যৌনাঙ্গের সুরই যৌন অনুভূতি, মানুষের মৌলিক অধিকার

মঙ্গলবার, জুলাই ১৭, ২০১৮ ৪:০৭ PM | বিভাগ : সমাজ/গবেষণা


কিশোরীদের ব্রেস্টের উথ্থান এবং এর নানামুখী সমস্যা সংক্রান্ত লেখাটি লিখতেই এক কিশোর বন্ধু কমেন্ট করেছেন, এসব কী লিখলেন আপামণি, আমারতো মাথার এক কিলোমিটার উপর দিয়ে চলে গেলো!'

মনে মনে হাসি, আর ভাবী তোমার কী করে মাথার উপর দিয়ে যায়? এখনওতো ছেলেদের বুক পর্যন্তই পৌঁছি  নি।

ইচ্ছে ছিলো না ছেলেদের বুকটুক হাবিজাবি নিয়ে কিছু লিখবো। বিশেষ করে সেই বুক যে বুক দিন দিন একজন নারীর বুকের রূপ ধারণ করে পুরুষের জীবনে ঘন অমাবস্যার আগমণ ঘটায় -জীবন থাকতেও জীবনে প্রাণের স্পন্দন অনুভূতি হয় না, আনন্দ হারিয়ে যায়, জীবনের চাপাকলে রঙ হারায় জীবন। আবার ভাবী কেনো নয়? প্রতিটি জীবনইতো জীবন, এসব অভিজ্ঞতাগুলোওতো জীবনেরই অভিজ্ঞতা। কাউকে না কাউকেতো এর মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়ই, তাহলে?

নারীর জীবনে স্তনের বৃদ্ধিপ্রক্রিয়া কিছুটা কষ্টদায়ক হলেও এতে তার ভবিষ্যত রঙিন, ছন্দময়। কিন্তু পুরুষের জীবনে স্তনের বর্ধিত রূপ একেবারে কিয়ামত ঘটিয়ে দেয়। শুধু শারীরিক সমস্যাই নয় এটা, মানসিকভাবেও তারা ভেঙে পড়ে। আবার সামাজিক জীবনও বাঁধাগ্রস্ত হয় ব্যাপকভাবে। তথাপি হয়তো কিছুই করার থাকে না যদি না সময়ে এই গোপন কথাটি বলার মতো হিম্মত জোটানো যায়। এমন পরিস্থিতিতে পড়ে অনেকেই হয়তো ভাবে গামছা বেঁধে, অথবা ব্রা বা অন্য কোনো উপায়ে ব্রেস্টকে যদি চেস্টের সাথে মিশিয়ে ফেলা যেতো, লোকে বুঝতো না!

আকাশে চাঁদের আগমণ যেমন চারিদিকে আভা ছড়ায় তেমনি মানুষের জীবনে ব্রেস্টের উদয়ও আভাস দিয়েই ঘটে। আর সেখানে তিনি যদি একজন বেগম না হয়ে জনাব হন তখনতো সাড়ে সর্বনাশের কথা। বর্ধিত ব্রেস্ট বুকে নিয়ে সমাজে পুরুষের পথ চলা একজন নারীর ঠোঁকড় খেয়ে খেয়ে চলার চেয়েও কঠিন। তথাপি কী করার থাকে যদি একবার গজিয়েই যায় আপন উদ্যোগে?

আমেরিকাতে শতকরা ৬০% পুরুষ বড় ব্রেস্ট সংক্রান্ত সমস্যায় আক্রান্ত। আনুমানিক ৫০% কিশোরের জীবনেই ১২-১৪ বছরের দিকে ব্রেস্ট বাডের আগমণ ঘটে যেটা স্বাভাবিক অর্থাৎ নিপলের নীচে চাকার মতো শক্ত লাম্পের উদয় হয় এবং ব্রেস্ট বেশ কিছুটা ফুলে-ফেঁপে ওঠে। তবে এদের মধ্যে ৭০% এর জীবনেই সময়ে হরমোনাল ভারসাম্য চলে আসে। বিশেষ করে টেস্টোস্টেরনের কারণে ব্রেস্টের বৃদ্ধি অবরুদ্ধ হয়, শরীরে পুরুষালি ভাব আসে। কিন্তু যদি এমন না হয়?

পুরুষের ব্রেস্টের আকার নারীর মতো বড় হলে সেই সমস্যাকে বলে গাইনোকমাস্তিয়া। মূলত হরমোনাল ভারসাম্যহীনতার কারণেই তাদের ব্রেস্ট গ্লান্ড এবং ব্রেস্ট টিস্যু বৃদ্ধি পেতে থাকে। এর পেছনে ইসট্রোজেন-টেস্টোস্টোরনের ভারসাম্যহীনতা, নানাবিধ গ্লান্ডের সমস্যা, স্বাস্হ্য সমস্যা, বয়স, ড্রাগস, নেশার দ্রব্য, মেডিকেশনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ইত্যাদি ব্যাপক ভূমিকা রাখে। আর সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তি তার নিজের সমস্যাটি সনাক্ত করে সমাধান না করা পর্যন্ত সমস্যায় ভোগেন। উপরন্তু বিষয়টি নিয়ে কথা বলাই মুশকিলের, অথচ ছেলেদের জীবনে ব্রেস্ট বৃদ্ধি শুধু ব্রেস্ট বৃদ্ধিই নয় আরও গভীর কিছু-

হাইপোগোনাডিজম একটি বিষয় যেটা জন্মগত অথবা ইনজুরি বা ইনফেকশনের কারণে পরবর্তীতে জীবনে ঘটতে পারে। এই সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তির পর্যাপ্ত টেস্টোস্টেরনের উৎপাদন ঘটে না। চুল-দাঁড়ি কম গজায়, শরীরে মাসেল গ্রো করে না, স্তন বড় হয়...।

ক্লাইনফিল্টার সিনড্রম জেনেটিক একটি সমস্যা, যেখানে ছেলেদের শরীরে XY সেক্স ক্রোমসমের পরিবর্তে একাধিক এক্স যেমন XXY ক্রোমসমের উপস্থিতি ঘটে। এতে আক্রান্ত পুরুষের টেসটিস/অন্ডকোষ স্মল থেকে যায়, কম টেস্টোস্টেরন উৎপাদণ হয়, সন্তান উৎপাদণের ক্ষমতা হারায়/কম থাকে, বুকে ব্রেস্টের উৎপওি ঘটে...।

হাইপোপিটুইটারিজম সমস্যায় পিটুইটারি গ্লান্ডের আটটি হরমোনের মাঝে এক/একাধিক হরমোনাল সমস্যা ঘটতে পারে (কম থাকে)। পিটুইটারি গ্লান্ডের প্রোলাকটিমা বলে একটি টিউমার হয় যেটা হলে শরীরে প্রোল্যাকটিনের বৃদ্ধি ঘটে যা দুগ্ধ উৎপাদনে সহায়ক। ফলে ছেলে হলেও ব্রেস্টের বৃদ্ধি ঘটে এতে যেন ...। শুধু ব্রেস্ট বৃদ্ধিই নয় এতে লিঙ্গের উথ্থান সমস্যা, সেক্সে অনিচ্ছা, অপারগতা, সন্তান উৎপাদনে অক্ষমতা সব সমস্যারই আগমণ ঘটে।

আরও আছে নানাবিধ কারণ যেমন থাইরয়েডের অতিরিক্ত থাইরক্সিন হরমোনের প্রোডাকশন, কিডনির ডায়ালিসিস, লিভারের সমস্যা এবং এসবের চিকিৎসায় ব্যবহৃত মেডিসিনের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ায় ব্রেস্ট বৃদ্ধি ঘটে। এমন কী অপুষ্টিতেও টেস্টোস্টরনের ঘাটতি, গাজা, হেরোইন ইত্যাদি সেবন স্তন বৃদ্ধির সহায়ক। তাই চিকিৎসার আগে কারণটি সনাক্ত করা বেশী জরুরি।

অনেকাংশেই হরমোনাল থেরাপি দেয়া হয় এই জাতীয় সমস্যার চিকিৎসায়। আর বর্ধিত ব্রেস্টের চিকিৎসা মূলত সার্জারি। তখন নিপলটি রেখে তার নীচের ব্রেস্ট গ্লান্ডটিকে কেঁটে ফেলে দেয়া হয়। আর যাদের বুকে অতিরিক্ত ফ্যাট থাকে তাদের লাইপোসাকশনের মাধ্যমে বুক থেকে ফ্যাটও হটিয়ে দেবার ব্যবস্হা নেয়া হয় পাশাপাশি। সার্জারীটি ব্যয় বহুল হলেও অত্যাধুনিক পদ্ধতির ব্যবহার মনের তুষ্টি ঘটাতে সক্ষম।

মাঝে মাঝেই কাজের ফাঁকে লাঞ্চে দেখি জনাব আসিফ মহিউদ্দিন লাইভে এসেছেন। উৎসাহী হই দেখতে দেশীয় যুবকদের চিন্তা-চেতনা কতটুকু পরিণত হলো আজকাল? 
তারা কিভাবে ভাবে? তাদের লজিক কেমন?

তাকে সচরাচর একটি প্রশ্নই করা হয়, আপনি কী নিজের বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন যে কখনও কোনো মেয়েকে দেখে আপনার যৌন অনুভূতি জাগে নি মনে? তাহলে এবার বলেন কেমন নাস্তিক হলেন আপনি?

তিনি আমতা আমতা করেন, বলেন কখনও কখনও, তবে দু-একবার মাত্র! প্রশ্ন কর্তা বলেন, এইতো বললাম না মেয়েদের পর্দা, তাদের পর্দা করা জরুরী!

অথচ মানুষের যৌনাঙ্গ থাকলে, ফাংশনাল হলে পরিণত বয়সে যৌন অনুভূতির উদয় হবে এটাই কী স্বাভাবিকতা নয়?

মাইক নামের সাতাশ বছরের এক যুবকের দাঁড়িমোচ গজায় নি, মেয়েদের দেখলেও তার কোনো যৌনাভূতি জাগে না শরীরে, দিন দিন লম্বা হতে হতে উচ্চতা হয়ে গিয়েছে ছয় ফিট চার অথচ যৌনাঙ্গের আকার এখনও একেবারে বাচ্চা ছেলের মতো। শরীরে দাঁড়িমোচ নেই, চেহারায়ও বেবী বেবী ভাব। ঘটনা কী বুঝতে বুঝতেই তার সময় চলে গিয়েছে এতদিন। অতঃপর আবিস্কৃত হলো তার পিটুইটারি গ্লান্ডের টিউমার জনিত কারণে ওটা সিগনালই পাচ্ছিলো না যে টেস্টোস্টরন উৎপাদন করা দরকার। আমেরিকার মতো জায়গাতেই মানুষ যদি এ জাতীয় সমস্যায় এভাবে ভোগে তাহলে আমাদের দেশের এই সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তির দশা কী হতে পারে?

আমরা অহরহ গর্ব করি আমাদের দেশীয় বাবামায়ের ভালোবাসার কাহিনী বলি যদিও এখন পর্যন্ত এমন ঘটনা খুব কমই চোখে পড়েছে যেখানে দেখেছি দেশীয় বাবামা তাদের সন্তানদের এ জাতীয় বিষয়ে তেমন নজর রেখেছেন। বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বেশীর ভাগই এমন আচরণ করেন যেনো হাগুমুত ছাড়া যৌনাঙ্গের আর কোনো কর্ম নেই। মানুষের যৌন অনুভূতি মহা পাপের বিষয়, আর বাচ্চা পরে আকাশ থেকে টপ করে যদিও ঘটনা তাদের সবই জানা...।

যৌনাঙ্গের সুরই যৌন অনুভূতি, মানুষের মৌলিক অধিকার। সেই সুর না থাকলে জীবন হয় চিরতার জল।


  • ৪৪৯ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

শিল্পী জলি

সমাজকর্মী, ইউএস প্রবাসী

ফেসবুকে আমরা