খাতুনে জান্নাত

কবি, প্রাক্তন শিক্ষক ও প্রশিক্ষক।

নারীর হারানো অবস্থান পূনরুদ্ধার করবে মানবিক মনন সমৃদ্ধ মানুষ

পৃথিবীতে দু'প্রজাতির মানুষ বাস করে। জন্মদানের ক্ষেত্র থেকে শুরু করলে আগে আসে মা। সে হিসেবে বলতে হবে নারী ও পুরুষ। নারী সন্তান ধারণ করে। নিজের ডিম্বাণুকে ক্রিয়াশীল করে শুক্রাণু গ্রহণ করে এবং শরীরের যাবতীয় ইন্দ্রিয় ও কলাকোষের মাধ্যমে ডিম্বাণুকে পরিণত করে ভ্রূণে (এ কথাটা লেখার উদ্দেশ্য এজন্যই যে আগে সবাই মনে করতো এখনো কেউ কেউ মনে করে নারীর ডিম্বাশয় একটি পাত্র আর সে অর্থে নারী জমি আর পুরুষ বহন করে বীজ। যা আদতে সত্য নয়। একটা সন্তানের শরীরে মাতাপিতা ও তাদের পূর্ববর্তী বংশের বৈশিষ্ট্য বিরাজমান থাকে। তারপর পুরো প্রক্রিয়াটি নারীর মাধ্যমে পরিচালিত হয়। যেখানে পুরুষ একজন দর্শক বা প্রক্রিয়াটির বাহ্যিক কষ্ট লাঘবে সহায়তাকারী।)
 
যেখানে নারী হওয়ার কথা ছিলো সমাজের প্রধান (যা আগে ছিলো) সেই নারী হয়ে পড়েছে দ্বিতীয় লিঙ্গ বা দ্বিতীয় অবস্থানের মানুষ। এই সন্তান ধারণের সুযোগেই নারীর কাছ থেকে কেড়ে নেয়া হয়েছে তার যাবতীয় অধিকার। একের পর এক সন্তান জন্ম দিতে দিতে শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্থ নারী দেখলো এ সমাজে সে চির অসহায়। সমাজ, রাষ্ট্র ও ধর্ম তাকে এক নির্যাতীতদের প্রতিনিধির কাতারে দাঁড় করিয়েছে। কখনো সুকৌশলে করেছে নারীকে নারীর শত্রু। বঞ্চিত করেছে শিক্ষা ও সংস্কৃতির উচ্চস্তর থেকে। যেহেতু শিক্ষায় অনগ্রসর নারী সচেতন নয় তাই সে পশ্চাত থেকে পশ্চাতে চলে যাচ্ছে।

কৃষি, পশুপালন আর বয়নশিল্প, সভ্যতার শুরুর জন্য দরকারী এসব কাজ মেয়েদেরই আবিষ্কার। কিন্তু পুরুষের পেশী-শক্তি আর নারীরা সন্তান-পালনের গুরুদায়িত্বের কারণে ব্যস্ত থাকায় ধীরে ধীরে মেয়েদের এসব থেকে অধিকার চলে যায়। তারপরেও একসময় দুনিয়ার প্রায় সর্বত্র মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ছিলো। মেয়েরা ছিলো সমাজের প্রধান, পরিবারের প্রধান। এটা বুঝা যাবে সম্পত্তির আইন থেকে, মাতৃতান্ত্রিক সমাজে মেয়েরাই সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হতো। এছাড়া গোত্রের কবরস্থানে মেয়েদের কবরের অবস্থান থাকতো সামনে, আর ছেলেদের কবর পেছনে। নারীদের সমাজে মানুষের ‘আদিপুরুষ’ নয়, বরং ‘আদিমাতার’ কথাই কল্পনা করা হতো। এবং তাদের উপাসনায় দেবতা নয়, দেবীই ছিলেন প্রধান। আজ থেকে ২৫ হাজার বছর আগের ভেনাস মূর্তিগুলো সেটারই প্রমাণ দেয়। চীনে সু-মু, নুয়ে-কুন জাতির মধ্যে রাণীর শাসন চলতো, তিব্বতে, আমাদের গারো-খাসিয়াদের মধ্যে মাতৃতান্ত্রিক সমাজ প্রচলিত। কামরূপ-কামাক্ষ্যায় ছেলেদের ভেড়া বানিয়ে রাখার গল্প, মাতৃতান্ত্রিক সমাজেরই গল্প। অথবা, সেখানে গেলে ছেলেদের অন্ডকোষ খসে পড়ার গল্প পুরুষতন্ত্রের ভয়েরই প্রতিচ্ছবি। আফ্রিকার অগোন্না, লুটুটকা আর ইউবেমবা জাতিতে মায়ের শাসন। আমেরিকায় হপি, ইরোকোয়াদেরও তাই।

মাতৃতান্ত্রিক সমাজ থেকে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বিবর্তনের কালটা ধরা যায় রোমান রাজবংশের ইতিহাসে। সেখানে মেয়ে সরাসরি সম্পত্তির ভাগ পেতো না, শ্বশুরের সম্পত্তি পেতো মেয়ের জামাই। খাসিয়াদের ক্ষেত্রেও এমন উদাহরণ আছে, ছেলে বাবার সম্পত্তির অধিকার পায় না, তার বদলে ভাগনে সম্পত্তির অধিকার পায়, এসব ট্রাঞ্জিশান পিরিয়ডের উদাহরণ। আফ্রিকাতে বগন্ডা জাতির মধ্যে রাজার শাসন চলে, কিন্তু তাকে বউ এবং মায়ের কথা মেনে চলতে হয়। মিশরে ফেরাউনদের ভাই-বোনের বিয়েও একই কারণে হতো, কারণ তখন মাতৃতান্ত্রিক সমাজের মধ্যে পুরুষের অধিকার জোরে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছিলো। মেসোপটেমিয়াতে নারী-পুরুষ একসাথে ক্ষমতা ভাগাভাগি করার উদাহরণ আছে। সুমেরিয়ায় লুগালনাভা নামে বিখ্যাত শাসকের স্ত্রী বরনমটরাও কম বিখ্যাত ছিলেন না, তারা দুজনে একসাথে শাসন করতেন, সমান ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। স্বামীর যেমন নিজস্ব দরবার ছিলো, তেমনি স্ত্রীরও শাসনকাজ চালাবার জন্য নিজস্ব দরবার ছিলো। তেমনি ছিলেন রাজা উরুকাগ্নিয় আর রাণী শগ।

এরকম কিছুকাল চলার পরে আস্তে আস্তে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে মেয়েরা তাদের অবস্থান হারাতে থাকে এবং পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার প্রচলন হয়। পুরুষতান্রিক ধর্মের অভিঘাতও মাতৃতান্ত্রিক সমাজ বিলুপ্তির জন্য অনেকাংশে দায়ী। ধারণা করা হয় ডাইনী-বিদ্যা বা উইচ-ক্রাফট মাতৃতান্ত্রিক সমাজের একটা শক্তির জায়গা ছিলো, witchcraft represented an “affirmation of hegemony” for women। পুরুষতন্ত্র মেয়েদের দমনের জন্য ডাইনী হত্যার নামে তাদের সে শক্তির জায়গাকে বিনষ্ট করে দেয়। আজ থেকে কয়েকশত বছর আগে মধ্যযুগে ইওরোপে ডাইনী নামে মেয়েদের পুড়িয়ে মারার মত জঘন্য ঘটনা ঘটে।

ঐতিহাসিক সময়ে পুরুষতন্ত্র ঝাঁকিয়ে বসে, তারপরেও আমরা মাতৃতান্ত্রিক সমাজ-ব্যবস্থা এবং মাতৃতান্ত্রিক সমাজ থেকে পুরুষতন্ত্রের রূপান্তর দেখতে পাই। প্রাগৈতিহাসিক কালের ইতিহাসের জন্য আমাদের নজর দিতে হবে নৃতত্ত্ব এবং পুরাণের দিকে।

পৌরাণিক গ্রীক বীরেরা জাঁহাবাজ, যুদ্ধবাজ এমাজন নারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। গ্রীক এমাজন নারীরা ছেলেদের সাথে সমান পাল্লা দিয়ে যুদ্ধ করতো, তারা মেয়ে শিশুদের বড় করতো এবং যোদ্ধা বানাতো। এমাজন নারীদের ক্ষমতা পুরুষতান্ত্রিক গ্রীকদের উদ্বেগের কারণ ছিল। তাই দেখা যায় গ্রীক বীরেরা সবসময় তাদের পরাজিত করে, ধর্ষণ এবং বিয়ের মাধ্যমে ‘প্রপার অর্ডার’ নিশ্চিত করে। “Amazonian mythology seems symbolically to embody and to control a collective anxiety about the power of a female not only to dominate or reject the male but to create and destroy him. ভারতীয় গ্রন্থপাঠ ও গবেষণায় দেখা যায় বৈদিক যুগের পূর্বে নারীর অধিকার ছিলো বেশি। আর্যরা যত তাদের শাসন ব্যবস্থা ও ধর্মীয় প্রসার বাড়াতে থাকে দেখা যায় নারীরা তখন সমানাধিকারের পর্যায়ে আসে। মানে সমান স্বাধীনতা ভোগ করতে থাকে। ধীরে ধীরে তা কমতে থাকে। ঋগ্বেদ ও সমবেদ পর্যায়ে নারীর অধিকার যে পর্যায়ে ছিলো অথর্ববেদ পর্যায়ে সে নারী অধিকার হারাতে থাকে। সমানাধিকার ধীরে ধীরে অসমানাধিকারে চলে যায়। নারী হয়ে পড়ে পুরুষের জন্য অনিবার্য সঙ্গিনী ও তার বংশ পরম্পরা রক্ষার এক নিবেদিত কর্মীরূপে। খৃষ্টপূর্ব ৩৫০০ সালের কালে মহেনজোদারো সভ্যতার পর্যবেক্ষণে দেখা যায় ধারাবাহিক কাল থেকে আসা নিয়ম অনুযায়ী তখন মাতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা প্রচলিত ছিলো। অত্যন্ত সভ্য ও রুচিশীল জীবন ধারণ প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা। যেখানে পয়প্রণালীর সুব্যবস্থা ছিলো, ছিলো নৃত্য, ভাস্কর্য, মৃৎশিল্প, কা্ঁসা নানা ধাতুর ব্যবহার ও মূদ্রার প্রচলনের মতো শিল্পসম্পন্ন ও আধুনিক পরিবেশ। নারী সৈন্যরা ছিলো মূল দায়িত্ব পালনের অধিকারি। নারীদের লৌহার তৈরি যুদ্ধ টুপি থেকে এ অনুমান করা যায়। সে সভ্যতা ধ্বংস করে পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নারীকে ক্ষমতা থেকে বিচ্যুত করা হয়েছে। সে সভ্যতা ধ্বংসের অন্যতম প্রধান হিসেবে আর্যরা যে কাজ করেছিলো তা প্রমানিত হয়।

ধীরে ধীরে একের পর এক ধর্ম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ও পেশীশক্তির জোরে নারী হয়ে পড়েছে সামাজিক পন্য। তার নিজস্ব মতামত অভিরুচি ও কর্ম প্রভাব ফেলতে পারছে না কোথাও। সতীদাহ প্রথার নামে মৃত স্বামীর সাথে জীবিত পুড়িয়ে মারা হতো। সতীদাহ বন্ধ হলে বিধবাদের যৌন চাহিদা দমনের জন্য খাদ্যের উপর নিয়ন্ত্রণ ও বাল্যবিবাহ। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও রাজা রামমোহনের মতো মহান পুরুষ জন্ম না হলে এখনো নারীরা বেঁচে থাকার অন্দরমহলের বন্দী জীবনই ছিলো নারীর জন্য বরাদ্দ। নারীর জন্ম দেয়া সন্তানের পরিচয়ও তার নয় যা আজও প্রচলিত। এমনকি নারীর নিজস্ব কোনো নামও থাকে না বিয়ের পূর্বে পিতার ও বিয়ের পরে স্বামীর নাম বহন করে বর্তমানেরও তথাকথিত আধুনিক নারীরা।

দীর্ঘদিন নারী পুরুষের আধিপত্যেই নিজেকে সঁপে দিয়েছিলো। তার শিক্ষাহীন মন অকার্যকর হয়ে পড়েছিলো। কালক্রমে আবার তা ধীরে ধীরে অধিকার সচেতন হয়ে পড়ে কোনো নারী শাসনকার্যে সুযোগ পেলে দক্ষতা দেখাতে থাকে। দেখাতে থাকে শৈল্পীক কর্মকান্ডে। হয়ে ওঠে মহান। তাকে ধরেই কখনো সচেতন বা মহান পুরুষের সহায়তায় নিজের অবস্থান পরিবর্তন করতে ক্রিয়াশীল হয়। আমরা জানতে পারি কতপয় নারীর নাম।

মেরী ওলস্টনক্রাফট প্রথম সংগ্রামী নারী যিনি নারী অধিকারের জন্য লড়েছিলেন। সীমন দ্য বুভ্যুয়ার বলেছিলেন, নারীর জন্য একটি ঘর আর তার খাবার টুকু আয় করলেই নারী স্বাধীন হবে। ভার্জিনিয়া উলফ বলেছিলেন,‘‘নারী যখন ফিকশন লেখে তখন তার একটি কক্ষ আর কিছু অর্থ খুব প্রয়োজন।” বেগম রোকেয়া বলেছিলেন, নারীদের ঘরের বাইরে বের হতে দেন নিজের খাবার জোগাড় করুক। কিন্তু আয় বাড়ানোর ফলেও নারীর অবস্থান পাল্টেছে অতি সামান্যই। অনেক নারীর আয়ের উপর তার অধিকার নেই। তাকে জবাবদিহি করতে হয় তার আয়ের ও চলাচলের। তাকে অনুশাসন মেনে চলতে হয় সমাজের ও পরিবারের। তার থেকে কম আয় করেও পরিবারের পুরুষ সদস্যটি বেশি স্বাধীনতা ও সম্মান ভোগ করে।

কাজেই নারীর এ অবস্থান পরিবর্তনের জন্য বা হারানো অবস্থান ফিরে পাবার জন্য তাকে আরো সংগ্রাম ও বহু পথ পাড়ি দিতে হবে। তার সাথে তৈরি হতে হবে তার মানসিক দৃঢ়তর অবস্থান। যদিও বংশপরম্পরায় জেনেটিকেলি সে হারিয়েছে অনেক কিছু। তবুও সংগ্রাম, সাহস, একাগ্রতা, প্রচেষ্টা হয়তো পুরুষ যে মানবিক সত্তার অধিকারী তাকে সাথে নিয়ে এগোলে একটা সহাবস্থান ও সমানাবস্থানে পৌছে দিতে পারে সে মনোবল নিয়ে কাজ করে যেতে হবে। নিতে হবে নিজের জন্য স্বতন্ত্র একটি নাম। মা এবং বাবা তার মেয়ে সন্তানটির কথা ভেবে সহায়ক হলে, তার পথ তত দুর্গম না হলেও হতে পারে।

715 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।