শরৎ তোমার অরুণ আলোর অঞ্জলিঃ জলিকে স্মরণ করি, নিশিকে অভিবাদন।

বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৯ ২:২৪ AM | বিভাগ : আলোচিত


আমাদের সহকর্মী, বিভাগের ছোটবোন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক আকতার জাহান জলি'র মৃত্যুর তিন বছর হয়ে গেল। তাঁর মৃত্যুতে ভীষণ আলোড়ন উঠেছিলো দেশজুড়ে। ভেবেছিলাম সেই উত্তাল আবেগের দিনগুলোতে, দোষী ব্যক্তির বা আরো নির্দিষ্ট করে বললে তাঁর মৃত্যুতে প্ররোচণা দেয়ার অভিযোগ রয়েছে যাদের বিরুদ্ধে, তাদের শাস্তি হবেই। অন্তত শাস্তির দাবি বহাল থাকবেই। থাকবে বিক্ষোভ। কিন্তু তেমন হয়নি। পরের বছরই আর কোনো কথা কেউ লেখেননি।

তাকে আত্মহত্যায় প্ররোচণা দেবার মামলাটির কি কোনো নিস্পত্তি হলো? বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাউন্সিলিং-এর জন্য কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেবার দিকে কি কোনো অগ্রগতি হলো? এই আত্মহত্যাকে ঘিরে যে আন্দোলন দানা বেঁধে উঠেছিলো, সেগুলো থেমে গেলো কেনো? মাত্র তো তিন বছর হল, এমন সব আন্দোলন জারি রাখতে হয় বছরের পর বছর। যদি কার্যকর দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন আনতে হয়।

আমি লিখেছিলাম, 'তবু তুমি আরেক মৃত্যুকে রোধ করো।' লিখেছিলাম, 'আত্মহত্যা সমাধান নয়।' সেজন্য ভয়াবহ আক্রমণের শিকার হয়েছিলাম বাংলাদেশের অনেক নারীবাদীর, জলির কাছের মানুষ দাবিদার কেউ কেউ কয়েক ধাপ এগিয়ে আমার বিরুদ্ধে কুৎসিত লেখালেখিও করেছেন। তাদের কেউ কেউ আমার সহকর্মী, কেউ বা সরাসরি শিক্ষার্থী। সব সহ্য করতে পেরেছিলাম নিঃশব্দে শুধু এ'কারণে যে ভেবেছিলাম সবাই জলিকে এতো ভালোবাসে যে কোনো স্বাভাবিক কথা শোনার পরিস্থিতিতে তারা নেই। সবাই ক্ষুব্ধ। প্রিয়জন হারালে যা হয় আর কী! তখন সত্যি মনে হয়েছিল, এই ভালোবাসার আবেগ সহসা ফুরাবে না, কিছু একটা পরিবর্তন হবেই। হয়নি। কেসটি সম্পর্কে আর কিছুই জানা হল না।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক আকতার জাহান জলিরাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক আকতার জাহান জলি (ছবি ইন্টারনেট)

তখনের মতো আজো মনে করি, আত্মহত্যা সমাধান তো নয়ই, আত্মহত্যাকে মহিমান্বিত করাটাও নেতিবাচক কাজ । বরং আত্মহত্যার ঘটনা যেনো না ঘটে সেই অবস্থান তৈরি করাই জরুরি ধারাবাহিক চেষ্টা হওয়া প্রয়োজন, প্ররোচণাকারীর বিচার দাবির পাশাপাশি। জানি, প্রত্যেকের পরিস্থিতি ভিন্ন। কোন অবস্থায় গেলে একজন আত্মহত্যার মত মরীয়া সিদ্ধান্তে উপনীত হন, সেটা শুধু তিনিই জানেন। তবুও, এমন সব পরিস্থিতিতে, যারা নিজেদের কাছের মানুষ বলে দাবি করি, তাদের সময়োচিত সমমর্মী হস্তক্ষেপ হয়তো পরিস্থিতির খানিকটা উন্নয়ন ঘটাতে পারে। এক্ষেত্রে যিনি আক্রান্ত তাঁর দুঃখে কেবল দুঃখিত হবার চেয়েও কাছের মানুষদের শক্তিশালি অবস্থান নেয়া, প্রয়োজনীয় কাজটা করা বোধহয় জরুরি। বিভাগে যে অপমানকর, অবমাননাকর অবস্থার বর্ণনা শোনা গেছে জলির মৃত্যুর পর, সেখানে বিভাগ পর্যায়ে এসব নির্যাতনবিরোধী অবস্থান নেয়াটাই হতে পারতো তাঁকে সাহায্য করা। আর যে সমাজব্যবস্থায় ডিভোর্স হয়ে গেলে এখনো একজন মা সন্তানের সাথে প্রকাশ্যে দেখা করার অনুমতি পান না, দেখা করতে হয় লুকিয়ে, সেই ব্যবস্থাকে পাল্টানোর শক্ত আন্দোলন না করে এইসব অপমান, নির্যাতন যা একজন মানুষকে তিলে তিলে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেয়, সেই অবস্থাকে পরিবর্তন করা কি সম্ভব? জলির আত্মহত্যার মতো ঘটনায় যদি এসব পরিবর্তনের দিকে মনযোগী না হতে পারি, তবে আর কবে? কিন্তু তেমন কোনো প্রতিজ্ঞা দেখি না চারিপাশে। The Daily Star-এ (লেখাটি পড়তে এখানে ক্লিক করুন) লিখেছিলাম তখন এই বিষয়ে, ছোট লেখায়।

ব্যক্তিগত পরিসর, কর্মপরিসর আর সামাজিক পরিসর- তিন ক্ষেত্রেই মানবিক অবস্থা তৈরি করতে না পারলে এইসব হত্যাকান্ড শেষ হবে না। আমি সব আত্মহত্যাকেই কোনো না কোনো ধরণের খুন বলে মনে করি। কেউ কেউ প্রবল মানসিক শক্তির জোরে প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠতে পারেন। তাঁদের জন্য অভিবাদন। যেমন পেরেছেন আমাদের বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী আর বর্তমানে জাহাংগীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের সহকর্মী নিশাত পারভেজ নিশি। তাঁর হাসি নিজেই বরাভয় দেয় অন্য সবাইকে। নিশি এখন মাস্টার্স করতে যুক্তরাজ্যের দিকে। নিশিকে অভিনন্দন। নিশি সবার প্রেরণা হয়ে উঠুক। ফের বলে রাখি, প্রত্যেকটি ঘটনাই অনন্য, একটার সাথে আরেকটা তুলনীয় নয়, তবে কারো সাহস অন্যকেও সাহসী করুক।

নিশাত পারভেজ নিশি, শিক্ষক, জাবি। (ছবি ইন্টারনেট)

আজকের এই শরতের দুপুর আমি উৎসর্গ করছি প্রিয় জলিকে। জলি, ভুলিনি তোমাকে কখনো। কীভাবে ব্যক্তিগত পরিসর, কর্মপরিসর এবং সামাজিক পরিসরের কাঁটাগুলো একটু হলেও দূর করা যায়, আমার নিশিদিন ভাবনা এবং কাজ এসব নিয়েই। শরতের আজকের দুপুর আমি উৎসর্গ করছি নিশিকেও। নিশির পারাটাই শুধু নয়, সেটা সবার সাথে ভাগ করে নেয়াটা উদযাপনযোগ্য। সকল বিষণ্ণতার মাঝে এই আলোটুকু, আমি নিশ্চিত, জলিকেও আনন্দিত করতো। আশান্বিত করতো।

শরতের আলো আজ ফের বিষন্ন করেছে। শরতের আলো আজ নতুন আশার খবর দিলো। দু'জনকেই শরৎ আলোর অঞ্জলি।


  • ১২৬ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

কাবেরী গায়েন

অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ওসাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ফেসবুকে আমরা