নারীর জীবনে পুরুষ কতটা অপরিহার্য

শুক্রবার, নভেম্বর ৮, ২০১৯ ৩:২৭ AM | বিভাগ : সমাজ/গবেষণা


আসুন একটু বিশ্লেষণের দিকে যাই৷ কন্যা জন্ম দেয়াটা আমাদের সমাজের বেশীর ভাগ পরিবারই সহজভাবে মেনে নিতে পারে না৷ তারপর কালো ও অসুন্দর হয়ে জন্মালে তো সবার মন খারাপ হয়৷ কীভাবে সেই শিশুটিকে ফর্সা করে তোলা যাবে সেদিকেই মাসহ পরিবারের সবার দৃষ্টি থাকে৷ এ যেনো বড়ই অপরাধ করে ফেলেছে শিশুটি৷ কন্যা সন্তান জন্ম দেয়ার জন্য পিতার শুক্রাণুই দায়ী৷ শারীরিক সৌন্দর্যের বিষয়টি সম্পূর্ণ জেনেটিক্যাল৷ পিতা মাতার বৈশিষ্ট্যগুলিই সন্তানরা পান৷ অথচ শিশুর মাকেই এর জন্য দায়ী করা হয়৷ কাঁচা হলুদের রস খাওয়ানো থেকে শুরু করে বাজারের সেরা প্রসাধনী ব্যবহার করতে শুরু করেন৷ কারণ কালো মেয়ের বিয়ে দেয়া যাবে না৷ বাজারে তার চাহিদা কম৷ তারপর পড়াশুনার ক্ষেত্রে মেয়েটি ভাইয়ের তুলনায় কম সুযোগ পায়৷ খাবার, পোষাক, ঘোরাঘুরি ও বিনোদনের ব্যাপারে থাকে বিধি নিষেধ৷ বাইরে একটা মেয়ে নিরাপদে কাজ করবে সেই জায়গাতে অনিরাপত্তা৷ একটি শিশুও বাইরে নিরাপদ নয় ৷ সাড়ে তিন বছরের শিশুকে ৪২ বছরের বুড়া ধর্ষণ করে মেরে ফেললো৷ বলেন আপনারা শিশুটির পোষাকের দোষ ছিলো৷ যে দেশে মেয়েরা প্রতিটি মুহূর্ত নিজেকে প্রকাশ করতে পারছে না সেখানে সেই প্রত্যাশাগুলো খুবই ক্ষীণ৷ এখন বলবেন অবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে৷ কিন্তু তা শতকরায় কতো? একজন পিতা কি কন্যার নিরাপত্তা দিতে পারছে৷ ইদানিং শোনা যাচ্ছে নিজ কন্যাকে ধর্ষণের কথা৷ আমি ভাবতেও পারি না এমন বিকৃত রুচি হয় কী করে?

এবার আসেন বিয়ের পরের কথায়৷ একজন নারী, যে চাকুরী করে না তাকে পরিবার থেকে যৌতুক দিয়ে বিয়ে দিতে হয়৷ অপরদিকে শিক্ষিত চাকুরীজীবি নারীকেও দিতে হয়৷ যার আধুনিক নাম উপহার৷ এক্ষেত্র পিতা মাতাই দায়ী৷ একজন শিক্ষিত মেয়ের বিয়ে কেনো যৌতুক দিয়ে দেবে? অনেক পিতা মাতাই এই প্রথাকে বাঁচিয়ে রাখছে মেয়ের সুখের কথা চিন্তা করে৷ তাও কি সেই সুখ পায় মেয়েটি? যৌতুক প্রথাই বা থাকবে কেনো? একজন নারী পুরুষের বিয়ে হবে সেখানে লেনদেন কেনো? কেউ কেউ আবার ঠিকমত ভরণ পোষণ পায় না৷ এক স্ত্রী রেখে গোপনে আরেকজনকে বিয়ে করে সংসার করে৷ এর জন্য মামলা মোকদ্দমা হয়৷

একজন শিক্ষিত মেয়ে যখন চাকুরী করে তখন পুরুষটি মাস শেষে তার বেতনের টাকার দিকে চেয়ে থাকে৷ কেউ কেউ বউয়ের বেতন নিজের হাতে নেয়৷ না দিলে মারধর করে৷ সেই মেয়েটি নিজের উপার্জনের টাকায় নিজের খাওয়া, পোষাক, চিকিৎসা করে৷ সংসারে খরচ করে৷ নিজের জন্য কিছুই রাখে না৷ অন্যদিকে পুরুষটি নিজের আখের গোছায় বউয়ের উপর সংসার ছেড়ে দিয়ে৷ এদের সংখ্যা কম হলেও এটি বাঞ্ছনীয় নয়৷ একজন মেয়ে যে চাকুরী করে না তার বিয়ের পর দায়দায়িত্ব স্বামীর এই ধারণা পোষণ করে সমাজের মানুষ৷ কিন্তু সব নারী স্বাবলম্বী হয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসবে এটি দূরহ ব্যাপার এই সময়ে৷ তবে অবস্থার পরিবর্তন হওয়া জরুরী৷ নারীকে শিক্ষা ও উপার্জনে পুরুষের পাশাপাশি আসতে হবে৷ আর বিয়েটা হতে হবে যৌথ প্রক্রিয়া। অন্তত শিক্ষিত মেয়েদের ক্ষেত্রে। অনেক শিক্ষিত মেয়েকেও আমি জানি, যার বেতনের টাকা সে সংসারে দেয় না। গয়নাগাটি কেনে। স্বামী ঠেকায় পড়লে ধার দেয়, পরে সেই টাকা সে সুদে-আসলে নেয়। আবার কিছু স্বামীর ব্যাংকের চেক বই বউয়ের কাছে জিম্মি থাকে ৷ এটা তো এমন হওয়ার কথা না ৷ দুজনের সংসার, দুজনের ভালোবাসা, দুজনের দায়।

কিছু সুবিধাবাদী পুরুষ আছে তারা দীর্ঘদিন সংসার করে ডিভোর্স নিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করে ৷ আমি ভাবতেই পারি না কিভাবে এটি সম্ভব! নারী যদি নিজের টাকায় নিজে চলতে পারে তাহলে শুধু জৈবিক চাহিদা মেটানোর জন্য একজন পুরুষের প্রয়োজন মনে করি না৷ ভালোবাসাহীন যৌন সম্পর্ক ধর্ষণের সামিল৷ একটি ছাদের নীচে যদি ভালোবাসার ঘর তৈরী না হয়, সে সম্পর্ক মূল্যহীন৷ একজন নারীর স্বামীর মৃত্যুর বা ডিভোর্স হলে নারী বিয়ে না করেও থাকতে পারে৷ সন্তানদের দায়িত্ব নিয়ে জীবন পার করে দেয় ৷ কিন্তু একজন পুরুষ স্ত্রীর মৃত্যু বা ডিভোর্স হলে সাথে সাথে বিয়ে করে৷

একে অন্যের প্রতি যদি সম্মানবোধ না থাকে সেই সম্পর্ককে বিলীন করে ফেলাই উচিৎ৷ একজন মেয়ে সংসারে কতটা মূল্য পায় সেটা জনে জনে জিজ্ঞাসা করার প্রয়োজন নাই৷ আমাদের চারপাশে তাকালেই তা বোধহম্য হয় ৷

নারী শিক্ষিত ও স্বাবলম্বী হয়ে প্রেক্ষাপটের পরিবর্তন ঘটাও৷ পুরষতান্ত্রিক মানষিকতার বিলোপ সাধন না ঘটলে কোনোদিনও কোনো নারী মাথা উঁচু করে তার যোগ্য সম্মান নিয়ে দাঁড়াতে পারবে না৷ নারীরা তো ছাড় দিয়ে দিয়ে নিঃশেষ হতে চলেছে ৷


  • ৩৭৩ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

কেয়া তালুকদার

কবি ও প্রাবন্ধিক কেয়া তালুকদারের তিনটি কবিতার বই বের হয়েছে; "পূর্ণতা ফিরে এসো", "ছায়ামানব" এবং কলকাতার কবি মোনালিসা রেহমান'র সাথে যৌথ বই ভালোবাসার সাতকাহন প্রকাশিত হয় ২০১৬ এবং ২০১৭ সালের একুশের বই মেলায়। ২০১৬ সালে পেয়েছেন 'সমতটের কাগজ' থেকে প্রাবন্ধিক হিসাবে পুরস্কার। ১৬ বছর আন্তর্জাতিক এনজিওতে চাকরী শেষে বর্তমানে "হেঁসেল" নামে রংপুরে একটি রেস্টুরেন্ট পরিচালনা করছেন। লেখকের লেখা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পত্রিকাতেও প্রকাশিত হয়েছে।

ফেসবুকে আমরা