিলেন? নাকি, অন্যদিনের মতোই আজও কাজ করিয়েছেন? কিছুটা বাড়তি কাজও করিয়ে নিয়েছেন- নারী দিবস উপলক্ষ্যে। আপনার বাসায় আপনার রিলেটিভ আসতে পারে, নেতারা আসতে পারে- গোছগাছ রাখতে হবে তো! আপনার সোফা, আপনার বেডশীট, আপনার ফ্লোর, তাই না! তাই তো! এর ফাঁকে একটু মাথাটাকে বানিয়ে নিয়েছেন, 'কাঁচাপাকা চুল গুলো এনে দে' বলে হুঙ্কারও দিয়েছেন। এগুলো কোনটাই মিথ্যে নয়। এই যে যারা প্রেসক্লাব, শাহবাগ কাঁপালেন তাদেরই কাজ কিন্তু এগুলো। 

আর আপনার প্রোগ্রামে 'শ্রমিকশ্রণি' কই? আপনার মিছিলে এদের উপস্থিতি নেই কেনো? যাদের মিছিলে এই শ্রমিকদের উপস্থিতি আছে তাদের কেনো ভাড়া করে আনলেন? যাও বা আনলেন তাদেরকে ৮ই মার্চের তাৎপর্য কেনো বুঝালেন না? আমি কি বানোয়াট গল্প বলছি? মোটেও না, গত ১৩-১৪ বছর থেকে এই দেখে আসছি। হ্যাঁ, মাঠে থেকে। জানেন কি, ৮ই মার্চকে কেন্দ্র করে একমাস আগে থেকেই ঘুম হারাম হতো! জানেন না, বলবেন ফেসবুকে বিপ্লবী। বলেন যা খুশি! 

যে পুরুষটি নারীদিবসের মিছিলে শ্লোগান দিলো, "নারী নির্যাতন, নারী নিপীড়ন বন্ধ করো", "সম শ্রমে, সম মজুরি দিতে হবে" সেই পুরুষটি কি নারী নির্যাতন করে না, ঘরের বউটিকে পিটায় না! ঘরের বউটিকে শুধুমাত্র "বউ" বানিয়ে রাখার জন্য চেষ্টা করে নি, বউটি যাতে সভা-সমাবেশে আসতে না পারে তার চেষ্টা করে নি! সম্পত্তিতে বোনকে ঠকাই নি! হ্যাঁ, এর সবগুলোই এই পুরুষরাই করে। এদেরকে আমি চিনি, জানি। তবুও, এরা 'কমিউনিস্ট', 'নারীপ্রেমী'। নারীকে আলাদাভাবে এত সুযোগ দেওয়ার আপনাদের দরকার নেই হে পুরুষ। নারীর যতটুকু ততটুকুই পেলেই হবে। 

নারী দিবসকে কেনো একটা 'অনুষ্ঠান' বানালেন? জানেন, ইতিহাস আপনাদের ছাড়বে না। ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবেই। 

নারী দিবসকে কেন্দ্র করে নারীস্বাধীনতার নামে যারা পুঁজিবাদকে প্রমোট করছে তাদের ধিক্, শত ধিক্। আপনি পুঁজিবাদ নিয়ে কথা না বলে 'নারী স্বাধীনতার' কথা বলতে পারেন না। যদি বলেন তাহলে বুঝবো আপনি সাম্রাজ্যবাদের এজেন্ডা। 

নারী দিবসকে যারা 'পণ্য' বানিয়েছেন, বিক্রি করছেন তাদের বলতে চাই, ক্লারা জেটকিনের নাম শুনেছেন? সুতাকল শ্রমিকদের কতজন আত্মাহুতি দিয়েছিলেন তা জানেন? যদি, না জানেন তবে ফাজলামি বন্ধ করেন। 

আর যে সমস্ত নারী বন্ধুরা পুঁজিবাদের ফাঁদে পড়ে গদগদ হয় বেগুনী শাড়ি, থ্রিপিছ, টিপ পড়ে নারীস্বাধীনতা চাইতে এসেছেন জানেন কি এই আপনাদের জন্যই প্রকৃতপক্ষে নারী আন্দোলন কলঙ্কিত হতে যাচ্ছে -সহজ কথা বুঝতে পারছেন? 

শাড়ির আঁচল ঝূলিয়ে, চোখে রোদ চশমা, মুখে সান ক্রিম মেখে নারী দিবস করতে আসছেন। আবার বলছেন, নারীদের স্বাধীনতা আমরা আনবোই। সেলুকাস! হাস্যকর বটে! 

ক্লারা জেটকিনের শ্রমের সমমর্যাদা নিয়ে আপনাদের কোনো কথাই নেই, আপনাদের কথা হলো 'পুরুষ'দের সাথে পাল্লা দেওয়া। তাও কথার কথা। আপনারা কেনো পুরুষদের সাথে পাল্লা দিবেন, আর কেনোই বা সমমর্যাদা চাইবেন? আপনাদের মর্যাদা যতটুকু ততটুকুই আদায় করেন। অনেকক্ষেত্রে পুরুষের চেয়ে আপনি/আমি ক্ষমতাবান। সুতরাং, যেসব ক্ষেত্রে আমরা ক্ষমতাবান সেসব ক্ষেত্রে আমরা বেশি মর্যাদাবান। এটুকুই হলেই তো চলে। মূল কথা, মানুষের 'মনুষ্যত্ববোধসম্পন্ন' হওয়ার জন্য যে মর্যাদা দরকার। আর সেটা পুরুষ দিবে না, সেজন্য আপনার আঙ্গুলটা পুঁজিবাদের সিস্টেমের দিকে তুলে ধরতে হবে। তাই নয় কি! 
একটু স্কুটি চালাতে পারলেন, ঠোঁটে লাল লিপস্টিক দিলেন, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা পেলেন, প্যান্ট, শার্ট পরলেন আর নারী স্বাধীনতা হয়ে গেলো-অত সস্তা! 

সংসদের দু’চারটা আসন পেলেন, এমপি, মন্ত্রী হলেন আর হয়ে গেলো! এতেই রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতি গদগদ হয়ে 'মাদার অফ হিউম্যানিটি' উপাধি দিয়ে তুপ্তির ঢেকুর তুললেন। এই তো চাওয়া! হ্যাঁ, আপনাদের চিনি গো চিনি, আপনাদের শ্রেণি চরিত্রও আমি জানি। 

এই রাষ্ট্রযন্ত্র আপনাকে শাহবাগ, প্রেসক্লাব ছেড়ে দিয়েছে "নারীদিবস" পালন করার জন্য আর আপনি বলা শুরু করলেন, "দেখছেন এটাই আমাদের সরকার, শেখ হাসিনা সরকার"। কিন্তু, একবারও মনে হলো না, তনুর বিচার হয় নি, কল্পনা চাকমার বিচার হয় নি, নাম জানা না জানা হাজার হাজার নারীনির্যাতনের বিচার আপনার "শেখ হাসিনা" করেন নি। কিন্তু, আপনি গদগদ, আপনারা আনন্দে দিশেহারা। হয়তো, এতটা সময় রোদে দাঁড়িয়েছিলেন বলে নারী দিবসেও  পোলাও, কুরমা, গাদাগাদা সবজি রান্না করিয়েছেন কাজের মেয়েটিকে দিয়ে। হ্যাঁ, আপনারাই পারেন, আমি বা আমরা পারি না বলে 'অসামাজিক' ট্যাগ দেন। এই যে 'অসামাজিক' ট্যাগ দেন এতে গর্ববোধ করি আর আপনাদের দ্বিচারিতা দেখি। হতাশ হই না, অবাকও হই না। জানেন তো, আজকাল রাগ করে নিজের চুলও ছিড়ি না, একসময় ছিড়তাম। এই সিস্টেমকে কিছুটা হলেও মানিয়ে নিয়েছি, বলতে পারেন বাধ্য হয়েছি। যা খুশি তা বলতে পারেন!


  • ৫৬৭ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

লাবণী মণ্ডল

নারীবাদী লেখিকা।

ফেসবুকে আমরা