যোগ্য স্বামীর আশায় না থেকে নিজেকে যোগ্য করে তোলো

শনিবার, নভেম্বর ২, ২০১৯ ৭:১৮ AM | বিভাগ : সমাজ/গবেষণা


নারী নিজেকে বিয়ের পাত্রী করে তোলার থেকে নিজেকে যোগ্য করে তোলো৷ শিক্ষা আর জ্ঞান আহরণ করো। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সাথে সাথে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নিজেদের পদার্পণ করো। এগুলো মানুষকে মানসিক প্রশান্তি দান করে। অনেক পরিবারে এসব করার সুযোগ থাকে না। পারিবারিক একটা বাঁধা সামনে এসে দাঁড়ায়। একজন পুরুষ তার সমস্ত জীবনে পরিবার থেকে অনেক সুযোগ পেয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে নারী তার গণ্ডি পেরিয়ে যেতে অনেকগুলি বাঁধার সম্মুখীন হয়। এই বাঁধায় নারীটি তার সমস্ত জীবনের স্বপ্নগুলোকে গলা টিপে হত্যা করে।
 
 
ধরুণ আপনার গান পছন্দ, পরিবার আপনাকে বাসায় শিক্ষক রেখে শেখাচ্ছে, কিন্তু যখন বাইরে কোথায় প্রোগ্রাম করতে যাবেন তখন আপনি পরিবারের সমর্থন পাবেন না। একা কোথাও যাওয়াটা নিরাপদ নয়, এই যুক্তির কাছে আপনি হেরে যাবেন। এই পুরুষশাষিত সমাজ ব্যবস্থায় নারী শুধু একজন গৃহিণীর ভূমিকা পালন করবে সেটা দেখতেই তাদের চোখকে সদা প্রস্তুত রাখে। পায়ের বেড়ী আর শাসন নিজেদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করবে। বাইরে গেলেই আপনি একজন পুরুষের দৃষ্টিগোচর হবেন। পুরুষ আপনাকে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বি ভাববে। আপনি তখন পদে পদে বাঁধা পেয়ে নিজেকে গুটিয়ে নিতে চাইবেন। ঘরমূখী চিন্তা আপনাকে পিছিয়ে দিবে। থাক এসব করে কী হবে? সেইতো বিয়ের পর চুলার পাড়েই কেটে যাবে। একজন নারী নিজস্ব মেধা কাজে লাগিয়ে আজকাল অনেক উন্নত পেশা বেছে নিয়েছেন।
 
প্রেম, বিয়ে আর সংসারের আবেগে ডুবে গিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ মাটির সাথে মিশে দিও না৷ আত্মবিশ্বাসের সাথে পড়াশুনার সিঁড়ি বেয়ে আত্মনির্ভরশীলতার পথ ধরো৷ যখন নিজের কাছে একটা চাকরী থাকবে, নিজের জন্য টাকা খরচ করার সামর্থ্য থাকবে তখন অন্য কোনো কষ্ট তোমাকে ছুঁতে পারবে না৷ তোমাকে কেউ অবহেলা করলো, কেউ কটু কথা বললো এসব গায়ে লাগবে না৷ বলিষ্ঠ হয়ে জীবন পথের সকল বাঁধা পার করতে পারবে৷ মাথা উঁচু করে তখন বলবে এখন আমার বিয়ে করার সময় হয়েছে৷ নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারার বয়স হয়েছে৷ সমাজের অন্য লোকের কথায় কান দিবে না৷ পরিবারকে বোঝাও জীবন তোমার, তাই তাকে সাজানোর দায়িত্বটাও তোমার৷
 
জীবনের গল্পগুলো শেষ হবার নয় ৷ সম্পর্কের টানাপোড়নে শুধু সময় অতিবাহিত হয়৷ তারপর কখনও প্রাপ্তি অথবা অপ্রাপ্তির দোলাচলে জীবন খোঁজে নিশ্চিত ঠিকানা৷ অবহেলা, ঘৃণা বা কখনও ভালোবাসার টানে মানুষগুলো দিশেহারা হয়৷ অব্যক্ত কথাগুলো মনের ভিতরে গোপনে ঘুরপাক খায় ৷ কিছু প্রশ্ন জাগে অন্তরে৷ মিছে এই ধরণী, এই বেঁচে থাকা আর ত্যাগ স্বীকার৷ একদিন মৃত্যুর দরজা এসে সামনে দাঁড়াবে৷ কোনো অভিযোগ নেই কারো কাছে, নেই কোনো প্রত্যাশা৷ আপন ভুবনে চলতে থাকে পদচারণা ৷ শান্তি অথবা স্বস্তির নেশায় ছুটে চলে অগ্রযাত্রা৷ কালক্ষেপণ হয়, বিশ্বাস ভঙ্গ হয়, সম্পর্ক কখনো সমান্তরাল রেখায় বসবাস করে৷ নিশিদিন কর্ম ব্যস্ততার মাঝে কেটে যায় জীবনের গতিহীন পথচলা৷ কখনও থেমে যেতে চায় নিঃশব্দ আকুতি।
 
এই যে নারীরা শুনুন, কারো জন্য কারো জীবন কখনোই আটকে থাকে না। সেজন্য আত্মবিশ্বাস থাকতে হবে যে কোনো পরিস্থিতিকে সামাল দেয়ার জন্য। আর অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়া নারী কখনই মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে না। জীবনে আপনার বেঁচে থাকার জন্য একজন পুরুষই কি সর্বস্ব?
 
বিয়ে নারীর সামাজিক পরিচিতি মাত্র৷ এটি নারীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির পথে চলার অন্তরায়৷ বেশীর ভাগ নারী বিয়ের পর পরিবারে নিজের মূল্যায়ন পায় না৷ শুধু স্বপ্নগুলোর মৃত্যু ঘটে৷ নিজেকে পরিচালিত হতে হয় অন্যের মতামতে৷ ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে মনোনিবেশ করতে হয় স্বামী আর শ্বশুরবাড়ীর মন যোগাতে৷ নারীর ভিতরে জমা হতে থাকে ক্ষোভের বাক্স৷ ধীরে ধীরে নারীটি তার প্রাত্যহিক জীবনকে মেনে নিতে চেষ্টা করে ঠিকই৷ কিন্তু কখনই আত্মার শান্তি মিলে না৷ ভেবেই নেয় আমার এই গণ্ডি পেরিয়ে বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়৷ কারণ সংসার সামাল দিয়ে বাইরে গিয়ে কাজ করলে হাজারটা প্রশ্নের জবাব তৈরী রাখতে হয় পরিবারের মানুষগুলোর জন্য৷
 
তারপরও সংগ্রাম করে অনেক নারী এগিয়ে গিয়েছে নিজ বা পরিবারের সহযোগিতায় ৷ কিন্তু স্বাবলম্বী হয়েও তারা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার৷ নারীর জীবনের সুখানুভূতিগুলো জানার জন্য পরিবার কখনও এগিয়ে আসে না৷ নারীকেই সমঝোতা করে সংসার টিকিয়ে রাখতে হয়৷ ছাড় দেয়ার ক্ষেত্রে স্বামী, সন্তান আর পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা উদাসীন৷ এখানে পুরুষদের সাথে নারীও জড়িত থাকে তার চলার পথের গতিটাকে থামিয়ে দেবার জন্য৷ নারী বাইরে গেলে শুনতে হয় চরিত্র হননের রসালো গল্প৷ এই একটি অস্ত্রই সবাই ব্যবহার করে নারীকে দমন করার জন্য৷ পরিবারে নারীটাকে অসম্মান করতে পারলে যেনো সবার মন খুশি থাকে৷ অমর্যাদা প্রাপ্তি যেনো শুধু নারীর জন্য৷ নারীর একাকীত্ব হৃদয়ে গোপন ব্যথা গুলো জানার প্রয়োজন থাকে না৷ সন্তানও অনেক সময় মায়ের মনে জমে থাকা আকাঙ্ক্ষাগুলো বুঝতে চায় না৷ সে শুধু বোঝে মা-বাবা এক ছাদের নীচে বসবাস করবে৷ কিন্তু তাদের যে আর এক সঙ্গে থাকাটা সম্ভব নয়৷ শুধু নারী বিয়ে নামক সামাজিকতার বদ্ধ ঘরে অবলীলায় নিঃশেষ হতে থাকে৷ জীবন নামক একটা সুখের আকুতি জ্বলতে থাকে শিখাহীন প্রদ্বীপ হয়ে৷
 
পরিবারের স্বামী তথা অন্যান্য সদস্যরা যদি নারীর সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টায় তৎপর হয়, তাহলে হয়তো নারী স্বস্তির মুখ দেখবে বলে আশা করা যায়৷ এখানে নারীর প্রতি ইতিবাচক মানসিকতার প্রসার ঘটানো সবচেয়ে বেশী দরকার৷
 
আশেপাশের ভণ্ড পুরুষও তোমার আয়ের টাকা দেখে পিছু নিতে পারে, সেদিকটাও খেয়াল রাখতে হবে৷ এমনভাবে অনেক শিক্ষিত নারীর জীবন নষ্ট হয়ে গেছে৷ তাই সাবধান থাকতে হবে৷ যোগ্য স্বামীর আশায় না থেকে নিজেকে যোগ্য করে তোলো৷
 

  • ২৪৪২০ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

কেয়া তালুকদার

কবি ও প্রাবন্ধিক কেয়া তালুকদারের তিনটি কবিতার বই বের হয়েছে; "পূর্ণতা ফিরে এসো", "ছায়ামানব" এবং কলকাতার কবি মোনালিসা রেহমান'র সাথে যৌথ বই ভালোবাসার সাতকাহন প্রকাশিত হয় ২০১৬ এবং ২০১৭ সালের একুশের বই মেলায়। ২০১৬ সালে পেয়েছেন 'সমতটের কাগজ' থেকে প্রাবন্ধিক হিসাবে পুরস্কার। ১৬ বছর আন্তর্জাতিক এনজিওতে চাকরী শেষে বর্তমানে "হেঁসেল" নামে রংপুরে একটি রেস্টুরেন্ট পরিচালনা করছেন। লেখকের লেখা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পত্রিকাতেও প্রকাশিত হয়েছে।

ফেসবুকে আমরা