কেয়া তালুকদার

কবি ও প্রাবন্ধিক কেয়া তালুকদারের তিনটি কবিতার বই বের হয়েছে; "পূর্ণতা ফিরে এসো", "ছায়ামানব" এবং কলকাতার কবি মোনালিসা রেহমান'র সাথে যৌথ বই ভালোবাসার সাতকাহন প্রকাশিত হয় ২০১৬ এবং ২০১৭ সালের একুশের বই মেলায়। ২০১৬ সালে পেয়েছেন 'সমতটের কাগজ' থেকে প্রাবন্ধিক হিসাবে পুরস্কার। ১৬ বছর আন্তর্জাতিক এনজিওতে চাকরী শেষে বর্তমানে "হেঁসেল" নামে রংপুরে একটি রেস্টুরেন্ট পরিচালনা করছেন। লেখকের লেখা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পত্রিকাতেও প্রকাশিত হয়েছে।

উলঙ্গ হলো বাংলাদেশ

বাবারা আমাকে ছেড়ে দাও, ভাইরা আমাকে ছেড়ে দাও। বিবস্ত্র এক নারীর আর্তনাদ। নারীটিকে বিবস্ত্র করে তার যোনীতে লাঠি, টর্চ ঢুকিয়ে দিয়ে আঘাত করেছিলো সেই নরপশুরা। আর সেই নির্যাতিত নারীর আর্তনাদে কেঁপে উঠেছিলো সারা ঘরটি। নিজ ঘরে স্বামীকে বেঁধে রেখে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ভিডিও করে। স্বামী দীর্ঘ বছর পর তার স্ত্রীর কাছে ফিরে এসেছিলো বলে। এ সম্পর্ক অবৈধ। আর হুমকী দেয়া হয় চাঁদা না দিলে এটি ফেসবুকে ছেড়ে দেয়া হবে। ঘটনাটি ঘটেছিলো নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে ২ সেপ্টেম্বর। এতদিন পর যখন চাঁদা না পেয়ে নরপশুরা সেটি ফেসবুকে পোষ্ট করে দেয় তখন প্রশাসনের টনক নড়ে। এতদিন নির্যাতিত নারীটি প্রতিনিয়ত হুমকীর মুখে ছিলো। অবশেষে থানায় মামলা হলো। আসামীরা ধরা পড়লো।

এটি আমাদের দেশের চিত্র ভাবতেই যেন শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠছে। এ কেমন বাংলাদেশ? আহেলী জাহেলিয়াতের যুগে এরকম ঘটনা ঘটতো। নারীর উপর এই বর্বরতা আবারও ফিরে এসেছে এই একুশ শতকে। এটা কতটা ভয়াবহ, কতটা অনিশ্চয়তার মধ্যে আমরা নারীরা বসবাস করছি। ৭১ এ পাক বাহিনীর এ রকম ধর্ষণের ঘটনা ঘটাতো কিন্তু তারা ভিডিও ভাইরাল করে নি। তার চেয়েও নিষ্ঠুর এই নরপশুরা। একটা স্বাধীন সার্বোভৌম রাষ্ট্রের একি চিত্র। দেশটাকেই উলঙ্গ করে ছাড়লো এদেশের সোনার ছেলেরা। রাজনীতির আশ্রয়ে ঘটিয়ে বেড়াচ্ছে অপরাধ আর দুর্নীতি। তাদের কোনো বিচার, শাস্তি হয় না। আইনের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে এসে আবারও অপরাধমূলক কর্মে জড়িয়ে পড়ে। যুদ্ধ করে স্বাধীন করা দেশে আমরা জনগণ কি এই আশা করেছিলাম?

নারীর প্রতি এই সহিংসতা রুখতে বিচার ব্যবস্থাকে হতে হবে নির্দলীয়। প্রশাসনকে হতে হবে কঠোর। ঘটনা ঘটার পর আমরা সবাই গর্জে উঠি। যাতে এসব ঘটনার শাস্তি দৃষ্টান্ত মূলক হতে হবে যাতে কেউ এমন ঘটনা ঘটার সাহস না পায়। মামলা চলাকালীন ভিকটিমকে সহযোগিতা করা, যথাযথ প্রমাণ সাক্ষী যাতে পাওয়া যায় তার ব্যবস্থা করতে হবে। বিচারের দীর্ঘসূত্রিতায় যেন এসব ঘটনা ধামাচাপা না হয় সেই দিকে নজর রাখা। ধর্ষণের ঘটনা ঘটে, আসামী ধরা পড়ে, শাস্তির খবর শোনা যায় কিন্তু তারপর আর জানতে পারছি না, সত্যিকারের শাস্তি হলো কিনা? ধর্ষণের কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। না হলে এদেশে ধর্ষণ চলতেই থাকবে আর বাড়তেই থাকবে। যা নারীর অগ্রগতির পথে অন্তরায়। পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাহতে হবে জীবনমূখী। সন্তানদের উপর নজরদারী রাখতে হবে।

ধর্ষণের কারণ হিসাবে নারীদের বেপর্দা বাইরে যাওয়াকে অনেকে দায়ী করেন। যারা এসব পড়ে তারাও কি রক্ষা পেয়েছে? অতএব নারীদের পোষাককে দায়ী না করে পুরুষজাত নিজেদের সংযত করুন। নিজেদের পুরুষদণ্ডকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখুন। মাদক আর পর্ণসাইড দেখা বন্ধ করুন। নারীকে ইচ্ছে করলেই ধর্ষণ নির্যাতন করা যায় এসব মনোবৃত্তি থেকে বের হয়ে আসুন।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নারীকে পুরুষের অধিনস্ত ভাবা হয়। নারী দুর্বল, নারী ঘরে থাকবে, নারী সন্তান প্রতিপালন করবে, নারী রান্না করবে এই ভাবনা থেকেই পুরুষ নারীদের ঘরের বাইরে দেখতে পছন্দ করে না। নারীরা এই অবস্থার দেয়াল ভেঙে এখন অনেক এগিয়ে গিয়েছে। তারা শিক্ষা আর কর্মে এখন সাফল্যের শিখরে। তাই পুরুষের শোষণ, নির্যাতনকে মেনে নিয়ে ঘরে থাকবে সেই যুগ এখন আর নাই। পুরুষের পুরুষদণ্ডের জোর খাটিয়ে নারীকে নির্যাতিত করার প্রবণতা রুখতে হবে নারীদেরকেই। এজন্য নারীকে শারীরিক ও মানসিক শক্তি আর সাহস যোগাড় করতে হবে। প্রয়োজনে কুমফু কারাতে শিখতে হব এইসব ধর্ষকদের প্রতিহত করতে। সর্বোপরি সামাজিক আন্দোলন জোরদার করতে হবে। পুরুষের ভয়ে ঘরে বন্দী হয়ে থাকার দিন চলে গেছে। নারীর যোনীকে রক্ষা করার জন্য নিজেদেরকেই সর্বাত্বক চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। প্রতিবাদের ঝড় তুলতে হবে। আমার যোনী আমার ইচ্ছে এই মনোভাব ব্যক্ত করতে হবে। বাইরে বের হলে আত্মরক্ষাকারী সরঞ্জাম সঙ্গে রাখতে হবে।

স্বাধীন এই বাংলাদেশ নারীদের অভয়ারণ্যে পরিণত করতে রুখে দাঁড়াতে হবে এইসব ধর্ষকদের বিরুদ্ধে। না হলে এভাবেই বার বার উলঙ্গ হতে থাকবে সোনার বাংলাদেশ।

769 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।