কেয়া তালুকদার

কবি ও প্রাবন্ধিক কেয়া তালুকদারের তিনটি কবিতার বই বের হয়েছে; "পূর্ণতা ফিরে এসো", "ছায়ামানব" এবং কলকাতার কবি মোনালিসা রেহমান'র সাথে যৌথ বই ভালোবাসার সাতকাহন প্রকাশিত হয় ২০১৬ এবং ২০১৭ সালের একুশের বই মেলায়। ২০১৬ সালে পেয়েছেন 'সমতটের কাগজ' থেকে প্রাবন্ধিক হিসাবে পুরস্কার। ১৬ বছর আন্তর্জাতিক এনজিওতে চাকরী শেষে বর্তমানে "হেঁসেল" নামে রংপুরে একটি রেস্টুরেন্ট পরিচালনা করছেন। লেখকের লেখা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পত্রিকাতেও প্রকাশিত হয়েছে।

"বোরকা ইজ হার চয়েজ" নয়

দু'একটি ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনা সমাজকে বদলে দিতে পারে না। যেমন, কনের বাইক চালিয়ে হলুদের অনুষ্ঠানে যাওয়া, বোরকা পরে ছেলের সাথে ক্রিকেট খেলা, মসজিদে গিয়ে বিয়ে করা, কনে বরের বাড়ীতে গিয়ে বিয়ে করা। তবে এগুলো নিয়ে ব্যাপক ট্রল হতে পারে। যা ফেসবুক পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। 

যারা বোরকা হিজাব পরেন তাদের কাছে প্রশ্ন করে জানা যায় তারা অনেকেই পরিবারের মানুষদের চাপে এই ধরণের পোষাক বেছে নিয়েছেন। কখনও বাবা-মা, কখনও ভাই-বোন, আবার কখনও বিয়ের পর স্বামীর চাপে। শ্বশুড়বাড়ীর মানুষদের মন রক্ষা করতে। এটা কি যার যার অভিরুচি কে কেমন পোষাক পড়বে? কিন্তু যখন ধর্মের দোহাই দিয়ে নারীদের এই ধরণের পোষাক পড়তে বাধ্য করা হয়, তখন তা কোনোভাবেই তাদের নিজেদের চয়েজ বলা যায় না। যখন এই পোষাকধারী নারীরা বাইরের জগতে এসে এর সুবিধা নিয়ে অনৈতিক কাজ করে তখন তা সমালোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। পোষাকে ধর্মের নীতি মেনে চললাম কিন্তু দৈনন্দিন জীবনের বিশেষ সু্বিধা পেতে এই পোষাককে ব্যবহার করলাম তা কোনো নীতিবান নারীর কাজ হতে পারে না। সবাই যে পোষাকের আড়ালে অনৈতিক কাজ করছে তাও না। যখন একটা লেবাসধারী গোষ্ঠীর কেউ খারাপ কাজে লিপ্ত হয় তখন পুরা গোষ্ঠীকে তার দায় বহন করতে হয়। এটাই স্বাভাবিক দৃষ্টিভঙ্গি। কিন্তু আপনি যে সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে ধর্মকে লালন করছেন, এটা আপনার কর্মে প্রতিফলিত হতে হবে। যখন কাজ-কর্মে তার গরমিল দেখা যায় তখন মানুষ এদের থেকে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। পর্দা না করে যখন কেউ অনৈতিক কাজ করে তখনো সমালোচনা হয় এবং পর্দার মধ্যে থেকে অন্যায় করাকে মানুষ খারাপ দৃষ্টিতে দেখে।

সম্প্রতি বোরকা পড়ে ছেলের সাথে ক্রিকেট খেলা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুমুল সমালোচনা হচ্ছে। একদল বলছে এটা মাতৃত্ব, আরেকদল বলছে এটা অশোভনীয়। সবকিছু মানুষ নিয়মের মধ্যে দেখতে অভ্যস্থ। ক্রিকেট খেলার পোষাক নিদিষ্ট করা আছে। তাই বোরকা পড়ে ছেলের সাথে ক্রিকেট খেলাকে অনেকেই মেনে নিতে পারছেন না। কেউ কেউ বলছে "বোরকা ইজ হার চয়েজ"। কারণ সে ধর্মের নিয়ম মেনেই খেলেছে। এতে দোষের কিছু নেই। কিন্তু যখন একজন নারী বাইক চালায় তখন "বাইক ইজ হার চয়েজ" এই দৃষ্টি ভঙ্গিতে দেখা হয় না। এটি অনেকের কাছে অশোভনীয় দৃষ্টিকটু। কারণ ধর্মীয় বিধানে এটি নেই। শুধু ধর্মের নিয়মনীতিগুলোই সমাজ স্বীকৃত। ধার্মিক মানুষও তা লালন করে আসছে।

নারীরা যখন নিজের পছন্দ অনুযায়ী নিজের সবকিছু নির্ধারণ করতে পারবে তখন তাকে নিজস্ব চয়েজ বলা যাবে। কিন্তু কয়জন নারী তা পারছে আমাদের সমাজে? নিজের ইচ্ছে মতন চলতে গেলে সংসারে অশান্তি লেগে থাকে, তখন বাধ্য হয়ে নারীরা সংসার টিকিয়ে রাখতে সবকিছুকে মেনে নেয়। যারা নিজের পছন্দে চলতে চান তাদের লড়াই করে চলতে হয়। সমালোচনারও মুখোমুখি হতে হয়।

সমাজের নিয়মেই সমাজ চলবে, মানুষ তা লালন করবেই। কেউ কেউ নিজের নিয়মে চলবে। সবচেয়ে বেশী যেটা দরকার তা হলো ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। যা মানুষের জন্য কল্যাণকর। মানসিকভাবে নিজেকে তৈরী করা, পরিবর্তনকে মেনে নেয়া। জগত সংসারের সব কিছুই নিয়মবদ্ধ থাকতে হবে তা নয়। মানুষ তার প্রয়োজনে নিয়ম বদলাতে পারে।

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।