কেয়া তালুকদার

কবি ও প্রাবন্ধিক কেয়া তালুকদারের তিনটি কবিতার বই বের হয়েছে; "পূর্ণতা ফিরে এসো", "ছায়ামানব" এবং কলকাতার কবি মোনালিসা রেহমান'র সাথে যৌথ বই ভালোবাসার সাতকাহন প্রকাশিত হয় ২০১৬ এবং ২০১৭ সালের একুশের বই মেলায়। ২০১৬ সালে পেয়েছেন 'সমতটের কাগজ' থেকে প্রাবন্ধিক হিসাবে পুরস্কার। ১৬ বছর আন্তর্জাতিক এনজিওতে চাকরী শেষে বর্তমানে "হেঁসেল" নামে রংপুরে একটি রেস্টুরেন্ট পরিচালনা করছেন। লেখকের লেখা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পত্রিকাতেও প্রকাশিত হয়েছে।

তিনি একজন মানবিক বলাৎকারকারী

স্যার, ওরা তো খুব ছোটো। তাই আমি সবসময় চেষ্টা করি, যেনো ওরা বেশি ব্যথা না পায়। আমি তো ওদের শিক্ষক, ওরা ব্যথা পেয়ে কান্নাকাটি করলে আমার খুব কষ্ট লাগে।’ ভাষ্যটি রাঙ্গুনিয়ার একটি কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক নাছির উদ্দিনের (৩৫)।

নিয়মিত অগণিত শিশুকে তার লালসার শিকারে পরিণত করলেও গ্রেফতার হওয়ার পর নির্যাতনের শিকার শিশুদের প্রতি এমনই সদয় হওয়ার কথা জানান তিনি। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের রাঙ্গুনিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মো. আনোয়ার হোসেন তার ফেসবুক পেজে স্ট্যাটাসে তুলে ধরেছেন এসব তথ্য। তিনি লিখেছেন, ‘নাছিরের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ফিরিস্তি শুনলে এ মায়াবাক্যাকে আপনার কাছে পরিহাসই মনে হবে। মাদ্রাসার হোস্টেলের ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্বে থাকার সুযোগ নিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে অনেক শিশু ছাত্রকেই নিয়মিত ধর্ষণ করতো সে। ঘটনা সংক্রান্তে প্রাথমিক অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে যা বের হয়ে আসে, তাতে শিউরে উঠবেন যেকোনো মানুষই।

ধর্ষণ করার জন্য মূলত দশ বছরের নিচে বয়সী ছেলেশিশুদেরকেই টার্গেট করতো সে। কোনো শিশু তার আহ্বানে সাড়া না দিলে তাকে বাধ্য করার জন্য কারণে অকারণে বেধড়ক মারধর করা হতো। যেহেতু সেখানে বেশিরভাগ শিশুই এতিম/দরিদ্র পরিবার থেকে আসা, শেষ পর্যন্ত তার পক্ষে হুজুরের প্রস্তাবে হ্যাঁ বলা ভিন্ন কোনো উপায় থাকতো না। নাছিরের ছেলেশিশু আসক্তি এমন পর্যায়ে উন্নীত হয়েছিলো যে, বিষয়টি টের পেয়ে তার স্ত্রী তিন বছরের সন্তানকে নিয়ে তাকে ছেড়ে চলে যান।

নির্যাতনের শিকার ওইসব শিশুর প্রতি সহমর্মী হবার পাশাপাশি নাছির আবার ভীষণ রকম নিয়মনিষ্ঠও। বিশৃঙ্খলা তার একদমই অপছন্দ। তাই তো তিনি একেবারে রুটিন করে দিয়েছেন, ওস্তাদের খেদমতে কবে কখন কোনো শিশু হাজির হবে। যেনো সেই গল্পের অত্যাচারী সিংহের মতো, যে কিনা বনের পশুদের সাথে চুক্তি করেছিলো যে, প্রতিদিন একটি করে প্রাণী খাবার হিসেবে তার নিকট চলে আসলে সে আর যার তার ওপর অত্যাচার করবে না। এই করে বেশ ভালমতোই চলে আসছিলো শিক্ষকতার আড়ালে তার বেপরোয়া বিকৃত যৌনজীবন। ছাত্ররাও মারধর, হুমকি ধামকির ভয়ে নীরবে নিশ্চুপে সব সয়ে যাচ্ছিলো। 

ঝামেলা শুরু হয় সোমবার (১৯ অক্টোবর) সন্ধ্যায়। এক অভিভাবকের কাছ থেকে প্রাথমিক অভিযোগ পাওয়ার পর বিশদ অনুসন্ধানে উঠে আসে বলাৎকারকারী নাছিরের গোপন বিকৃত যৌনজীবনের অবিশ্বাস্য সব খতিয়ান। তারপর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের এবং মধ্যরাতে পরিচালিত অভিযানে গ্রেফতার করা হয় হুজুর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিনকে।

কিন্তু গ্রেফতারের পর রীতিমতো রোল পালটে ফেলে সে। বারবার পুলিশের নিকট দাবি করতে থাকে, তিনি নাকি কাউকে জোর করে বিছানায় নিতেন না, ছাত্ররাই নাকি স্বেচ্ছায় তার সঙ্গ নিতে আসতো। যদিও গরিব ঘরের অসহায় ছেলেগুলোর সাথে দিনের পর দিন কোন কৌশলে, কী কী ঘটিয়েছে নরপশু নাছির সেটা বলেনি।

মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) সকালে আদালতে পাঠানো হলে নাছির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে তার বিরুদ্ধে আনীত বলাৎকারের অভিযোগ স্বীকার করেছে। পাশাপাশি বলাৎকারের শিকার শিশুদের মধ্যে চারজনও আদালতে উপস্থিত হয়ে তাদের ওপর চালানো নির্মমতার বর্ণনা দেয়।

বলাৎকারের ঘটনাগুলো মাদ্রাসার শিশুরা ভয়ে গোপন রাখে, তারপর যদি কোনো ঘটনা জানাজানি হয়ে যায় তখন ছেলে শিশুর অভিভাবকদের টাকার বিনিময়ে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও এই ব্যাপারে সহযোগিতা করে। তবে কিছু অভিভাবক যখন মামলা করে তখন হয়তো অপরাধীকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়।

কন্যা শিশু ধর্ষণের পাশাপাশি গত কয়েক বছর ধরে মাদ্রাসাগুলোতে ছেলে শিশু বলাৎকারের খবর সংবাদ মাধ্যমে গুলোতে প্রকাশিত হয়ে আসছে। শিশুদের প্রতি সহিংসতা রোধে "নারী ও শিশু নির্যাতন দমন" আইন নামে একটি কঠোর আইন করা হয়। কিন্তু বর্তমানে ছেলে শিশু বলাৎকারের বিচার ট্রাইব্যুনালে না হয়ে প্রচলিত ফৌজদারি আইনে বিচার করা হচ্ছে।

এদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষগুলো ধর্মের কোনো ইস্যুতে যেভাবে সোচ্চার হয়ে উঠে, হানাহানি, প্রাণহানী ঘটায়, সেভাবে বলাৎকারের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিবাদের ঝড় তুলতে দেখা যায় না। বিকৃত যৌন আচরণের বলি হয় এই ছোট্ট ছেলে শিশুরা। যারা প্রায় সকলেই এতিম কিংবা গরীব ঘরের সন্তান। বাবা-মা তাদের ছেলে সন্তানদের হাফেজ করার জন্য মাদ্রাসায় পাঠায়। অথচ সেখানে গিয়ে তাদের নির্মম অত্যাচারের শিকার হতে হয়। এক মাদ্রাসা ছাত্র এই অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে।

অভিভাবকদের প্রতি অনুরোধ, আপনার শিশু ছেলে বা মেয়ে যাই হোক, তার নিরাপত্তার দিকটি বিবেচনায় রাখুন। শিক্ষক হোক, আত্মীয় হোক কিংবা হোক প্রতিবেশী, আপনার শিশুকে কারো অরক্ষিত শিকারে পরিণত হবার সুযোগ দিবেন না প্লিজ।

আমরা সরকারের কাছে আশা করছি বলাৎকারের শাস্তি যেনো কঠোর হয়। তার পাশাপাশি মাদ্রাসাগুলোতে কঠোর নজরদারী বাড়াতে হবে ছেলে শিশুদের সুরক্ষার জন্য ।

530 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।