কেবল সম্পত্তি আইন বদলাইলেই ইসলামের অবমাননা হয়?

শনিবার, অক্টোবর ১৪, ২০১৭ ৪:৪৮ PM | বিভাগ : প্রতিক্রিয়া


দেশের চলমান আইন অনুযায়ী, মৃত ব্যক্তির কোনো পুত্র সন্তান না থাকলে, তার কন্যারা মোট সম্পত্তির তিন ভাগের দুই ভাগ পায়। কতো আইন চেঞ্জ হচ্ছে, এটা হচ্ছে না। কারণ এটা হলে ইসলামের অবমাননা হয়। এটা কেমন কথা, অন্য আইন বদলাইলে ইসলামের অবমাননা হয় না, কেবল সম্পত্তি আইনের বেলায়ই হয়! এটার কারণ কি আপনারা কেউ জানেন? উত্তর আশাব্যঞ্জক ছিলো না। যারা নিয়মিত কমেন্ট করেন, তারা নিরব ছিলেন। দুই একজন যা কমেন্ট করলেন তা হতাশাব্যঞ্জক। তারা বললেন, মেয়ের জামাই লুটপুটে খাবে, এটা তারা মেনে নিতে পারবেন না।

কন্যাদিবস গেলো, কতো বাবা-মেয়ের ছবিতে নিউজফিড সয়লাব হয়ে যেতে দেখলাম। আহা কি ভালোবাসা! কন্যাদের জন্য ভালোবাসা জানিয়ে শুধু মাত্র কন্যা সন্তানের বাবাদের অনুরোধ করলাম -আপনারা সম্পত্তি আইন সংশোধনের ব্যাপারে সোচ্চার হউন। তাদেরকে তাদের অধিকার বুঝে নিতে দিন। কেউ কোনো রিপ্লাই দিলো না। তারা ভালোবাসা দিবে, কিন্ত কন্যাদেরকে সম্পত্তি দিবে না। একজন বাবা বরং প্রতিবাদ করে উঠলেন, মেয়েদের সম্পত্তির অধিকার চেয়ে আমি অমানবিকতার পরিচয় দিয়েছি, লোভীর পরিচয় দিয়েছি। তিনি চান না, তার কন্যারা তার সম্পত্তি পাক, বরং মানুষ করে রেখে যাবেন। খুবই ভাল কথা! মানুষ করতে নিষেধ করেছে কে? তাছাড়া প্রকৃতি তাকে সেই সুযোগ দেবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা আছে?

 আমার এক বান্ধবী অল্প বয়সে বিধবা হয়েছে, সাথে দুই কন্যা সন্তান। ওর হাজবেন্ডের সম্পত্তি থেকে যা পাওয়ার কথা তাও পায়নি, মেয়েরা স্কুল পড়ুয়া বলে, মেয়ে দুইটাকে নিয়ে ভাইদের গলগ্রহ হয়ে বেঁচে আছে। নিয়ম অনুযায়ী ও ওর বাবার সম্পত্তি থেকে যা পাবে তা বুঝিয়ে দিলেও ওর ভালো মতো চলে যেতো। কিন্তু তারা তাও দেবে না। ওরা তো ভাই, বাবাই যেখানে চায় না তার সম্পত্তি মেয়েরা পাক, সেখানে ভাইয়েরা কি চাইবে! কারণ তারা নিরুপায়। কারণ প্রচলিত আইন অনুযায়ী অসিয়ত করতে চাইলে ভাইদের সমর্থন ও সিগনেচার লাগবে। যা পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। নইলে অসিয়ত টিকবে না, ভাইয়েরা মামলা করে সম্পত্তি উদ্ধার করতে পারবে।

 আর একটা পথ খোলা আছে হেবা বা দান করে যেতে পারবেন। কিন্তু কয়জন বাবা জীবিত অবস্থায় নিঃস্ব হতে চান। কারণ ভবিষৎ তো আসলে আমরা জানি না। এটা তো আমরা সবাই জানি, নিজের কোনো পজিশন না থাকলে সন্তান তো দূরে আত্মীয় পরিজন, বা প্রকৃতি, কেউই ফিরে চায় না। আমি নিজেও শুধু কন্যা সন্তানের মা। অনেকবার স্বামীর সাথে এই ব্যাপারে কথা বলেছি। ও যে ভাইদের ব্যাপারে খুব দরদী, তা কিন্তু নয়। কিন্তু জীবিত অবস্থায় নিঃস্ব ও হতে চায় না। শুধু মাত্র কন্যা সন্তানের বাবাদের সংখ্যা কিন্তু কম নয়। সবাই যদি আইন সংশোধনের জন্য পথে নামেন, তাহলে হয়তো আইনবিদদের টনক নড়বে।

 ইসলামের দোহাই দিয়ে যদি আইনটাকে বদল না ই করবেন, মদিনা সনদেই দেশ চলুক না কেনো! কেনো বৃটিশদের করা অনেক আইন এখনো রয়ে গেছে? কেনো প্রতিনিয়তই কতো আইন বদল হচ্ছে! আমার বাবা চাচারা তাদের বোনদেরকে ন্যায্য পাওনা না দিয়েই, ইচ্ছেমত সব বিক্রি করে শেষ করেছে, ফুপুদের অবস্থা যে খুব ভালো তা কিন্তু নয়, বরং বেশ শোচনীয় ছিলো দুই ফুপুর অবস্থা। তবু তারা প্রতিবাদ করেনি, সমাজের ভয়ে, ভাইদেরকে দয়া করে।

আমাদের এলাকায় একটা কথা প্রচলিত আছে -বাপের বাড়ির সম্পত্তি নিলে তার ভিটেতে ঘুঘু চড়ে, অর্থাৎ তার সংসারে বড় ধরনের বিপর্যয় আসে, ভিটায় ঘরও থাকে না। এই ধরনের কথা কেনো প্রচলিত তা সহজেই অনুমেয়। ইসলাম যতটুকুন দিয়েছে, তাও যেন তারা না নেয়! কিন্তু এভাবে আর কতো? আমাদের প্রতিবাদী হতেই হবে। আর একটা অবাক ব্যাপার, একজন মা, তার বাবার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হয়েও আইনের সংশোধন চায় না, যদি তার ছেলে সন্তান থাকে! সে নিজে বঞ্চিত হয়েছে, আর কন্যাকে বঞ্চিত করতেও বাঁধছে না!

এসো মা বোনেরা আমরা আমাদের অধিকারের জন্য সোচ্চার হই। একসাথে গলা মেলাই। আর একটা কথা কন্যা সন্তান একজন হলে কিন্তু সম্পত্তির অর্ধেক চলে যাবে আপনার ভাইদের হাতে, জানেন তো? আজকাল তো অনেকেরই একজন মাত্র কন্যা সন্তান। সময় থাকতে সচেতন হোন।

 


  • ৪৯৩৮ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

ঝর্ণা আক্তার

প্রকৃতি, মানুষের সরলতা আর ভালবাসেন মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলতে। মানুষের, যেখানে নারী পুরুষের ভেদাভেদ থাকবে না, থাকবে না কোন বৈষম্য, এমন দিনের স্বপ্ন দেখেন প্রতিনিয়ত।

ফেসবুকে আমরা