নারী দিবস ও নারীবাদ

রবিবার, মার্চ ৮, ২০২০ ৫:১৪ PM | বিভাগ : আলোচিত


 
আজ আর্ন্তজাতিক নারী দিবস। প্রতি বছর এই দিবসটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় নারীদের সম্মান করা উচিৎ, অধিকার দেয়া উচিৎ। নারীরা ধর্ষিত হলে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সবার সামনে তাদের ঘটনার বর্ণনা দিতে হয়। তারপরও সঠিক বিচার কি হয়? ধর্ষিতার পরিবারকে কেস তুলে নেবার হুমকি দেয়া হয়। অপরাধীরা বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়। কতো মায়ের বুক খালি হচ্ছে কন্যা শিশু ধর্ষণের পর হত্যা করে। সাইবার ক্রাইম করে ব্লাকমেইল করা হচ্ছে নারীদের। পিতার স্বীকৃতির জন্য কতো শিশুর মা দ্বারে দ্বারে ঘুরছে৷ অনুষ্ঠানে গেলে নারীদের টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে বিবস্ত্র করা হয়। নারীরা ঘরের বাইরে গেলে স্বামী এবং পিতা মাতারা চিন্তিত থাকেন নিরাপদে ঘরে ফেরার। কর্মক্ষেত্রে এবং ঘরের ভিতরে নির্যাতিত হচ্ছে কতো নারী!
 
শুধু দিবস পালন নয়, শুধু আইন করে নয়, নারীদের প্রতি পরিবার ও সমাজের সুস্থ্য মানসিকতার উদ্ভব ঘটাতে হবে। রাষ্ট্রের বিচার ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে নারীদের ন্যয় বিচার প্রাপ্তির সহায়ক হতে হবে। সর্বোপরি অভিভাবকদের মেয়েদের শিক্ষিত ও স্বাবলম্বী করার ব্যপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে৷
 
নারীদিবস নিয়ে কিছু বুদ্ধিজীবিদের চুলকানি দেখলে মনে হয়, তাদের ঘরের নারীদের অধিকার আর স্বাধীনতায় পরিপূর্ণ করে রেখেছে৷ তাদের মতে পুরুষের বিছানায় শুয়ে কেনো নারী দিবস আর নারীবাদ নিয়ে গলা ফাটাই৷ মানুষের মৌলিক চাহিদার মতনই পুরুষ-নারীর যৌন চাহিদা আর একটি চাহিদা৷ এখানে শুধু নারী তৃপ্ত হয় না, পুরুষ তার ষোলো আনা পূর্ণ করে তবেই ছাড়ে৷ আরে বুদ্ধিজীবিগণ যৌন চাহিদা আর নারীর অধিকার আদায় এক বিষয় না৷ এটি না বুঝেই বুদ্ধিজীবি হলেন ক্যামনে? জাতির কাছে আমার প্রশ্ন। এসব নিয়ে ট্রল করার আগে বিষয়গুলি সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা নিন৷
 
নারীবাদী কোনো লেখা লিখলেই কিছু পুরুষ তাদের গুষ্ঠি উদ্ধার করতে থাকেন৷ তাদের পুরুষ বিদ্বেষী বলে গালি দিতে থাকে৷ এর সাথে আছে বিশ্ব বিখ্যাত গালি বেশ্যা৷ আবার কোনো এক পুরুষতান্ত্রিক নারী বলেছে, নারীরা পুরুষের প্রিয়ভাজন হতে পারে না বলেই তারা নারীবাদী হয়ে উঠে৷ আবার কেউ কেউ বলে বেশীরভাগ নারীবাদীরা ডিভোর্সী৷ তাই তারা পুরুষদের বিরুদ্ধে কথা বলে৷ আবার কেউ বলে নারীবাদীদের মেনোপজের পর তারা নারীবাদী হয়, কারণ তখন যৌন চাহিদা থাকে না৷ আরো বলে নারীবাদীরা যৌন স্বাধীনতায় বিশ্বাসী৷ এসব ধারণা নিতান্তই অমূলক৷ সব নারী তার জীবনের সাথে ঘটে যাওয়া নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে পারে না৷ আবার সব নারীই নারীবাদী হয়ে উঠতে পারে না৷ যারা নারীবাদী হয়ে উঠে তারা মননে নারী স্বাধীনতা ও নারী পুরুষের সম অধিকার লালন করে৷ নারীর প্রতি সমাজের বৈষম্যকে তুলে ধরে৷ আর এই বৈষম্যের ধারক হলো পুরুষ এবং পুরুষতন্ত্রের মনগড়া নিয়মনীতি৷ এর সাথে আছে পুরুষতান্ত্রিকতা লালনকারী কিছু নারী৷ যারা নিজের জীবনে সেটা বহন করে এবং অন্য নারীকেও সেই বলয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে ভালোবাসে৷ যার দ্বারা নারী প্রতিনিয়ত পদদলিত হচ্ছে৷ শারীরিক ও মানসিক হয়রানী ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে৷ নারীবাদীরা সেই সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয় এবং সেখানে নারী ও পুরুষের কৃত অন্যায় গুলোকে আঙ্গুল দিয়ে চিহ্নিত করে৷ আবার পুরুষ নির্যাতনের কথা বলে৷ যেখানে সেই চিহ্নিত নারী ও পুরুষদের মানসিকতার পরিবর্তন হলেই শুধু তা বিলোপ করা যাবে৷
 
সংসার জীবনে একজন মায়ের কাছেই পুরুষরা শিখে আসে কীভাবে মা তার জীবন যাপন করে আসছে৷ সেখান থেকেই সে ঘরের বোন, বউ আর বাইরের নারীদের সাথে তেমন ব্যবহার করছে৷ সেজন্য ঘর থেকেই এই মানসিকতা পরিবর্তনের জন্য কাজ করতে হবে৷ নারীরা সম অধিকার পেলে তার যোগ্যতায় এগিয়ে যেতে পারবে৷ এ সমাজ একজন পুরুষকে যেভাবে এগিয়ে নেয়ার জন্য অগ্রণী ভূমিকা পালন করে সেভাবে একজন নারীকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে তা করে না৷ কারণ তারা মনে করেন নারী থাকবে ঘরে৷ স্বামী সেবা, গৃহস্থলীর কাজ এবং সন্তান লালন পালন করাই নারীর দায়িত্ব৷ যখন একজন নারী শিক্ষিত হয়ে চাকরী করে তখন সে স্বভাবতই তার স্বাধীনতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অর্জন করে৷ তখন ভাই, পিতা অথবা স্বামী কখনই তার এই পরিবর্তনকে মেনে নিতে পারে না৷ তাই প্রতি স্তরে নারী তাদের অধিকার রক্ষার জন্য নিজে প্রতিবাদী হয়৷ আর এটাকে পুরুষরা নারীকে পুরুষ বিদ্বেষী বলে আখ্যায়িত করে৷ তারা বলে নারীরা বাড়াবাড়ি করছে৷ তারা মানতে চায় না৷
 
নারী পুরুষের একে অন্যের সম্পর্কে থাকতে হবে পারষ্পরিক শ্রদ্ধাবোধ৷ যেখানে সেটার অভাব দেখা যাচ্ছে৷ ফলে নারী তখন সংসার ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়৷ তখনই নারী হয়ে যায় পুরুষের চোখে নষ্টা৷ আসলে পুরুষতন্ত্র পুরুষদের ভালো কিছু কি দিচ্ছে? শুধু সংসার চালানোর দায়দায়িত্ব আর নারীর প্রতি গর্জে উঠার শক্তি৷ একজন নারী শিক্ষিত হয়ে চাকরী করলে সে সংসারের দায়িত্ব নিতে পারে সেটি তো পুরুষদেরই লাভ৷ ব্যক্তি পুরুষের সাথে নারীবাদীদের কোনো সংঘর্ষ নেই ৷ যেটা আছে সেটা হলো তার লালন করা পুরুষতন্ত্রের মানসিকতার সাথে দ্বন্দ্ব৷
 
নারী স্বাধীনতা পেলে নষ্ট হয়ে যায় সেই ধ্যান ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে৷ নারীবাদীদের পুরুষ বিদ্বেষী না বলে তারা যেসব বৈষম্যের স্থানগুলো চিহ্নিত করছে সেগলোকে আমলে নিয়ে তা বিলোপ সাধনের জন্য পুরুষ ভাই ও পুরুষতান্ত্রিক নারীরা আসুন একসাথে কাজ করি৷ নারীকে তার যোগ্য আসনে বসানোর চেষ্টা করি৷ নারীদের এগিয়ে দেয়া মানে পুরুষদের পিছিয়ে দেয়া নয়৷ নারী পুরুষ সমভাবে লক্ষ্য অর্জনের প্রক্রিয়া৷ যার প্রতিফলনে সমাজে বিদ্যমান নারী সহিংসতার মূল উৎপাটন করা সম্ভব৷ নারীবাদীদের ব্যক্তিগত আক্রমণ না করে তাদের লেখার সমালোচনা করুন৷
 
বেশীরভাগ নারীরা এখন বোরখা-হিজাব দ্বারা আবৃত। নিজের জগতটাকে সাজানোর চেয়ে অদ্ভুত এক ফ্যাশন নিয়ে মেতে আছে। তারা ভালো স্বামী ধরার জন্য পড়াশুনা করে। স্বাবলম্বী হয়ে নিজের অবস্থার উন্নতির জন্য পড়ে না। তারা নিজের আত্মসম্মান, মর্যাদা প্রতিষ্ঠার চেয়ে স্বামীর মন যোগাতে পড়াশুনা করে শিক্ষিত হয়েও স্বামীর পদবী নিয়ে বসে থাকে। 
 
নারীদিবসে নারী পুরুষ নির্বিশেষে এটাই কামনা করা উচিৎ ঘরে বাইরে নারীদের নির্ভয় অবস্থান সৃষ্টি করা। পুরুষ নারীর সহযোগী, প্রতিদ্বন্দী না। নারীদের শিক্ষা আর স্বাবলম্বিতা পথটাকে সুগম করা। সমাজে নারীদের পূর্ণ মর্যাদা স্থাপন করা। পরিবার, সমাজের পুরুষদের হতে হবে নারীর প্রতি সংবেদনশীল।
 

  • ১৮৩ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

কেয়া তালুকদার

কবি ও প্রাবন্ধিক কেয়া তালুকদারের তিনটি কবিতার বই বের হয়েছে; "পূর্ণতা ফিরে এসো", "ছায়ামানব" এবং কলকাতার কবি মোনালিসা রেহমান'র সাথে যৌথ বই ভালোবাসার সাতকাহন প্রকাশিত হয় ২০১৬ এবং ২০১৭ সালের একুশের বই মেলায়। ২০১৬ সালে পেয়েছেন 'সমতটের কাগজ' থেকে প্রাবন্ধিক হিসাবে পুরস্কার। ১৬ বছর আন্তর্জাতিক এনজিওতে চাকরী শেষে বর্তমানে "হেঁসেল" নামে রংপুরে একটি রেস্টুরেন্ট পরিচালনা করছেন। লেখকের লেখা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পত্রিকাতেও প্রকাশিত হয়েছে।

ফেসবুকে আমরা