মেয়েকে সমান সম্পত্তির অধিকার দেবো

বুধবার, নভেম্বর ২১, ২০১৮ ২:১১ AM | বিভাগ : সমাজ/গবেষণা


বহুদিন পর আমাদের পারিবারিক সম্পত্তির মিটমাট হতে চলেছে। নিজেদের অধিকারের পশ্নে আমি চেয়েছি আইন অনুযায়ী সব ভাইবোন সমানভাবে পাক। ধর্ম মেয়েদের সম্পত্তিতে সমান অধিকার দেয় নি। আর সমাজ সেটুকু না দিতে সর্বাত্মক চেষ্টা করে। তবে আমার একটি ভাই আমাদের পক্ষে ছিলো বলে কাজটা সম্ভব হচ্ছে। আমাদের গ্রামের এক ভাবী কথাটা শুনে স্তব্ধ হয়ে থাকে। বলে‘‘তোরা যে তোদের হক এর এরকম সমান ভাগ করে জমি জিরাত নেস আঙ্গো মেয়েরাও যদি তা নিতে চায় তো আমরা কি করবো? ’আমি হাসলাম. ‘সমান নয় অর্ধেক। ’ভাবীর কপালে চিন্তার রেখা। আমি অবাক হলাম না। যদিও এই ভাই জীবিত নাই বহু বছর। ছেলেরা সবাই প্রতিষ্ঠিত।

মেয়েদের কেনো বাবা-মায়েরা জন্ম দেয়। জন্মের পর থেকেই পালন করে পরের বাড়ির লোক হিসেবে। পাঠিয়ে দেয় শশুর বাড়ি। শশুর বাড়ি মেয়েরা লাঞ্চিত হবে এটাই নিয়ম। আজকাল ছেলের পাশে মেয়ে জন্ম চায় অনেকে কারণ মেয়েরা ঘরের লক্ষী। ঘর গোছাবে, রান্নাবান্নায় সহায়তা করবে, মা-বাবার সেবা করবে। সুন্দর জামা পরে ঘুরে বেড়াবে। তারপর মেয়ে চোখের পানি ঝরিয়ে শশুর বাড়ি চলে যাবে। মা-বাবা কাঁদবে। নাইওরি আনবে। কয়টা দিন থাকবে। তারপর চলে যেতে হবে। কারণ এ বাড়ির সে অতিথি। ঘরটা হয় ছেলের। শশুরবাড়ি যাবার পর মেয়েকে বঞ্চিত করে তার পাওনা থেকে। মেয়েটা বঞ্চিত হবে এটাই নিয়ম। কর্মজীবি মেয়ে যদি মা-বাবাকে সাহায্য করতে চায় তবে সেটা হয় দান। সমাজ সে প্রশ্ন তুলে মা-বাবাকে হেয় করে । আর এখানেই ছিলো আমার ইচ্ছার শেকড়। আমি থাকবো ওবাড়িতে। ওটাই আমার বাড়ি।

এ বিষয়ে আমার একটা কবিতা আছে আমার প্রথম বই 'দিনান্তে দেখা হলে’তে। হয়ত কবিতা হয় নি মনের ভেতর দমে থাকা কয়েকটি লাইন বেরিয়ে পড়েছে...

ছাড়

ছাড়ের সংহার চলে জীবন আত্মায়

একপেশে ছাড়ের বাহার কড়ায় গণ্ডায়

 

দুঃখ, রাগ, অভিমান

মননে লুকনো ঘা নিয়ে এবার ফিরলাম প্রিয় পৈতৃক ভিটায়

নাইওরি নয়

পুরোদস্তু মালিকের দম্ভিত বাসনায়...

 

রান্নাঘর, সুপারি বাগান, ভাঙা ঘাট

বৈঠক খানার পাশে সাদা বক ফুল,

রোদ-ছায়া ঘ্রাণ

মাতা পিতার তসবিহ ও তফসিরের মুখর রাগিণী

শৈশব বাতাস হেসে ওঠে স্বাগত জানায়...

 

ঘর জুড়ে অচেনা অজানা ছায়া

সুতীক্ষ্ণ শকুন চোখ অঘোরে বিদ্ধ করে

 

এ ওর গায়ে ঢলে শহুরে গলির পথুয়া রাণী

--এ বাড়ি তোমার নয়। কিনে নিয়েছে সেই বণিক শাহজাদা

--আমি তো বেচিনি ঘর উঠান, দালান

এই তো সাক্ষী দলিল দাগ-খতিয়ান

সিলমোহর, জন্মের খাডাইল

চৌদিক কাঁপিয়ে তারা অট্রহাস্য করে-

‘শুনেছি দিয়েছো পাশ

বড় বড় বিদ্যালয়ে পড়াতেও যাও

শিখনি এই রত্তি হিসাব

মেয়েদের লাগে না এসব।’

 

মুর্খামী-সিল এঁটে আমিও পড়ে থাকি বন্য বিছুটির মতো

ছাড় দেবো আর কত!

 

আমার যখন মেয়ে হয়েছে আমি ঠিক করেছি আমার সবকিছু আমার ছেলে- মেয়ে সমানভাবে পাবে। আর এ ভাবনা এবং তাকে কাজে পরিণত করতে আমার একজীবন সংগ্রাম করতে হয়েছে। যেন আমাকে নাইওরি ভাবা না হয় তাই আমি সামাজিক বিয়ে করি নি। আমার পাসপোর্ট, আমার আইডি কার্ড,,আমার পরিচয় মা-বাবা কেন্দ্রিক। যদি কোথাও স্বামীর নাম প্রয়োজন হয় তখন স্বামীর নাম এসেছে। কেননা আমি আমাকে আমার গার্ডিযান মনে করি আর আমার স্বামীকে বন্ধু। আমার স্বামী মেনে নিয়েছে। বরং যে কোনো স্বামীর চেয়ে ভালোবাসায় অগ্রণী ও আমিও তাকে শ্রদ্ধা করি।

বিজ্ঞানের যুগে আমি ভাবতে পারি না আমার মেয়েটি কোনো সন্তান জন্ম দিতে পারে না। অথবা আমার মেয়ে শস্যক্ষেত্র। বরং সন্তান জন্মদানে ছেলেমেয়ের সমান গুরুত্বের কথা যদি আমি জানি তবে আমি কেনো আমার মেয়েকে ছোট ভাববো। বরং শিক্ষা দীক্ষা ও কর্মসহ একটা ছেলের চেয়ে মেয়ে অধিক অগ্রগামী। ঘরে এবং বাইরে মেয়েরা সমান পারদর্শী। যেভাবে আমাদের ছেলেদের নিয়ে ভাবতে পারি না।

আমি তো কোনো সমস্যা দেখি না। দায়িত্বশীল মা হিসেবে মেয়েকে বিয়ে দিয়ে অন্যের বাড়িতে পাঠিয়ে দিতে পারি না। আমি চাইবো মেয়ে ও জামাইয়ের একটি আলাদা ঘর। প্রয়োজনে তারা বড়দের সেবা করবে, কাছে রাখবে আমাদেরও কাছে রাখবে। দু’জনকে দু’ভাবে দেখার কোনো কারণ নেই। মেয়ে ভালোবাসুক শশুর শাশুড়ি স্বামী কোনো আপত্তি নেই কিন্তু পরের হাতের পুতুল বা পরের বাড়ির কাজের মেয়ের স্থান পূরণ করতে দিতে পারি না আমার প্রাণপ্রিয় মেয়েকে।

তারপরও আমার ঘরে থাকবে তার পূর্ণ অধিকার যেমন আমার ছেলেদের। আমার বড় ছেলেকেও একইভাবে মানুষ করেছি। যেন সে তার ভাই ও বোনকে আলাদা চোখে দেখতে না শেখে। (চলবে)


  • ১৩১ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

খাতুনে জান্নাত

প্রাক্তন শিক্ষক ও প্রশিক্ষক।

ফেসবুকে আমরা