জ্বীন দ্যা ক্যাটালিস্ট

বুধবার, মে ৩০, ২০১৮ ২:২৫ PM | বিভাগ : পাঁচমিশালী


আমাদের ছোটবেলায় গ্রাম থেকে গৃহকর্মী নিয়োগের একটা বেশ প্রচলন ছিলো। মুরুব্বীদের যুক্তি ছিলো, তারা খুব বিশ্বাসী হয়, চুরি-টুরি করে সহসা পালিয়ে যেতে পারবে না। শিশুদের কাছেও তারা কিন্তু সমান আকর্ষণীয়ই ছিলো। সিক্স মিলিয়ন ডলার ম্যান আর বায়োনিক ওম্যান ছাড়া যাদের পৃথিবী ছিলো, নন্টে-ফন্টে, ঠাকুরমার ঝুলি, সিন্দাবাদের বানিজ্য যাত্রা থেকে রুশ দেশের উপকথা'র মধ্যে সীমাবদ্ধ তাদের কাছে সে সব গৃহকর্মীরা ছিলো সাক্ষাত অনন্ত জলিল। বিস্ময়কর পিলে চমকানো সব গল্পে পরিপূর্ণ ছিলো তাদের উদর।

বাড়ির কাজ টাজ হয়ে যাওয়ার পর তাদের দায়িত্ব থাকতো, ছোটদের কে গল্প শোনানো। নানারকম গল্পের মধ্যে প্রধান আকর্ষণ ছিলো, "সতিকারের ভূতের গল্প"। কারণ তারা সেসব নিজের চোখে দেখেছে। কখনও ছোটরা সন্দেহ প্রকাশ করলে, আত্মবিশ্বাসী গলায় তাদের জানানো হতো, সেসব গল্পের যারা প্রধান চরিত্র আমরা তাদের না চিনলেও আমাদের বাবা-কাকা'রা তাদের চেনেন। একই গ্রামের, শুধু ঐ দূরের সে সব বাড়ি, যে গুলোতে আমরা কখনও যাই নি, সেখানেই বাস তাদের, হুহ। একদম সাক্ষ্য প্রমাণ সব হাজির। এরপর আমাদেরও সেসব বিশ্বাস না করে আর কোনো উপায় ছিলো না।

গল্পগুলো হতো খানিকটা এ ধরনের, গ্রামে একটা "দূষিত" তেতুল গাছ আছে, বহু দিনের পুরনো, অনেকবার সবাই কাটতে চেয়েছে গাছটাকে, জ্বীন'রা এত বাঁধা দেয় যে লোকজন আহত নিহত হয়ে গাছটাকে কাঁটার চিন্তা বাদ দিয়েছে। বিশেষ দরকার ছাড়া ঐ গাছের নীচ দিয়ে কেউ যাওয়া আসা করে না, নেহাত কখনও করলেও শনিবার-মঙ্গলবার, বারবেলা, সন্ধ্যেবেলা এসব বেছে দেখে সাথে অন্য লোকজন নিয়ে যাতায়াত করে সবাই। কিন্তু সেদিন এমন ঝুম বৃষ্টি ছিলো যে কফিলকে সে সময় সেদিক দিয়ে একা আসতেই হলো। রাতে সে যখন ঘুমালো তখন তার প্রচন্ড জ্বর। সকাল থেকে উঠেই সে অদ্ভূত সব আচরণ করতে লাগলো। যেমন, মাজেদা ফুপুর দুধের বাচ্চাকে নিয়ে বাড়ির পাশে'র পুকুরে চুবাতে চুবাতে প্রায় মেরেই ফেলেছিলো। সে সময় দৈবক্রমে ঐ পুকুরের পাশ দিয়ে দবির চাচা হেঁটে যাচ্ছিলেন। তিনি দেখে তাড়াতাড়ি বাঁধা দিতে গেলে কফিল তাকেও পুকুরে ফেলে চুবাতে শুরু করলো। দবির চাচার চ্যাচাম্যাচিতে লোকজন জড়ো হয়ে কফিলকে বেঁধে ফেললো বিরাট একটা গাছের সাথে। বিরাট গাছ হতে হবে নইলে গাছ শুদ্ধ উপড়ে নিয়ে আসবে কফিল কারণ তার শরীরে তখন আছে অশরীরি শক্তি।

এরপর তাড়াতাড়ি লোক ছুটে গেলো অনেক দূরের গ্রামে, ওঝা আনতে। খুব নামকড়া ওঝা, যে দশ গ্রামের অনেকের বদ থেকে বদ জ্বীন ছাড়িয়ে ডাক সাইটে হয়েছে। বাড়িতে তার অনেক বোয়াম আছে, যেখানে সে আঁচারের বদলে জ্বীন ভরে রাখে। ওঝা এসে কফিলে'র নাকে শুকনো মরিচ পোড়া ধরলো, চামড়ার জুতো শুকালো, দুর্বোধ্য সব মন্ত্র পড়লো যার এক বর্ণ ও কেউ বুঝতে পারলো না। লাঠি দিয়ে মারলো প্রচুর, মেরে আধমরা করে ফেলে জিজ্ঞেস করলো, কেনো ধরেছিস আর কি হলে ছেড়ে দিবি? রেগে তখন জ্বীন কফিলের মাধ্যমে প্রথমে খুব গালাগালি করলো ওঝাকে, সেসব এত নোংরা গালি যে ভাষায় প্রকাশের মতো নয়. মারতেও চাইছিলো কিন্তু নেহাত হাত পা বাঁধা তারপর মুক্তি পাওয়ার উপায়ন্তর না দেখে চিঁহি চিঁহি সুরে জানালো -সে গাছের ডালে পা ছড়িয়ে বসে আয়েশ করে বাদাম খাচ্ছিলো, নামলো বৃষ্টি, তাতেই তার মেজাজ খারাপ এর মধ্যে কফিল বৃষ্টি দেখে গাছের নীচ দিয়ে দৌড় দিয়ে যাওয়ার সময় তার বাদামের ঠোঙা ফেলে দিলো তাই কফিলের ওপর সে ভর করেছে। অনেক ক্ষতি না করে বাড়ি ফিরবে না। এই শুনে ওঝা আরও রেগে গেলো। তবে রে হারামজাদা, আমার সাথে ফাজলামো, জানিস আমার নাম কি? এই বলে ওঝা নিজের বাপ-দাদা'র চৌদ্দ গোষ্ঠী'র নাম বলতে থাকে, এবং তারা কে কবে কোন কুখ্যাত হারামজাদা জ্বীনকে কি করে কুপোকাত করেছে তার বিস্তারিত বর্ণনা শেষ করে বলেন -এক্ষুণি ছেড়ে যাবি তুই, নইলে আমার একদিন কি তোর একদিন।

আগে বল, তোর নাম কি? সব জ্বীনদের একটি করে নাম থাকতো। ভালো জ্বীনদের খুব কাব্যিক ভারী শব্দের আরবী নাম, সাধারণ জ্বীনদের দৈনন্দিন ব্যবহারিক জীবনের আরবী ভাষার নাম আর মন্দ জ্বীনদের বাংলা নাম, যেগুলো সচরাচর সনাতন ধর্মালম্বীদের হয়।

তারপর জ্বীন কফিল কে দিয়ে নাকি সুরে অনেক কান্নাকাটি করায়, কি হলে ছাড়বে এই নিয়ে অনেক দর কষাকষি হয়, মানতে হয় জ্বীনকেই নইলে "বোয়ামে" কারাবদ্ধ হওয়ার ভয় আছে। এক সময় গ্রাম শুদ্ধ সকলে দেখলো, টিনের চালে মরমর আওয়াজ করে কি জানি একটা কালো ধোঁয়ার কুন্ডলী উড়ে গেলো, যাওয়ার সময় আবার সামনের নিম গাছটার কয়েকটা ডাল ভেঙে মাটিতে পরে গেলো। এতক্ষণের শক্তিমান কফিল নিথর দেহে মাটিতে পরে আছে, মুখ দিয়ে তার ফ্যানা গড়াচ্ছে। ওঝা তখন মুরগীর সালুন দিয়ে খাওয়া দাওয়া সেরে অনেক টাকা পয়সা আর সালামী নিয়ে বিপুল গৌরবে সহাস্যে বিদায় নিচ্ছেন আর ছেলেকে দেখে শুনে রাখতে ছেলের বাবা মাকে উপদেশ দিচ্ছেন।

কি করে বুঝবেন আপনার বয়স হয়ে গেছে? যখন দেখবেন অতীত খুব টানছে। আগে যা শুধু শুনতাম আজকাল অকারণেই তার বিশ্লেষণ মাথায় ঘোরে। বার বার মনে হয়, এই পুরো ঘটনায় মারামারি-ঝাড়াঝাড়ি যা হলো তা হলো কফিল আর ওঝার মাঝে। সর্বশক্তিমান, অসীম ক্ষমতাসম্পন্ন অদৃশ্য "জ্বীন" যে সকল ঘটনার ক্যাটালিস্ট, প্রভাবক বা নিয়ামক সে কিন্তু সকল কিছুর উর্ধ্বে থেকে সকলের কাছে অধরাই থেকে গেলো।


  • ৮৮৫ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

তানবীরা তালুকদার

জন্ম ২৯শে আষাঢ়, ঢাকা। আপাতত নেদারল্যান্ডস প্রবাসিনী। কিন্তু দেশের সাথে নাড়ির যোগাযোগ কাটেনি। পেশায় একাউনটেন্ট। বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডসের নানান সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে আছেন। অবসর সময়ে আবৃত্তি, নাচ ও নাটকের পাশাপাশি লেখালেখি করার চেষ্টা করেন। তাঁর লেখায় নিছক গল্প নেই; রয়েছে সত্যের ওপর দাঁড়ানো এবং জীবন দিয়ে উপলব্ধি করা অনুভূতির কথা। লিখছেন ছোটবেলা থেকেই। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ “পাহাড় আর নদীর গল্প” (২০১৩) এবং উপন্যাস “একদিন অহনার অভিবাসন” (২০১৪)। ২০১১ সালে ডয়েচে ভেল আয়োজিত “ববস” সেরা ব্লগ নির্বাচন প্রতিযোগিতায় তাঁর নিজস্ব ব্লগ http://ratjagapakhi.blogspot.nl/ মনোনয়ন পেয়েছিল। “ইয়েপ আর ইয়ান্নেকে” ডাচ ভাষা থেকে বাংলায় তাঁর প্রথম অনূদিত বই।

ফেসবুকে আমরা