মুখরা রমণী থুক্কু স্টুপিড স্ত্রী বশীকরণের গল্প

শনিবার, মে ২৩, ২০২০ ৫:২২ PM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


কিছুদিন আগে এই কঠিন সময়েও ঈদের শপিং-এ যেতে চাওয়া স্ত্রীদের নিয়ে অনেক স্বামী/পুরুষ নানান রকম পোস্ট দিয়েছেন যার অধিকাংশই আসলে মজা করার জন্যই করা। অনেক পোস্টে, ভিডিওতে অনেকে স্ত্রীদের ঘরের ভাইরাস বলে উল্লেখ করছেন। বাইরে করোনা ভাইরাস ঘরে স্ত্রী ভাইরাস! কী সাংঘাতিক! আমি তখন একটা স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম 'এই কঠিন সময়েও শপিং করতে যেতে চায় এমন স্টুপিড স্ত্রীদের নিয়ে আপনারা সংসার করছেন কিভাবে? আমার সেই স্ট্যাটাস এর মর্মার্থ অনেকেই ধরতে পারেন নি বলে আমার ধারণা।

স্টুপিড স্ত্রীদের নিয়ে দু'টো কথা বলি। এখন অধিকাংশ স্বামীরাই ঘরে বসে অফিস করছেন। আগে অফিসের ফাঁঁকে চা বিড়ি পান করার জন্য বাইরে যেতেন কলিগদের সাথে। বসরে গালি দিতে দিতে কিংবা নারী সহকর্মীর শাড়ি নিয়ে টিপ্পনী কাটতে কাটতে দু'টো সুখটান দিয়ে ১৫ মিনিট পর ডেস্কে ফিরতেন। কিন্তু ঘরে বসে যখন অফিস করছেন তখন বাইরে গিয়ে সুখটান দেবেন, এক কাপ চা খাবেন সেই সুযোগ নাই! কভিড মামা আপনাকে জড়িয়ে ধরতে বাইরে দাঁড়িয়ে! তাহলে আপনার জন্য চা-কফি কে বানায়!! স্ত্রী জিন্দাবাদ!! (ব্যাচেলরদের বাদ দিচ্ছি এই তালিকা থেকে, আপনাদের জন্য বটিকা আছে)! রোজার দোহাই দেবেন না, এটা মাত্র এক মাসের ব্যাপার! আপনি তারও আগে থেকেই ঘরে বসা এবং কপাল ভালো হলে আরও কিছুদিন ঘর থেকে অফিস করতে হতে পারে! খুব ব্যাতিক্রম ছাড়া আপনার চা-কফি বা কাজের সময় টুকটাক নাস্তা আপনার স্ত্রী নামক ভাইরাসই আপনাকে বানিয়ে দেয়। আগে বাসায় ফিরতেন দেরী করে এবং অবশ্যই বাইরে থেকে নানান কিছু খেয়ে আসতেন, হয়তো নিয়েও আসতেন (ব্যতিক্রম ছাড়া)। এখন সারাদিন বাসায় বন্দি! মনতো এটা সেটা খাই খাই করে। তাই আপনার জন্য কেক, বিস্কুট, পুডিং, পিজা-পাস্তা, পুরী- সিঙ্গারা, চিকেন ফ্রাই, ফিস ফিঙ্গার, চটপটি, নুডুলস এমনকি জিলাপিও ঘরে বানাচ্ছেন আপনার স্ত্রী!  নবরত্ন পোলাও, কাচ্চি বিরিয়ানি, ফ্রাইড রাইস, চিকেন দমপোক্ত, মালাই চাপ, চিকেন চাপতো আছেই! এতোসব কি আপনারা স্বামীরা করেন? অনেক স্বামীই হেল্প করেন, অধিকাংশই করেন না কিন্তু মূল কাজটা স্ত্রীদেরই করতে হয়! আপনি বলবেন এগুলোতো আমি না থাকলে বিকেলের নাস্তার জন্য আগেও বানাতো!  বানাতো তবে অন্য সময় আর এখনকার সময়টা কিন্তু ভিন্ন।

এখন কিন্তু সাহায্য করার জন্য সমীরনের মা নেই! সমীরনের মায়েরাও ছুটিতে! সমীরনের মা ও কিন্তু নারী! তার মানে সব দায়িত্ব, সব কাজের একার ভার কিন্তু এখন স্ত্রীদের, মায়েদের। তাঁরা সংসারের যাবতীয় মূল কাজ শেষ করে আলাদা করে এখন অনেক কিছু করেন যেহেতু সবাই এখন ঘরে। ঘরে এখন মানুষ বেশি, কাজ বেশি, আবদার বেশি। মায়েদের এই সময় সবচেয়ে বড়ো চ্যলেঞ্জ হলো বাচ্চাদের নিয়ে। না আমি বাবাদের ভূমিকারর কথা বাদ দিচ্ছি না। কিন্তু বছরের ১২ মাস সন্তান নিয়ে থাকা মায়েদের ভূমিকাটাই এখানে মূখ্য। আপনি এখন সারাদিন বাসায় থাকেন (অফিসের কাজই করেন বসায় বসে অস্বীকার করছি না) বলে বাচ্চাকে কিছুটা দিতে পারছেন বা বলা চলে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এই পৃথিবীর অন্যতম কঠিন কাজ  আমার মতে বাচ্চা সামলানো। তার মন বুঝে তার মতো চলা খুব কঠিন (যেহেতু তারা সংবেদনশীল)। আর এখন এই দীর্ঘ বন্ধে ঘরে থেকে থেকে তারা আরো বেশি জেদি হয়ে উঠছে, বিরক্ত হয়ে উঠছে; কারণ সে বাইরে যেতে পারছে না, স্কুলে যেতে পারছে না, বন্ধুদের সাথে খেলতে পারছে না। আমরা বড়রাই বিরক্ত হয়ে যাচ্ছি বাচ্চাদের কথা বাদই দিলাম। এই সময় সব বয়সীদের মনস্তাত্ত্বিক চ্যলেঞ্জ এক বিরাট চ্যালেঞ্জ আর সেখানে অভিনব সব কায়দায় বাচ্চাদের মন ভুলিয়ে ভালো রাখার কাজটা মায়েরাই করছেন। বাবারা সহযোগী। অনেক বাবা বলবেন বাচ্চা বেশিরভাগ সময়তো আমার কাছেই থাকছে বাসায়! হ্যাঁ সত্যি থাকছে। আগে সে স্কুলে থাকতো বা মায়ের কাছে। আর এখন যখন তার মা নানানজনের নানান আবদার পূরন করতে কিচেনে বা সমীরনের মায়ের অনুপস্থিতিতে কাপড় ধুতে বাথরুমে ব্যস্ত তখন বাচ্চার খেয়াল রাখলে কী এমন করে ফেললেন শুনি!! বাচ্চাতো আপনারও, এই সংসারও আপনাদেরই।

আপনারা এই কদিন দুটো থালাবাটি আর কাপড় ধুয়ে হাঁপিয়ে উঠছেন! শখ করে মাঝে মাঝে রান্না করছেন! সেটা ফেসবুকে দিয়ে ক্রেডিট নিচ্ছেন আবার স্ত্রীকে এই ফেসবুকেই করোনার চেয়ে কঠিন ভাইরাস বলে গালি দিচ্ছেন! একবার ভাবেনতো আপনার সেই মায়ের কথা যার যুগের পর যুগ কোনো গৃহকর্মী ছিলো না সাহায্য করার জন্য! কিন্তু তিনি একা হাতে সব সামলেছেন!! একবার ভাবুন আপনার স্ত্রীর কথা যিনি এই কঠিন সময়ে সমীরনের মায়েদের ছাড়া সব সামলাচ্ছেন সাথে চাকরিও! জ্বী জনাব চাকরি কিন্তু ঘরে বসে আপনি একা করছেন না! অনেক নারীও করছেন। ঘরে বসে বাহির সামলাতে সামলাতে নারী ঘরও সামলাচ্ছেন। সেই সাথে খুব ব্যক্তিগতভাবে রাতে আপনাকেও সামলাতে হচ্ছে তাকে! একই সাথে নারী সহিংসতার শিকারও হচ্ছেন! এই লকডাউন লকডাউন খেলার শুরু থেকেই সারাবিশ্ব জুড়ে ঘরে নারীর উপর সহিংসতার চিত্র আমাদের সামনে আসছে। ইটালী, আমেরিকা ফ্রান্স, ভারত বাংলাদেশ এবং আর ও অনেক দেশে এখন ঘরে ঘরে সহিংসতার মাত্রা বেড়েছে যেখানে স্ত্রীরাই হচ্ছেন মূল ভিক্টিম। অনেকের ভিডিও বার্তা আমরা দেখেছি যেখানে স্ত্রীর টাকার জন্য স্বামী তাকে বেদম মারধর করছে। হ্যাঁ এটা একটা ঘটনা তবে বিচ্ছিন ঘটনা নয়, হরদম হচ্ছে, সব সামনে আসছে না। সহিংসতার সব ধরণও আমাদের সামনে নারীরা আনেন না।

'সেই সাথে খুব ব্যক্তিগতভাবে রাতে আপনাকেও সামলাতে হচ্ছে তাকে' -কী খুব উইয়ার্ড শোনাচ্ছে? সরাসরি বলি। এই লকডাউনে স্ত্রীর উপর যৌন অত্যাচারও বেড়েছে যেটা নারীরা খুব সহজে বলতে চান না। অত্যাচার এই কারণে সারাদিন বেদম শারীরিক খাটুনির পর রাতে শরীর যখন বিছানায় এলিয়ে ঘুমাতে চায় তখন আপনি আপনার যৌন তৃষ্ণার কথা জানাচ্ছেন, ক্লান্ত স্ত্রী রাজি না হোলে আপনি জোর খাটাচ্ছেন!! ইচ্ছের বিরুদ্ধে যৌন সম্পর্ক স্থাপন কিন্তু ধর্ষণ! আপনি সেটা জানেন এবং জেনে বুঝেই স্ত্রীকে প্রায় রাতে ধর্ষণ করছেন (ভাইয়েরা আমার সবার কথা বলছি না)। আপনি বলবেন আমার স্ত্রীরওতো যৌন চাহিদা আছে! অবশ্যই আছে কিন্তু নিজের যৌন চাহিদা এই দেশের খুব কম নারী মুখ ফুটে তার স্বামীকে প্রকাশ করে এবং এখন এই সময়ে সারাদিন অমানুষিক পরিশ্রমের পর শরীর যৌন তাড়না বোধ করার চেয়ে বিছানায় গা এলিয়ে একটু ঘুমাতে বেশি পছন্দ করে! এটা ঘর বাহির দুই সামলানো নারী আমি নিজেই বুঝি। এর জন্য অন্য কাউকে আলাদা করে আমার উদাহরণ হিসেবে নেয়ার কোনো দরকার নাই! হ্যাঁ আমি ভাগ্যবতী দু'জনের ছোট সংসারের সব কাজ আমায় একা করতে হয় না। আমার স্বামীকে বলার আগেই উনি অনেক কাজ করে ফেলেন! আমার স্বামী পুরুষ তাই এই কথাটা বললাম।

আমার বিশ্বাস আপনার শিক্ষিত স্ত্রী শপিং করতে যেতে চায় না! ফেসবুকে এসে ইতরামি করে একটু বিনোদন নিতে চান তাই নারীকূলই শেষ ভরসা তা সে মা হোক, বোন হোক, বউ হোক বা প্রেমিকা! আপনি এসে ফেসবুকে আপনার স্ত্রীর সেন্স অফ প্রপোরশন তুলে ধরছেন সেটা খুব বাহাদুরির কথা নয় কিন্তু! বরং স্ত্রীকে নিয়ে ট্রল করা আপনার মেধা যে নিম্ন স্তরের সেটা প্রমাণ করছেন। ভালোবাসলে কেউ কাউকে ছোট করে না, কোনো প্ল্যাটফর্মেই না! স্ত্রী যেতে চাইলেই আপনি নিয়ে যাবেন কেনো? ফেসবুকে এসে মজা না নিয়ে কথাটা সত্যি হোলে স্ত্রীকে বোঝান! আর যদি কথাটা সত্যি হয় তাহলে বুঝে নেবো আপনি যেমন তেমনই একজন বিয়ে করেছেন!

আর ব্যাচেলরদের বলছি এই লকডাউনে একটা বউ থাকলে খুব ভালো হতো তাই না!  রেঁধে খাওয়াতো আর রাতে আপনি ধুমসে সেক্স করতে পারতেন! কী ব্রো'জ ভুল বললাম! ভুল বললে ক্ষমা চাই! রান্নার জন্য যে সমীরনের মায়েরা নেই! রুমমেটও বাড়ি চলে গেছে, একলা পড়ে গেছেন! আর তাই এতো কিছু থাকতে আপনার নারীকে নিয়ে পোস্ট দেয়ার কথাই মাথায় আসলো! রান্নার সমীরনের মা আর আপনার স্ত্রী বা বান্ধবী কিন্তু এক নয়! সব সময় বলে থাকেন না সারাদিন বাসায় কী করো? এখনতো বাসায় আছেন দেখতে পান নারী সারাদিন বাসায় কী করে? সারাদিন বাসায় সে সংসার সন্তান সামলায়, রাতে আপনাকে সামলায় আর চাকুরিজিবী হোলে................................. বুঝে নেন!

স্ত্রীকে নিয়ে ফেসবুকে ইতরামি না করে যে স্ত্রী পিরিয়ডের তীব্র ব্যথা নিয়ে বাচ্চার পেছনে দৌড়ে কুলিয়ে উঠতে পারছেন না তাকে গিয়ে একটু বিশ্রাম নিতে বলুন আর সারাদিন বাসায় কী করো বলা বন্ধ করুন। সহানুভুতি দেখানোর দরকার নেই, কাজ করে দেখান। সংসার দু'জনেরই। এই কঠিন সময়টা দুজনে মিলে ভালোবেসে পাশাপাশি থেকে কাটান; দেখবেন সব ভালো লাগবে। ইন্সপায়ারিং স্বামী হোন যাতে আর দশজন আপনাকে দেখে শিখতে পারে। (গালির আমন্ত্রণ রইলো)

 


  • ২৪৬ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

কামরুন নাহার

সহকারী অধ্যাপক বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট (পিআইবি)।

ফেসবুকে আমরা