নারীকে দুর্গা হতে হবে কেনো?

শুক্রবার, অক্টোবর ৪, ২০১৯ ১১:৩২ PM | বিভাগ : সমাজ/গবেষণা


আমরা মেয়েরা নিজেকে দুর্গা দেবী ভাবতে খুব পছন্দ করি। প্রমান করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ি, মা দূর্গার চেয়ে কম কিছু নই আমরা। দুই হাতে দশ হাতের কাজ করি, কিংবা কখনো কখনো তার চেয়েও বেশি। শ্বশুর শাশুড়ির মন জুগিয়ে চলা, তাদের সেবা যত্ন করা, দেবর ননদের মন জুগিয়ে চলা, তাদের সব ভাল-- মন্দের খেয়াল রাখা, স্বামীর সব চাওয়া পূরণ করা, সংসারের সমস্ত খুঁটিনাটি কাজ করা, বাচ্চাকাচ্চা পেটে ধরা, জন্ম দেয়া এবং তারপর সেই নাড়ী ছেড়া ধনকে আগলে রেখে বড় করা। এর বাইরে আছে আত্মীয় স্বজন, তাদের খোঁজখবর রাখাও একান্ত দায়িত্বের মধ্যে পড়ে যায়।

খুব উদ্যম নিয়ে শুরু হয় পথ চলা, কতো দায়িত্ব আমাদের! নিজের দিকে তাকানোর সময় কোথায়! সবার কাছে ভালো বউ হিসেবে প্রমান করতে হবে, ভালো মা হিসেবে প্রমান করতে হবে, ভালো স্ত্রী হিসেবে প্রমান করতে হবে। এই যে দশ হাতের দুর্গা হওয়ার চেষ্টা, এটা কোথা থেকে এসেছে? সমাজ আমাদের মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছে। সবক্ষেত্রে নিজেকে প্রমান করতে যেয়ে আমরা ভুলে যাই নিজেকে। কী খেতে ভালোবাসি, কী করতে ভালোবাসি তা আর মনেই থাকেনা। আর ওইদিকে যাদের জন্য এতো করছেন, তারা কিন্তু মোটেও সন্তুষ্ট না আপনার উপর। সব একা সামলাতে যেয়ে, নিজের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার দিকে নজর না দেবার কারণে, আপনার প্রায়ই ভুল হবে। হাঁপিয়ে উঠবেন একসময়, শরীর ভেঙে পড়বে। আশেপাশের মানুষজন একসময় করুণার চোখে তাকাবে, তারপর আর তাকাবেও না। মুখ ফিরিয়ে নেবে। আপনার ঔষধের বক্স ভারি হতে থাকবে, অপরাধবোধে নুইয়ে পড়বে একসময়ের ভীষণ চঞ্চল চোখদুটো।

 কী করেছেন এতোদিন, কেনো করেছেন, ভাবুন। কেনো সর্বক্ষেত্রেই নিজেকে সেরা প্রমান করতে হবে? নিজের দেহের চেয়ে, অঙ্গ প্রত্যঙ্গ'র চেয়ে আপন কেউ নেই আসলে। সবার আগে, সব কিছুর আগে নিজের যত্ন নিন। নিজের ভালো লাগাকে প্রাধান্য দিন। আপনি যখন এই পরিবারের সদস্য ছিলেন না, তখনও তো সব ঠিকঠাক চলেছে। এখনও চলবে, শুধু খেয়াল রাখুন আপনার দায়িত্ববোধ যেনো এমন পর্যায়ে না পৌঁছে, যাতে অন্যরা সবাই আপনার উপরই নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। সংসার একটি যৌথ খামার। সেখানে সবার সুষম অংশগ্রহণ থাকতে হবে। নইলে বিপর্যয় নিশ্চিত। হয়তো তা আপনার শরীরের বা মনের উপর দিয়ে যাবে। খেয়াল করে দেখেছেন, সংসারের সব সিদ্ধান্ত কে নিচ্ছেন। যিনি টাকা উপার্জন করেন, তিনি তো? তাহলে আপনি কোথায়? ভাবুন, ভাবুন, সময় থাকতেই ভাবুন। সবার মন জয় করার ব্যর্থ চেষ্টা বাদ দিয়ে নিজের মেধা, যোগ্যতা অর্থ উপার্জনের কাজে লাগান।

হ্যাঁ, খুব সাহস আর মনোবল দরকার হবে। প্রথমে পরিবারের সমর্থন ও হয়তো পাওয়া যাবে না। কিন্তু সাহস করে শুরু না করলে যে এগুনো যাবে না , কেউ তো হাত ধরে নিয়ে যাবে না। হাতে টাকা আসতে থাকলেই সবাই বদলে যেতে থাকবে, সবাই সমর্থন দিবে।

নিজেকে প্রমান যদি করতেই হয় কর্মক্ষেত্রে করুন, যেখানে উত্তারোত্তর আপনার উন্নতি হবার সম্ভাবনা আছে। সংসারের ঘানি তো টানতেই হবে, যেহেতু এটা নিজেরও থাকার জায়গা। সবাই মিলে টানুন, সবাই মিলে কাজ ভাগ করে নিন।

পরিবারের সবাই যদি নিজেদের কাজগুলা ঠিকঠাক করি, তাহলে দশ হাতের দূর্গার দরকার পড়েনা। আপনি দুর্গা হয়ে নিজেকে প্রমান করতে ব্যস্ত হবেন, আর ওইদিকে অন্য সবাই হয়ে উঠবে অগুছালো, অবিবেচক।


  • ১৯৪ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

ঝর্ণা আক্তার

প্রকৃতি, মানুষের সরলতা আর ভালবাসেন মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলতে। মানুষের, যেখানে নারী পুরুষের ভেদাভেদ থাকবে না, থাকবে না কোন বৈষম্য, এমন দিনের স্বপ্ন দেখেন প্রতিনিয়ত।

ফেসবুকে আমরা