বিক্রম কামরুল

সখে লেখালেখি করেন। নিজেকে নারীবাদী মনে করেন।

জোকারেরা

(উৎসর্গ-মঞ্জুর জন্মদিনে প্রিয় বন্ধু কবি মঞ্জুর মোর্শেদকে)

দীর্ঘ দিন ধরে ঘরে বসে আছি, ভালো লাগছে না কিছুই, বের হতে মন চাইছে, তাছাড়া ঘরের প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস পত্র কিনে আনা দরকার। কিন্তু বের হতে পারছি না; ঘরে বসে বসে আমার পেট, মেধ জমে উচু টিলার মতো হয়ে যাচ্ছে। আমার দু-কামরার বাসাটাই হয়ে যাচ্ছে আমার দেশ। বাসার দরজা জানালা বন্ধ থাকছে সারাক্ষণ। তার পরও কি করে যেন দূর্গন্ধ ঢুকে যাচ্ছে আমার বাসাটায়।

গৌরী বলে, বাসার সমস্ত ফাঁকফোকর যেন কাগজ দিয়ে বন্ধ করে দেই। বন্ধ করার পরও কি করে যেন গন্ধ ঘরে ঢুকে যাচ্ছে, তবে অসহনীয় নয়, একটু কষ্ট হয় বৈকি। চ্যানেল গুলো প্রচার করতে থাকে ছত্র লীঙ্গের হাগু ত্যাগের দৃশ্য, জোকার লীঙ্গের মূত্র প্রতিযোগিতার দৃশ্য, জৈব লীঙ্গের নাক ঝাড়ার দৃশ্য। তারা সবাই মিলে রেল ষ্টেশন, বাস ষ্টেশন, লঞ্চঘাট, বিমান বন্দর, ক্যাফেটেরিয়া, বিশ্ববিদ্যালয়, বিদ্যালয়, শিশু পার্ক, জাদুঘর, সংসদ ভবন, ব্রিজ-কালব্রাট, উড়ালপথ, মন্দির -মসজিদ, নদ-নদী, সুন্দর বন, ধান ক্ষেত, পাট ক্ষেত, আগড়া ক্ষেত, ব্যাংক-বিমা, হিজল বন, আড়িয়াল বিল, গৌরীদের নীম গাছ মল মূত্র আবর্জনায় তলিয়ে দেয়। এসব দেখার পর বাসা থেকে বের হওয়ার ইচ্ছেটা কিছুটা দমিত হয় কিন্তু পুরোপুরি উবে যায় না।

কোথাও গেলে গৌরী আমার সাথে থাকে, ও আমার বাহু ধরে রাখে আমি ওর কাধ ধরে রাখি। গৌরীর বাড়ির বাহিরে যাওয়াটা এসময় নিরাপদ নয়, কিছু দিনের মধ্যে ও মা হবে। গৌরী জানায়, আমি যেন গামছাটা দিয়ে নাক মুখ পেঁচিয়ে বের হই।

হ্যাঁ বুদ্ধিটা খারাপ নয়। তবে ব্যাপারটা লীঙ্গ গোত্র কিভাবে নিবে এটা ভাবার বিষয়। দীর্ঘ দিন অভুক্ত থাকার পর কিছু দিন হয় তারা শকুনদের তাড়িয়ে দেশটার দখল পেয়েছে। তাদের আবার জৈব, জোকার, ছত্র বিভিন্ন নামে কিছু উপলীঙ্গ রয়েছে। তারা সংভোধাং এর বাইরে কোনো কাজ করে, না করতে দেয়ও না।

গৌরীর পরামর্শে আমি তিন হাত লম্ব একটি গামছা আমার নাকে মুখে পেঁচিয়ে, গৌরীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ঘর থেকে বের হই।বাড়ির মুলফটক পেরিয়ে তিন কদম এগুতেই এক IPS জোকার লীঙ্গের কবলে ধরা পড়ি। আমি ৭১ এর পাকিস্তানী মিলিটারি আর দেশী রাজাকারের গল্প শুনেছি পড়েছি; আমার কাছে এই জোকারদের, তাদের থেকে বেশী ভয়ংকর মনে হতে থাকে।

তারা আমাকে একটার পর একটা প্রশ্ন করে যায়, আমার নাম কি, কি করি, নাকে মুখে গামছা বাধা কেনো, আমি কোন্ গোত্রের; লীঙ্গের, শেয়ালের, জোঁকের, শকুনের, মূষিকের, শূকরের, নাকি একেবারেই নতুন তৈরি হওয়া কোনো গোত্রের? আমি তাদের নিরাশ করে বলি আমি কোনো গোত্রেরই নই, কিছু দিন হয় আমি একটি প্রত্যন্ত বিলাঞ্চল থেকে এসেছি।

এবার তারা জানতে চায় আমি কেনো নাকে মুখে গামছা বেধে রাখছি? আমি বলি আমার গামছা বাঁধার কথা, আমি একটি দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত, চিকিৎসক বলেছে গামছা পেচিয়ে ঘর থেকে বের হতে। এবার তারা আমাকে চিনে রাখার জন্য কিছু সময়ের জন্য গামছাটা সরিয়ে আমার মুখ দেখতে চায়। আমি তাদের অনুরোধ করি এ কাজটি না করার জন্য, কিন্তু আমার অনুরোধ তাদের কর্ণগোচর হয় না। আমি বুঝিয়ে বলি আমার ব্যাধির যন্ত্রণার কথা, তারা বুঝে কিন্তু রেগে উঠে দু’জন জোকার আমার দু’হাত পিছনে পেচিয়ে ধরে রেখে আরেক জন জোকার আমার মুখের গামছাটা খুলে নর্দমায় ছুড়ে ফেলে দেয়। একরাশ দূর্গন্ধ আমার নাক মুখ দিয়ে ঢোকে আমার পাকস্থলীটা হিলিয়াম গ্যাসে ভরা বেলুনের মতো ফোলিয়ে-ফাপিয়ে দেয়। সকালে যা কিছু খেয়ে ছিলাম সব গলা উগরে বের হয়ে আসে। আমার এই দূরাবস্থা দেখে জোকারা কিছুটা শান্ত হয়।

এবার দুরে দাড়িয়ে থাকা একটি IPS জোকার আমার কাছে এসে জানতে চায়, আমি কি করি। আমি তাদের জানাই, আমি গল্প-কবিতা লিখি, ঐ করেই আমার চলে। আমার কথা শোনে সকলে সমস্বরে হেসে উঠে। একজন বলে, আমিতো আগেই বলেছিলাম এমাল পাগল না হয়ে যায় কোথায়, আরেকজন বলে, তাইতো শালার ন্যাকা ন্যাকা কথার ধরন, আরেক জন বলে শালা যখন বলে ছিলো গোত্রহীন তখনই আমার সন্দেহ হয়েছিলো শালার মাথায় স্ক্রু নেই, আরেক জন বলে দেখ শালার মাথার চুলগুলো কাকের বাসার মতো, আমাদের সংভোধাং এ তো এরকম চুলছাঁটার উল্লেখ নেই।

একজন তড়িৎকর্মা জোকার দৌড়ে গিয়ে পাশের মোড় থেকে একজন নাপিত ধরে নিয়ে আসে। আমি বুঝে যাই ওরা কি করতে যাচ্ছে, আমি ওদের বাধা দেই না। নাপিতটার কাছে আমি আজস্ম ঋণী হয়ে যাই। সে পদ্মা পাড়ের ছোট্ট কামাড়গাও বাজারের যোগেন্দ্র, যাকে সবাই যগা নাপিত বলে ডাকতো, তার মতোই আমার ঘাড় মাথা কান আলতো করে ধরে আমার চুল গুলো ছেটে দেয়। ভেবেছি চুল ছাটা শেষ হলে ওদের হাত থেকে মুক্তি মিলবে; না মুক্তি মেলে না, মনে হচ্ছে আমি অতলে তলিয়ে যাচ্ছি। চতুর্থ জোকারটি আমাকে প্রশ্ন করে বসে, আমি যে যায়গা থেকে সম্প্রতি এসেছি সেটা কোথায়? সেখানকার জোকার প্রধানের কাছ থেকে তাদের এক্ষনি খবর নিতে হবে আমি তাদের জন্য নিরাপদ কতটুকু। আমি বুঝে উঠতে পারি না আমার কি করা উচিৎ, কি বলা উচিৎ এসময়। গৌরী অসুস্থ। এসময় যেকোনো ধকল গৌরীর জন্য হবে বিপদজনক।

আমরা ছিলাম এশহরের দক্ষিণের তিনটি নদীর আরো দক্ষিণে একটি বিলাঞ্চলে, ছোট্র গ্রাম মত্তগ্রামে। আমাদের পূর্বপুরুষেরা যুগযুগান্তর ধরে এখানে বাস করে আসছে। এখানে গৌরী আর আমি প্রেম ভালোবাসায় মত্ত হয়ে গৌরাঙ্গডেঙ্গার পূর্ব পাড়ে ছোট একটি কুঁড়েঘরে বাস করে আসছিলাম। এই গৌরাঙ্গডেঙ্গা লোকালয় থেকে কিছুটা দূরে। গৌরী আর আমার এক সাথে থাকার সিদ্ধান্তটা আমাদের গ্রামের কেউ মেনে নিতে পারে নি। তাদের কাছে মানব মানবীর প্রেম ঘোরতর পাপ। আমাদের কাছে প্রেমই বেঁচে থাকার জন্য ধ্রুব মনে হয়, আমাদের প্রেমের কাছে তাদের নিয়মগুলো হাস্যকর মনে হয়। কিছুটা দূরে অকার্যকর একটি দীঘির পাড়ে আমরা থাকছি।

এখানে আমরা মোটেই খারাপ ছিলাম না, যদিও রাত নয়, দিনের বেলাই শেয়াল আঙ্গিনায় হেঁটে বেড়াতো। আমাদের কুঁড়েঘরের পিছনে ছিলো একটি দইল্যা গোটার গাছ, গাছে সবসময়ই ঝুলে থাকতো একটি মৌচাক। পৌষে চাকটি ফুলে উঠতো, তার উত্তরের হলুদ সরিষা ক্ষেতের ফুলের মধু দিয়ে। দুষ্ট ছেলের দল কখনও সখনও চুরি করে মধু নিয়ে যেতো। আমি ওদের কিছুটা প্রশ্রয়ই দিতাম, কেননা আমিও কত খেয়েছি ঐ মধু চুরি করে।

হঠাৎ করে একদিন একদল উদ্ভট গাওন পড়া ওলমা জোকার আমাদের উঠানে এসে হাজির। গৌরী ঘরে ছিলো, আমি দক্ষিণ বিলে গিয়ে ছিলাম রাতের খাবারের খোঁজে। তারা গৌরীর কাছে জানতে চায়, আমি কোথায়? গৌরী তাদের অপেক্ষা করতে বলে, কিন্তু তারা তাদের মুল্যবান সময় আমাদের মতো নষ্ট প্রজাতির জন্য নষ্ট করতে রাজি নয়।তারা গৌরীকে হেচকাটানে মাটিতে ফেলে দিয়ে ঘরের ক্ষুদ্র আসবাবপত্র গুলো চূড়মার করে দেয়। এবং বড় রকমের একটি তলোয়ার উঁচিয়ে ধরে শাসিয়ে যায় আগামীকাল জুম্মাবাদ আমাদের বিচার হবে, সেখানে আমাদের দু’জনকে অবশ্যই থাকতে হবে, সন্তোষ জনক জবাব না পেলে শিরচ্ছেদ করা হবে। বাড়ি ফিরে আমি আমার দু’চোখে কেবল সর্ষে ফুল দেখতে পাই অন্য কোনো উপায় দেখতে না পেয়ে। গৌরী অন্তঃসত্ত্বা!

এরকম ঘোর সংকটকালে ছেলে বেলার ডানপিটে, ষন্ডা গোছের, ডুব সাঁতারে যেতে পারে একশো হাত, হাতের তালুতে নাচাতে পারে কালো গোখরা, বন্ধু মঞ্জুর গল্প উপন্যাসের অবতারের মতো আমাদের পথ দেখায়। কিছুকাল আগে সে-ই আমাদের পাশে ছিলো যখন গোটা গ্রাম আমাদের বিপক্ষে ছিলো, গৌরী আর আমার একসাথে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়ে। মঞ্জু রাতের আঁধারে একটি নৌকায় আমাদের তুলে দেয় এবং শহরের এই বাড়িটায় নির্বিঘ্নে থাকার ব্যবস্থা করে দেয়।

আমি জোকারগুলোকে কি করে বলি আমাদের গ্রাম থেকে পালিয়ে আসার কথা, আজ বাদে কাল গৌরী মা হবে যে। আমি প্রভুভক্ত কুকুরের মতো জোকারগুলোর পায়ের কাছে মাথা নিয়ে জানাই যে, আমার কিছুই মনে পড়ছে না, আমাকে ক্ষমা করে দিতে বলি। তারা জানায় তাদের সংভোধং এ ক্ষমাবলে কোনো কিছু নেই। তারা আমার একটি কান প্লায়ার্স দিয়ে ছিড়ে নেয়। তাদের সন্দেহ আরো ঘনীভূত হয়; তারা জানতে চায় আমি আমার সাবেক আবাস্থল থেকে কী করে এসেছি। তারা মরিয়া হয়ে উঠে আমার ঠিকুজী জানার জন্য। আমি তাদের সকলের পায়ের কাছে মাথা ঠুকে বলতে থাকি, আমার দূরারোগ্য ব্যাধির পর সব কিছুই আমি ভুলে গেছি।

এবার IPS জোকারটি প্লায়ার্স দিয়ে আমার হাতের একটি আঙ্গুল কেটে নেয়। আমার চিৎকারে জোকারলীঙ্গের কানে তব্দ লেগে যায়, তারা কিছুটা বিরক্তিতে কিছুটা ক্লান্তিতে আমাকে আরোও কিছুক্ষণ খিস্তি খেউড় করার পর ছেড়ে চলে যায়।

আমি এক বোঝা যন্ত্রণা, অপমান, পরাজয় নিয়ে গৌরীর কাছে খুড়াতে খুড়াতে ফিরে আসি।

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।