যেভাবে লড়েছি-১

শুক্রবার, জানুয়ারী ২৬, ২০১৮ ১২:৩০ AM | বিভাগ : ওলো সই


কিছু মানুষ বোধ হয় যুদ্ধের কপাল নিয়েই জন্মায়। তাদের জীবনে ঘটে অনেক কিছুই, কিন্তু কিছুই সঠিক সময়ে স্বস্তির সাথে ঘটে না। আমি তেমনই একজন মানুষ যার জীবনের প্রতিটি দিনই এক একটা গল্প। অথবা হয়তো আমি একজন ড্রামাকুইন যে সবকিছুকেই একটা ড্রামা না বানিয়ে থাকতে পারে না।

দস্যি মেয়ে হিসেবে প্রাইমারি স্কুলে আমি প্রতি ক্লাসেই ফেল করতাম। আমার বাবা স্কুলের একজন পৃষ্ঠপোষক ছিলেন বলে প্রতিবারই আমাকে উপরের ক্লাসে তুলে দিয়ে শিক্ষকরা হুমকি দিতেন, আবার ফেল করলে তোমার আব্বাকে বলে দেবো। সেসময় রিপোর্ট কার্ডের বালাই ছিলোনা, স্কুলের মাঠে ছাত্রদের লাইন ধরে দাঁড় করিয়ে ক্রমিক নম্বর অনুযায়ী ফলাফল ঘোষণা করা হতো। বাসায় গিয়ে যখন পাশ ফেলের কথা বলতাম, কেউ তেমন একটা পাত্তা দিত না। বড় সুখের ছিলো দিনগু্লো।

এরকম করতে করতে ক্লাস ফাইভ থেকে সিক্সে উঠার সময় সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়ে আমি মেয়েদের মধ্যে প্রথম এবং সবার মধ্যে তৃতীয় হয়ে গেলাম। এই প্রথম আমার রেজাল্টের খবর বাড়িতে জানানো হলো। এরপর আর কখনো দ্বিতীয় হই নি জীবনে। ক্লাস এইটে সিলেট শহরের বড় স্কুলে পাঠানো হলো আমাকে, সেখানে ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম হয়ে আবার সবাইকে তাক লাগিয়ে দিলাম। গন্ডগ্রামের মেয়ে শহরের স্কুলে এসে এমন কান্ড করতে পারে?

ক্লাস নাইনে উঠার পর আমাকে জিজ্ঞেস না করেই শিক্ষকরা আমার নাম বিজ্ঞান বিভাগে তালিকাভুক্ত করলেন। আমার জন্য শিক্ষকদের আগ বাড়িয়ে এই সিদ্ধান্ত নেয়াকে আমি মেনে নিতে পারলাম না। তারা বললেন আমার বিজ্ঞান বিভাগেই পড়াশুনা করা উচিৎ কারণ ভালো ছাত্ররা তা-ই করে, তাছাড়া মানবিক বিভাগ থেকে ফার্স্ট ডিভিশন পাওয়া খুব কঠিন হবে। আমি বললাম আমি মানবিক বিভাগেই পড়বো এবং ফার্ষ্ট ডিভিশন পেয়ে দেখিয়ে দেব সবাইকে। ঊনত্রিশ বছর আগের কথা হচ্ছে, সে সময়ে কাজটা আসলেই সহজ ছিল না। অবশ্য নবম ও দশম শ্রেণিতে মানবিক বিভাগে ক্লাসে আমিই ছিলাম ফার্স্ট গার্ল।

আমাদের বাড়ি ছিলো স্কুল থেকে পাঁচ মাইল দূরে। প্রতিদিন এতো দূর থেকে রিক্সায় স্কুলে আসা যাওয়াতে অনেক সময় লাগতো। বড় বোনদের বিয়ে হয়ে গেছে, মা অসুস্থ, কাজেই সংসারের সব কাজকর্ম তখন আমাকেই দেখতে হতো। বৃদ্ধ মা বাবার দেখাশোনা, রান্না-বাড়া সেরে পড়ার সময় পেতাম খুব কম, কিন্তু অল্প পড়েই সব বুঝতে পারতাম, তাই খুব একটা সমস্যা হতো না।

যাই হোক, এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট দিয়ে আমি আবার সবাইকে নতুন করে তাক লাগিয়ে দিলাম। যা ভাবছেন তা নয়, এবার মহা সমারোহে ফেল করলাম আমি। মহা সমারোহে বলছি কারণ আমার টোটাল নম্বর ছিলো ফার্ষ্ট ডিভিশনের অনেক উপরে, লেটার মার্ক ছিলো দু’টো কিন্তু ফেল করলাম কারণ অংকে পেয়েছি মাত্র আটাশ। 

আব্বা ব্যাপারটা হেসে উড়িয়ে দিতে চাইলেন, ‘আমাদের বংশে আজ পর্যন্ত কেউ এসএসসি ফেল করে নি, আমার মেয়ে একটা অসম্ভবকে সম্ভব করেছে’।

আব্বা জানতেও পারলেন না তার এসব রসিকতা আমাকে কতটা আঘাত করলো। বাসায় মেহমান এলে আমি লুকিয়ে থাকতাম কারণ আমার রেজাল্ট নিয়ে একটা আলোচনা হবেই। কিছুক্ষণ পর দেখা যাবে আব্বা আমাকে ডেকে বলবেন, ‘তোমার মার্কশিটটা এনে দেখাও তো মা’ যেন লোকে বুঝতে পারে আমি আসলে ফেল করার মতো ছাত্রী নই। কিন্তু আমার মনের ভেতরে কী চলছে তা নিয়ে ভাবছিলো না কেউ। ভীষণ অভিমানে আমি কাউকে বলি নি অংক পরীক্ষার দিন আমার পেটে পিঠে প্রচন্ড ব্যথা ছিলো। মাসিক ঋতুস্রাব চলছিলো কিন্তু এসব নিয়ে কথা বলা লজ্জার বিষয় ছিলো বলে সাহায্য চাইতে পারি নি কারো কাছে। 
কি কষ্ট! কি অপমান! কি একাকীত্ব! কাউকে বুঝাতে পারি নি।

শুনেছিলাম কলাপাতা আকৃতির পাতাবাহার গাছের পাতা খুব বিষাক্ত হয়। লুকিয়ে সেই পাতার একগ্লাস রস বানিয়ে খেয়েছিলাম। মরিনি বুঝতেই পারছেন, কিন্তু বাজে ধরনের পেট খারাপ হয়েছিলো। আরেকবার কয়েকটা কামরাঙ্গা মরিচ চিবিয়ে খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছিলাম, এসব খবর কেউ জানতো না। এই ঘটনা থেকে একটা শিক্ষা পেয়েছিলাম আমি। ভীষণ কষ্টের সময় মানুষ খুব একা হয়ে যায়। শরীরের অসুখে সবাই ছুটে আসে, কিন্তু মনের ব্যাপারটা বুঝতে চায়না কেউ।

পরিবারের মধ্যে একমাত্র মানুষ যার সাথে আমি প্রাণ খুলে কথা বলতে পারতাম সেই চার বছরের বড় ভাই তখন চিটাগাং এ থাকতো ব্যবসা শিখতে। আমাকে বুঝবার মতো কেউ আশেপাশে ছিলো না। এমন সময় ভাইয়ের নামে একটা চিঠি এলো। প্রায়-খোলা খামের উপর হাতের লেখা দেখেই বুঝলাম তার একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধুর চিঠি। বন্ধুটি একসময় আমাদের সাথে একই স্কুলে পড়তেন, পরে বাবার বদলির কারণে অন্য জেলায় চলে যান।

খামের মুখ খোলা থাকায় খুলেই ফেললাম চিঠিটা। খোলার পর মনে হলো অন্যায় করি নি কারণ চিঠির বিষয়বস্তু ছিলো একটাই- 'রোজীর (আমার ডাক নাম) এসএসসি'র ফলাফল কী?' আমি অবাক হয়ে গেলাম। ভাইয়ের বন্ধু, যার সাথে আমার তেমন কোনো কথাবার্তা ছিলো না কখনোই, ভাইকে চিঠি লিখেছে শুধুমাত্র আমার পরীক্ষার ফলাফল জানতে? আবেগে মন ভিজে গেলো। আমিই ভাইয়ের পক্ষ থেকে উত্তর লিখতে বসলাম। উত্তরটা হলো কয়েক পৃষ্ঠা লম্বা। এ পর্যন্ত মনের যে কথাগুলো, এলোমেলো ভাবনাগুলো, কষ্টগুলো কাউকে বলতে পারি নি সব তাকে লিখলাম। আত্মহত্যা করবো ভাবছি, তাও লিখলাম।

এক সপ্তাহের মধ্যেই উত্তর এলো। এই প্রথম আমি কোনো পুরুষের কাছ থেকে একটা চিঠি পেলাম যা প্রেমপত্র নয়। মানুষটার জীবনবোধ ছিলো অসাধারণ, অন্যের কষ্ট বুঝবার ক্ষমতা সীমাহীন। তার চিঠি পড়ে আমার আত্মহত্যা করার ইচ্ছা উবে গেলো। আবার নতুন করে শুরু করার অনুপ্রেরণা পেলাম। একবার পরীক্ষায় ফেল করাই পৃথিবীর শেষ বা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়, তা বুঝতে পারলাম।

সেই সময়ে এক বিষয়ে ফেল করলেও সবগুলো বিষয়ে আবার পরীক্ষা দিতে হতো। এবার ঘরে বসে একা একাই পরীক্ষার প্রস্তুতি নিলাম, অংকের উপর অনেক বেশি জোর দিয়ে। পরের বছর সবগুলো পরীক্ষাই ভাল হলো। এবার আমার উদ্বিগ্ন পরিবার কুমিল্লায় কর্মরত এক আত্মীয়ের মরফত আগে থেকেই ফলাফল জানার ব্যবস্থা করলেন। আগেরবারের মতই দুটো লেটার, মোট নম্বর প্রায় অপরিবর্তিত, পার্থক্য এটুকু যে এবার আমি পাশ করেছি।

তখনো বুঝি নি, সংগ্রামের যাত্রা মাত্র শুরু হলো। এরপর প্রতিটা ধাপ আমাকে যুদ্ধ করেই পার হতে হবে এবং প্রতিবারের যুদ্ধ হবে আগেরটার চেয়ে বেশি রক্তক্ষয়ী কিন্তু অনেক বেশি গৌরবময়।


  • ১৮৩৪ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

জেসমিন চৌধুরী

প্রবাসী, সমাজকর্মী

ফেসবুকে আমরা