মিন্নির সত্য-মিথ্যা এবং সত্য-মিথ্যা দাবীর রাজনীতি

বৃহস্পতিবার, জুলাই ১৮, ২০১৯ ১:১০ PM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


সত্য তিন প্রকার। একটি প্রত্যক্ষ প্রমাণের সত্য। অবজেক্টিভ ফ্যাক্ট। আমরা মানি বা না মানি সেই "সত্য" আছে। সূর্যের আলো বা শ্রাবণের বৃষ্টির মত। সকালের নাস্তায় ডিম পরোটা বা খিচুরি খাওয়ার মত। এগুলো প্রমাণযোগ্য সত্য।

আরেকটি "সত্য" বিশ্লেষণ থেকে পাই। সামাজিক সত্য। কেউ ভালবাসে, নাকি ঘৃণা করে, সেটা সামাজিক মানুষের আচরণ ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে পাই। এই ধরনের সত্যের সমস্যা হচ্ছে, এগুলো বিশ্লেষণ নির্ভর। যদি, তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ পদ্ধতিতে ভুল হয়, তাহলে ভুল বয়ান মানে মিথ্যা তৈরি হবে। যদি বিশ্লেষকের শ্রেণি-পক্ষপাতিত্ব বা পিতৃতান্ত্রিক পক্ষপাতিত্ব থাকে, তাহলেও ভুল বা মিথ্যে বয়ান তৈরি হবে।

আরেকটি হচ্ছে আত্মগত "মানসিক সত্য"। আমি আমার যেই অনুভূতি জানি, বা অনুভবের ব্যাখ্যা করি, যেটা অন্যকে জানাতেও পারি না, সেটা আত্মগত মনস্তাত্ত্বিক সত্য।

মিন্নির গ্রেফতার নিয়ে, ফেসবুকে অনেক আলোচনা দেখছি। জানলাম ৫ দিনের রিমান্ড দেয়া হয়েছে এবং কোনো উকিল তাঁর পক্ষে দাড়ায়নি।

বিফাতকে হত্যা করা হয়েছে প্রকাশ্যে। রিফাতের একজন ঘাতককে ক্রসফায়ার নামক বেআইনি হত্যাও করা হয়েছে। এই দুটোই অবজেক্টিভ প্রমাণিত সত্য।

এখন আমরা দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী সামাজিক সত্যের বয়ান দেখতে পাই। একটি "সত্য" মিন্নি খুনি। আরেকটি "সত্য" মুল ঘাতকদের আড়াল করার জন্য মিন্নির বিরুদ্ধে একটি নাটক সাজানো হয়েছে, আসল খুনিদের সাজা কমানো বা সাজা না পাওয়ার জন্য।

একটি বয়ান দাবী করছে, "মিন্নি আসল খুনি।" নয়নবন্ড বা তার গ্রুপের লোকেরা যা করেছে, তা মিন্নির উস্কানিতে, মিন্নির প্ররোচনায়, মিন্নির প্রভাবেই এই খুন হয়েছে, মিন্নিই "আসল খুনি"।

মিন্নিই "আসল খুনি", এই বয়ানটির সমস্যা কী? এই বয়ানটি মিন্নির আচরণ ব্যাখ্যা করছে একটি বিশেষ নেতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে। মিন্নির বিপক্ষে যায় এমন সব যুক্তি দিয়ে এবং মিন্নির পক্ষে যায় এমন সব যুক্তি বাদ দিয়ে। এই দৃষ্টিভঙ্গীটি "প্রতিশোধকামী পুরুষের (Vindictive Masculinity), নারীর প্রতি বিদ্ধেষমুলক পিতৃতান্ত্রিক বিশ্বাস থেকে, যা নারীর অপরাধের (কাল্পনিক ও অপ্রমাণিত) প্রতিশোধ চায়। পুরুষেরা এটা করে চলেছে হাজার বছর ধরে, মা হাওয়ার গন্দম খাওয়ার, স্বর্গ থেকে পতনের রূপকথা থেকেই। (আমার গবেষণায় একটি অপরাধী পেয়েছিলাম যে তাঁর স্ত্রীকে ঘুমের ঔষধ দিয়ে তারপর এসিড ছুড়ে "অন্যায়ের" প্রতিশোধ নেয়। সেখান থেকে আমি এই "প্রতিশোধকামী পৌরুষ" কয়েন করি।)

মিন্নি "আসল খুনি" এই বয়ানটি কি কেবল ভুল? মিথ্যা? এই সত্য মিথ্যা প্রশ্নের চেয়েও আরেকটি গুরুত্বপুর্ন প্রশ্ন আছে। সেটি হচ্ছে, এই বয়ানের "রাজনীতি" কী? এই বয়ান কী ভূমিকা পালন করছে? The role of narrative?

এই বয়ানের আসলে একটি পিতৃতান্ত্রিক পক্ষপাতিত্ব ও শ্রেণি অবস্থান আছে। কীভাবে? "মিন্নি দোষী" হলে যে তরুণেরা এই সহিংসতায় জড়িত, তাঁদের পেছনে কারা আছে, কিভাবে এই ধরনের সহিংস গ্রুপ সমাজে গড়ে ওঠে, এর সাথে বেকারত্ব (অর্থনীতি), দলীয় ক্ষমতা সম্পর্ক (রাজনীতি), সহিংসতার মনস্তত্ত্ব (সমাজ মনোবিজ্ঞান), সামাজিক শিক্ষা তথা সমাজব্যবস্থা ও রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি সম্পর্ক কী, পিতৃতান্ত্রিক প্রথা ও স্থানীয় ক্ষমতা কাঠামোর সাথে সম্পর্ক, এই সব কিছুকে আড়াল করে। এই সব আলোচনা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়। মিন্নির ন্যারেটিভ পর্দার কাজ করে, সমাজের সংকটকে আড়াল করায়।

বিপরীতে, এই দুর্নীতিগ্রস্থ সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা যাতে আড়াল না হয়, সেই সংগ্রামের বয়ানটাও আমরা ফেসবুকে দেখি। এটাকেই বলে চলমান পিতৃতন্ত্র বিরোধী লড়াই ও শ্রেণি সংগ্রাম। এটি চলছে, নানা রূপে। মানুষের সংগ্রাম আসলেই, মার্ক্স যেভাবে বলেছেন, শ্রেণি সংগ্রামের।

এক্ষত্রে মনে রাখা দরকার, এই সংগ্রাম কেবল রেসিসট্যান্স, কোন নয়া সমাজের রূপরেখা নিয়ে সমাজবদলের সংগ্রাম নয়। এই সমাজ না বদলালে, আরও অনেক মিতু, নুসরাত ও মিন্নিকে আমরা বাঁচাতে পারবোনা। নারীমুক্তির আন্দোলনও শ্রেণিসংগ্রামের বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই থেকে আলাদা নয়।


  • ২২৪ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

খান আসাদ

সমাজকর্মী

ফেসবুকে আমরা