যৌনতা শিশুনির্যাতন ও সামাজিক অবক্ষয়

বুধবার, মার্চ ৭, ২০১৮ ১০:০৯ PM | বিভাগ : প্রতিক্রিয়া


দুই বাংলার কিছু বিক্ষিপ্ত ঘটনা দিয়ে শুরু করা যাক-

১। ভারত

-নির্ভয়া(ভারত) হত্যাকাণ্ডের পর অনেক গুলো ছেলে কমেন্টে বলেছিলো মেয়েটির এত রাতে সিনেমা দেখতে যাওয়া উচিত হয় নি, হুম দয়া পরবশ হয়ে অনেকে অবশ্যই ধর্ষকদের ও কিছু গালমন্দ করেছিলো।

-কিছুদিন আগে কিরণ খের বললেন অটোতে তিনজন পুরুষ বসে থাকায় মেয়েটির উঠে বসা উচিত হয় নি।

-নিউজে দেখলাম জি ডি বিড়লা স্কুলে ২০১৪ সালেও এক শিশুর যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে, তখনও প্রিন্সিপাল পুরো বিষয়টিকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন এবারেও তাই করার চেষ্টা করেন। অর্থাৎ কিছুদিন আগেও আরো একটা ধর্ষণ হয়।

-এক বছর আগে একজন মা এবং তার সো ক্লোজ প্রেমিক নিজের সন্তানের গায়ে প্রায় সাতটা সূঁচ ফুটিয়ে যৌন নির্যাতন করে শিশুটিকে মেরে ফেলে।

-সন্ন্যাসী বৃদ্ধাকে প্রায় বছরখানেক আগে ধর্ষণ করা হয় বিভৎস ভাবে।

২। বাংলাদেশ

-বাবার সামনে ৯ বছরের মেয়েকে ধর্ষণ। তখন পাবলিক প্রতিবাদ করেছে। কারণ তখন এখানে না দিতে পারছিলো ধর্মের দোহাই কিংবা পোষাকের। শেষে এসে, বাপ-বেটি রেল লাইনে আত্মাহুতি দিলো বিচার না পেয়ে।

-কুমিল্লা ময়না মতি ক্যান্টেমেন্টের কালভার্টের নিচে যখন ধর্ষিত তনুর লাশ মেলে, তখন কেউ প্রতিবাদ করলো আর কেউ তনুর চরিত্র প্রশ্ন বিদ্ধ করলো। কেউ কেউ নিউজ হওয়া হেডলাইনের নিচে কমেন্ট করছে "তনু হিজাব পরলে কি হবে, সেটা সেক্সি হিজাব  ছিলো" এখানে ধর্ষণের জন্য ওর সেক্সি হিজাব দায়ী।

-রূপা যখন বাসে ধর্ষন হলো, তখন আমরা বাংলাদেশ ক্রিকেট জয়ের উচ্ছাসে উচ্ছাসিত। এখানেও রূপার দোষ। কেনো সে তার শরীর পুরুষকে আকর্ষীত করে এমন করে সাজিয়েছে? ঠোটে লিপিস্টিক, কপালে কালো টিপ, পরনে জিন্স! ফতুয়া ঐ যে "পোষাক দায়ী"। অবশ্য গরীবের আমোদ ফূর্তি বলতে, সারাদিন কাজ শেষ করে বাসায় গিয়ে বউয়ের কাপড় খোলা। তাছাড়া হেলপার, ড্রাইবার বাসায় যায় সপ্তাহে একদিন। সো এটা হতেই পারে (এগুলো পাবলিকের মন্তব্য)। তবে ভাগ্যিস আমাদের দেশের মন্ডলরা ভারতের মতো তুলনা করেনি এখানে "অটোতে তিনজন পুরুষ বসে থাকায় মেয়েটির উঠে বসা উচিত হয় নি।"

-কিছুদিন আগে আবারো নয় বছরের মেয়ে ধর্ষণ। সংবাদ সম্মেলনে বাবা যখন মেয়ের ধর্ষণের বর্ণনা করে, তখন মেয়েটি বাবার পিছনে লজ্জায় মুখ লুকায়। অথচ সাংবাদিক তার কাজ প্রশ্ন ছুড়া আর আর্টিকেল সাজানো নিয়ে ব্যস্ত। আর পাবলিক ফতোয়া না পেয়ে এক গালাগালি ছুড়ে ধর্ষকের দিকে আর আপসোসে মরে যায় যায় এমন একটা ভাব। কিন্তু এই রাষ্ট্র তখনো লজ্জিত হয় নি, আর না হয়েছি আমি বা আমরা। ধর্ষণ এখানে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। লজ্জার কি আছে আশ্চর্য!

উপসংহার-

উপরোক্ত ঘটনা গুলো সামনে এসেছে, কাগজে ছেপেছে, আমরা সাধারণ মানুষরা জানতে পেরেছি। বেশ ক’দিন হৈ হৈ হয়েছে। ধীরে ধীরে চায়ের কাপে পড়ে থাকা অবশিষ্ট চায়ের মতো সব ঠান্ডা। তারপর, তারপর কী? নিউজ গুলো কটকটি আর ঝালমুড়ির ঠোঙ্গা। হা হা তারপর আবার ঘটেছে, কাগজে ছেপেছে, আবার হৈ হৈ হয়েছে, আবার নিভে গেছে। আবারো ঠোঙ্গা! হে হে 

গুটিকয়েক নিগ্রহের ঘটনা মিডিয়ার মাধ্যমে উঠে এসেছে, আমরা ও কফির কাপ হাতে আলোচনায় মজেছি, এরকম লাখ লাখ ঘটনা সামনে আসে না, টিভির পর্দায় ফুটে ওঠে না, খবরের কাগজের ফ্রন্ট পেজে ছাপা হয় না, মাত্র গুটিকতেক যৌন নির্যাতিত বা নির্যাতিতারা জাস্টিস পায়, হাজার হাজার ছেলেমেয়ে ন্যূনতম বিচারটুকু পায় না। সত্যি বলতে কি এই ঘটনা আবারও ঘটবে, হ্যাঁ বারবার  ঘটবে, যায়গা বদল হবে, ধর্ষণ করার প্রক্রিয়া বদল হবে, ধর্ষকের মুখ বদল হবে, কিন্তু ধর্ষণ? শারীরিক নির্যাতন বা যৌন নির্যাতন চলবে।

আমার মতে, যতদিন যৌনতা, পিরিয়ড, প্রাইভেট পার্টস নিয়ে গোপনীয়তা এবং লজ্জা ব্যাপার টা বজায় রাখা হবে ততদিন অনবরত এই ধরণের ঘটনাগুলো ঘটবেই এবং এর জন্য অনেকাংশে দায়ী উদগান্ডু মা বাবারা। না দায়ী কোনো ধর্ষক না দায়ী ধর্ষিতা কিংবা পোষাক।

হ্যাঁ, তারাই কোনও শিশুকে ধর্ষক তৈরি করেন আবার তারাই কোনও শিশুকে ধর্ষিত বা ধর্ষিতা তৈরি করেন। বিশেষ করে মা প্রধান কালপ্রিট যে নিজের কন্যা সন্তানের গায়ের রঙ নিয়ে এবং সুন্দরী করে তোলার ব্যাপার নিয়ে বড্ড চিন্তিত থাকেন ছোটবেলা থেকেই, এগারো বারো বছরে প্রথম রজঃস্রাব হওয়ার সঙ্গেই সঙ্গেই কেমন যেন তাকে সম্পূর্ণ নারী রূপে গড়ে তোলার সর্বদাই চেষ্টা করেন। পিরিয়ডের কথা কাউকে বলতে নেই, ভীষণ লজ্জার বিষয় যা গোপনে রাখতে হয় এ ধরণের কুমন্ত্রণার বিষ দিনরাত কানে ঢালতে থাকেন। 

মেয়ের স্তন  আকর্ষণীয় ও পুরুষদের উপভোগ্য করে তোলার জন্য প্যাডেড ব্রা ইউজ করতে বলেন, মেয়েরা ছেলেদের তুলনায় দুর্বল, তাদের শরীরের প্রত্যেকটা অঙ্গ অত্যন্ত লোভনীয় এবং তা ঢেকে রাখতে হয় এইসব ফালতু কথা মায়েরাই শিখিয়ে থাকেন!

ঠিক একই ভাবে এই মা বাবারা নিজের পুত্র সন্তান কে ছোটবেলা থেকেই ভীষণভাবে পুরুষ করে তোলার চেষ্টা করেন, এমন পুরুষ যার মধ্যে ভয় থাকতে নেই, দুর্বলতা থাকতে নেই, যাকে চিৎকার করে কাঁদতে নেই, লুকিয়ে হাসতে নেই, তাকে ভয়ংকর শক্তিশালী হতে হবে, প্রতিটা লড়াইয়ে জিততে হবে, ফার্স্ট হতে হবে! পুত্রসন্তানকে পুরুষ করে তোলার চেষ্টায় প্রতিটা বাবা মা তাদের মধ্যে লিঙ্গ বৈষম্যের বিষাক্ত বীজ পুঁতে দেয় একটু একটু করে, তারা বড় হয়ে নিজের পুরুষত্ব নিয়ে গর্ব করে, নিজের লিঙ্গকে শ্রেষ্ঠ মনে করে এবং অন্য লিঙ্গের মানুষ বিশেষত নারীদের বুক থেঁতলে উন্মত্ত কুকুরের মতো দাপিয়ে বেড়ায়।

কটা বাবা মা নিজের ছেলে মেয়েকে গুড টাচ, ব্যাড টাচ সম্পর্কে শেখায়? গোপনাঙ্গে হাত দিলে লজ্জা নয় প্রতিবাদ করতে শেখায়? কন্যার পিরিয়ড হলে তা আর পাঁচটা দৈহিক স্বাভাবিক প্রক্রিয়া কটা বাবা মা এমন বলে? ব্রা যে স্তন আকর্ষণীয় করার দ্রব্যাদি নয় বরং ভ্যান, রিক্সা, সাইকেলে চাপলে দুটো মাংসলপিণ্ড দুলে উঠলে ব্যথা লাগে সেই কারণে ব্রেসিয়ার ইউজ করা উচিত এবং যারা ব্রা পরে কমফর্টেবল ফিল করে না তাদের জোর করে পরার দরকার নেই কটা বাবা মা তা শেখায়? এমন কী বাচ্চারা যদি কখনও শারীরিক নির্যাতনের কথা তাদের মা দের মন খুলে বলে তখনও অনেকক্ষেত্রে গান্ডু মা বিশ্বাস পর্যন্ত করতে চায় না! 

ওরে আবালের দল যৌনতা নিয়ে শিশুদের কোনো ধারণাই নেই। যে জিনিস নিয়ে ওদের ধারণাই তৈরি হয় নি সেই বিষয় নিয়ে কি করে ওরা মিথ্যে কথা বলবে!

এমন অনেক মাকে দেখেছি যারা নিজের মেয়ের ব্রায়ের স্ট্র্যাপ বেরিয়ে গেলেই সঙ্গে সঙ্গে আড়াল করে তা জামার ভিতর ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে, কোনও লোভনীয় খাবার যেন অন্যরা দেখলেই খেয়ে নিতে পারে, এই গোঁড়ামি মার্কা ভাবনাগুলো যতদিন না মস্তিষ্ক থেকে মুছবে ততদিন আমি আপনি আমাদের সন্তান রা কেউই সুরক্ষিত নয়।

তাই আমি বলি মায়েদের- "মা, তুমি তোমার সন্তানকে মানুষ হওয়ার মন্ত্র শেখাও। ছেলে হলে আযান, মেয়ে হলে না। এমন বৈষম্য হটাও। মানুষ হয়ে গড়ে তুলে বৈষম্যে শিক্ষা দেও।"

এবার আসি আমার আপনার কথায়। লিঙ্গ বিভেদ অবশ্যই থাকবে যাতে করে আমরা একটা পুরুষ কে পুরুষ আর একজন নারী কে নারী বলতে পারি। কিছু শারীরিক বৈশিষ্ট্য ও পার্থক্য, লিঙ্গ ভিত্তিক ভেদাভেদ নারী ও পুরুষের মধ্যে বর্তমান।

কিন্তু, লিঙ্গ ভেদ ও লিঙ্গ বৈষম্যের মধ্যে আকাশ পাতাল তফাত। এই লিঙ্গ বৈষম্যের শিকড় যতদিন না সমাজ থেকে উপড়ে যাচ্ছে ততদিন আমি, আপনি, পাড়ার মা মাসি থেকে শুরু করে কাকা, দাদু, রক্ষক, শিক্ষক, হুজুর, পুরোহিত, কিরণ খেরের মতো পাবলিক মেয়েদেরকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করার ও সাবধানে থাকার নির্দেশ দেবেন।

অবাক হওয়ার কিচ্ছু নেই, একপক্ষ যারা ছোটবেলা থেকে নিজেদের যৌন উপভোগ্য ও দুর্বল নরম বস্তু রূপে গড়ে তুলেছে তারা মাথায় হিজাব, গায়ে বোরখা থেকে আপাদমস্তক আজীবন ঢাকতে থাকবে, এবং তার পরেও ধর্ষিতা হবে বারংবার আর এক পক্ষ যারা শিক্ষা পেয়েছে সমস্তরকম মানসিক অনুভূতিই দুর্বলতার কারণ তারা একদিক থেকে নির্যাতিত ও হবে এবং নির্যাতন ও করবে।

আর কিছু বলতে ইচ্ছে করছে না, ঘেন্না করছে শুধু এই মানুষ ই একমাত্র এমন একটা অসভ্য প্রজাতি যারা নিজেদের প্রজাতিকেই আঁচড়ে কামড়ে খুবলে ক্ষতবিক্ষত করে। শরীর এবং শারীরিক পার্টস প্রত্যেকটা মানুষের বাচ্চা বুড়ো, নারী, পুরুষ নির্বিশেষে নিজস্ব ব্যক্তিগত অধিকার, কিন্তু তা লজ্জার বিষয় নয়। শরীরের কোনও অঙ্গ বুক, পেট, পাছা, গোপনাঙ্গ নিয়ে এই হাশ হাশ ব্যাপার টা বন্ধ করুন এবার, যৌনতা নিয়ে রসিকতা করা বন্ধ করুন বরং পারলে আলোচনা করুন নিজের সন্তানদের সাথে।প্লিজ, এইবার মানসিক ভাবে সুস্থতার পরিচয় দিন নিজেকে....তারপরও যদি না পারেন বা না পারি, তবে আমি লিঙ্গ ভেদে বৈষম্য করে বলবো - 

                পরশু শিক্ষক, কাল কাকা

                         কোথায় এলি রে মেয়ে?

                এখানে যে বড়ো কঠিন,

                          তোর মেয়েবেলা বাঁচিয়ে রাখা!

                 নিজেকে নিজে সামলা।

বিশেষ দ্রষ্টব্য : ধর্ষক বলতে কোনও পুরুষ কে বোঝানো হয় নি কারণ আমি ধর্ষক বলতে ধর্ষকই বুঝি। নারী বা পুরুষ নয়।


  • ২৭৪ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

জাহাঙ্গীর আলম

বাহরাইন প্রবাসী। ম্যানেজার অফ বলোবার্ড ম্যান্স ওয়ার।

ফেসবুকে আমরা