যশোর রোডের গাছ কাটা হলে আমি মানুষের কাছে বিচার দিবো

শনিবার, জানুয়ারী ১৩, ২০১৮ ৩:৩৪ PM | বিভাগ : প্রতিক্রিয়া


কোথাও গাছ কাটা হচ্ছে শুনলেই বিষন্ন হয়ে পড়ি। আমার সাথে প্রথম বন্ধুত্ব যার, সে একটি নারকেল গাছ। রক্তবান নারকেল। আমাদের ঘরের পেছনেই যার জন্ম। বিশালাকার একেকটি ডাব কাটলে পুরো এক জগ মিষ্টি পানি। গাছটি গ্রীষ্ম বর্ষা ফল দিয়ে যাচ্ছেই কোনো পাওনা না নিয়ে। খুব গল্প করতাম এক সময় আমরা দু’জন। 

আমার মনে হতো আরেকটি নারকেল গাছ আমার কথা বুঝতে পারতো। পরপর পাঁচটি গাছের মধ্যে একটি গাছ ছিলো অন্যরকম। লাজুক, চপল, কাইন্ড। যে সব দিন মায়ের বেঁধে দেয়া সময়ের বাইরেও বাইরে থাকতাম, ভয়ে ঘরে না গিয়ে বাবার গদিতে উঠে চুপচাপ বসে থাকতাম আমরা ভাইবোন। কর্মচারীরা এটা সেটা এনে দিতো খাবার জন্য। বাবার নিজ হাতে বাজার করার অভ্যাস, তেমন দিনে আমাদের হাতে দুটি কমলা কি আপেল অথবা তালের শাঁস দিয়ে মসজিদের বাইরে দাঁড় করিয়ে আসরের নামাজ পড়তেন, বেরিয়েই বাজার।

সেদিন কোনো কারণে ভাই ছিলেন না, আমি কমলা হাতে রেখেই গাছের সাথে গল্প করছি। হঠাৎ দেখি গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে পাশের মাদ্রাসার বড় হুজুর ডাকছেন আমাকে। সবাই বড় হুজুর ডাকে, আমরা মাদ্রাসায় পড়িও না, কিছু ডাকিও না। তবু সিঁড়ি বেয়ে উপরে গেলাম। উনি রুমে বসেই ডাকছিলেন। বললেন ‘কমলা খাবে?’
-জী না, আমার কাছে আছে
-তবু খাও

(মনে মনে বললাম তুমি খাও, আমরা কমলা দিয়ে গুল্লাগুল্লি খেলি ভাই বোনেরা)
তখন দেখি হুজুর দরজায় দাঁড়িয়ে চোরের মতো এদিক সেদিক তাকাচ্ছেন। আমার প্রান লাফ দিয়ে গলার কাছে উঠে আসে। তখন মাদ্রাসায় নতুন ভবন হচ্ছে, ১২টি মাথা দরকার, না হলে মাল (দানব) বিল্ডিং তুলতে দেবে না। তার মানে হুজুর আমার মাথা কেটে নেবে বলেই নামাজে না গিয়ে ঘরের ভেতর লুকিয়ে আছে! বুলেটের গতিতে হুজুরের হাত ফসকে দরজা দিয়ে বেরিয়ে এক দৌঁড়ে বন্ধুদের আসরে। তারাও বললো আমার আব্বা খুব সৎ ব্যক্তি বলেই সয়ং আল্লাহ আমার মাথা রক্ষা করলো। 
তারপর কতো বছর সেই গাছের কাছে যাই না...

দীর্ঘদিন যে গাছের সাথে আত্মা বাঁধা ছিলো আমার, একে অন্যের কথা হুবহু বুঝতে পারতাম, আমাদের দু’জনেরই মনে হতো আমাদের আর কোনো বন্ধুর দরকার নেই, একদিন শুনি আমাকে না জানিয়েই বাবা গাছটি কেটে ফেলছেন। 

একদিন দুপুর বেলা ঘুমিয়েছি, দেখি গাছটি তার বিশালাকার ঝাকড়া মাথা নিয়ে উপুড় হয়ে পড়ছে আমার ঘুমন্ত মুখে, আমি শ্বাস নিতে পারছি না বলে তার ঝাকড়া মাথা সরাতে চাইছি, তখুনি দেখলাম তার করুণ বিষন্ন কান্নাভেজা মুখ। কাঁদতে কাঁদতে ঘুম ভেঙ্গে গেলো। তখুনি ফোন দিলাম ইরমকে। সে কাস্টমার সামলাতে সামলাতে হেসে উড়িয়ে দিলো বিষয়টা, তখন সাথে সাথে ফোন দিলাম দেশে। প্রথমেই জিজ্ঞেস করলাম গাছের কথা। বোন ভয়ে ভয়ে বললো এতো বেশি বড় হয়েছে গাছটি যে, ঘর নিয়ে পড়ে যাবে যে কোনোদিন, তাই বাবা কাটিয়ে নিয়েছেন। 

হায়রে, আমারই লাগানো গাছ! বাবাকে বললাম পরেরবার অন্য কোনো গাছে হাত দিলে র‌্যাব এর কাছে মামলা দিবো। জবাফুলের ঝাড় কাটার পরও বাবাকে সমান হুমকি দিয়েছিলাম।

যশোর রোডের গাছ কাটা হলে আমি মানুষের কাছে বিচার দিবো...


  • ৪৪২ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

শিপা সুলতানা

শিপা সুলতানা একজন কথাশিল্পী

ফেসবুকে আমরা