জাতীয় হিপোক্রেসি দিবস

বুধবার, ফেব্রুয়ারী ২১, ২০১৮ ৩:৩৮ PM | বিভাগ : দেশ/রাজনীতি


অমর একুশের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা।

মাতৃভাষা দিবস নিয়ে আবেগের যে প্রদর্শনী চলে, তা নিয়ে বিরক্ত। বিরক্ত এই কারণে যে, ছেলেমেয়ে ইংরেজিতে কথা বলতে পারলে যেভাবে গর্ব ফুটে ওঠে মাবাবাআত্মীয়পরিজনের মুখে, যেভাবে সাধ্য থাকলে সবাই ইংরেজি মাধ্যমে পড়াতে চান ছেলেমেয়েদের, এবং বাংলা মাধ্যমে পড়লেও ইংরেজি শেখার জন্য যে শ্রম আর সময় ব্যয় করা হয়, সে থেকে পরিস্কার যে ইংরেজি ভাষাই আমাদের রাষ্ট্রভাষা হবার সম্মান আর যোগ্যতা রাখে। বাংলা নয়।

ইংরেজি ভাষার প্রতি আমার কোনো বিরাগ নেই। আমি যে কোনো ভাষাকে সম্মান করি। ভাষা হিসেবে উর্দূকেও সম্মান করি। উর্দূভাষা চাপিয়ে দেবার যে রাজনীতি ছিলো, ঘৃণা করেছি সেই নিপীড়নকে। ভাষাকে নয়।

এমনকি, আমাদের কবি-সাহিত্যিকরা বাংলায় লেখেন ঠিকই কিন্তু অনেকেই লালায়িত হয়ে থাকেন কেউ যদি কাকের ঠ্যাং-বকের ঠ্যাং ইংরেজিও করে দেয় তাঁদের লেখা সেই আশায়। খুব নামকরা সাহিত্যিকও এর ব্যতিক্রম নন। তার মানে দাঁড়ায় আমার কাছে, ইচ্ছা ছিলো ইংরেজীতেই লেখার কিন্তু সে সামর্থ নেই তাই বাংলায় লেখা। অথচ আমাদের ষোলকোটি আর পশ্চিমবঙ্গের দশ কোটি মিলিয়ে ২৬ কোটি মানুষের ২ কোটি মানুষও যদি বাংলায় লেখা সাহিত্য পড়েন, তবে তো বর্তে যাওয়া উচিত। আমার খুব সন্দেহ হয়, আজকের দিনে খুব কম কবি-সাহিত্যিকই আসলে বাংলাভাষার সাধনা করেন। মনের ভেতর আশা, আর কেউ না করলেও ইংরেজি মাধ্যমে পড়ানো ছেলেমেয়েরা নিশ্চয়াই একদিন তাদের লেখা অনুবাদ করবে। শুধু বাংলায় লিখে তাঁরা তৃপ্ত নন।

বাংলা সাহিত্যের একজন সাধারণ পাঠক হিসেবে আমার মনে হয়, আমাদের সাহিত্যে নিরীক্ষণ আর ভাষা চর্চার আভাস খুবই সামান্য। নতুনত্ব খুবই কম। তাহলে কি আমাদের মেধাবী সাহিত্যিক নেই? সৈয়দ শামসুল হক আর শহীদুল জহীরের পরে সেই অর্থে ভাষার সাধনা বলতে যা বুঝায়, দেখি না বললেই চলে। অথচ প্রতি বছর মণকে মণ বই বের হচ্ছে। যারা ‘তোমাদের /তুমাদের , যাই/যায়’ পার্থক্য করতে পারেন না, তারাও ঝকঝকে বই করে মন্ত্রী-আমলাদের সাথে সেলফি তুলে বিশাল সাহিত্যিক বনে যাচ্ছেন। সেসব ছবি ফেসবুকে দিয়ে শত শত লাইক জোগাড় করছেন। লাইক তাই ছবিগুলোর হচ্ছে না বইয়ের খবরের হচ্ছে বোঝা দায়। বন্ধু-বান্ধব টেলিভিশনে থাকলে তো কথাই নেই। সটান টেলিভিশনে মুখ দেখানো হয়ে গেলো। বই গৌণ। অনুশীলনহীন এই বই প্রকাশ কোথাও কি নিচ্ছে আমাদের সাহিত্যকে? অন্য খাতের অন্যদের কথা বাদই থাক।

তাহলে উপায় কী? যদি বিশ্বায়নের কথা বলি, একটি আন্তর্জাতিক ভাষায় দক্ষতা থাকা অবশ্যই ভালো। সারা পৃথিবীতেই আছে এই চল। কিন্তু ‘উন্নয়নশীল’ দেশগুলোতে যেভাবে ইংরেজি ভাষাই সামর্থবানদের সন্তানদের শিক্ষার একমাত্র ভাষা হয়ে উঠেছে, তা কিন্তু ‘উন্নত’ দেশগুলোর চিত্র না। বাংলাদেশে সামর্থবানদের মধ্যে বাংলাভাষা কথ্যভাষা থাকলেও শিক্ষার ভাষা হিসেবে টিকতে পারবে কি না সামনের বছরগুলোতে, সন্দেহ করি। একদিকে তো বাংলা মাধ্যম/ইংরেজি মাধ্যমের শ্রেণি বৈষম্য আছেই, সেই সাথে যদি সচ্ছল পরিবারের মেধাবী ছেলেমেয়েরা ইংরেজিতেই চিন্তা করে আর চিন্তার প্রকাশ ঘটায়, বাংলা ভাষার ভবিষ্যত কী হবে? আমি স্কটল্যান্ডে থাকার সময় দেখেছি, গেইলিক ভাষায় অপূর্ব সব গান ছিলো, সাহিত্য ছিলো- সংস্কৃতির অবশেষ হিসেবে এখনো কিছু কিছু গান শোনা হয় বটে, তবে তা প্রবীণদের অভ্যাস। এমনকি আমাদের বয়সীরাও আর পড়তে বা বলতে পারেন না, কিছু কিছু বোঝেন শুধু। ঠিক যেমন আমাদের ছেলেমেয়েরা। এরা রবীন্দ্রনাথ পড়ে না, কিন্তু শেক্সপিয়ার পড়ে। শেক্সপিয়ার পড়ায় আমার কোনো অনুযোগ নেই, আমি বরং উৎসাহিত করতে চাই। আমরাও পড়েছি। আমার অনুযোগ হলো, মা-বাবারা হ্যারি পটার পড়লে খুশি হন, দেশের রুপকথা, কল্পকাহিনীতে উৎসাহ দেন না। এমনকি আমরা যেসব গল্প পড়ে বড় হয়েছি, আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম সেসব পড়ছে না। আমার বাসাতেও না। তাহলে আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতির ঝুলি বাড়বে কীভাবে?

ভাবনার বিষয় হলো, বাড়ার দরকার আছে, সেটা ভাবি কি না। যদি ভাবি, তাহলে বাংলায় চিন্তার অভ্যাসকে উৎসাহিত করার কথা কি ভাবা যায়? সাথে ইংরেজী ভাষাটাও ভালো করে শেখানো হোক। আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি, আমাদের স্কুল কলেজে যেভাবে ইংরেজি শেখানো হয়েছে, যেসব শিক্ষক শিখিয়েছেন -তা খুব দুর্বল ছিলো। আমি এই ভাষাটা আয়ত্ত্ব করতে পারিনি বলতে কোন দ্বিধা নেই। দশটি বাক্য রচনা, দশটি প্রিপজিশন, দশটি শূন্যস্থান পূরণ মার্কা প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দিয়ে একটি ভাষা শেখা যায় না। যারা স্কুল-কলেজে শেখান ইংরেজি ভাষা, তাঁদের মধ্যে অন্ততপক্ষে নব্বই শতাংশ যথেষ্ট জানেন না এই ভাষাটি, একথা হলফ করে বলা যায়। তাঁরা ভূগোলও পড়ান, রসায়নও পড়ান, ইংরেজিও পড়ান। একই অবস্থা বাংলা ভাষা শিক্ষার ক্লাশও। এমনিতেই বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে সেরা ছেলেমেয়েরা ভর্তি হন, সে দিব্যি দেয়া যায় না। সত্য হলো, অন্য কোনো অর্থকরী বিষয়ে সুযোগ পেলে কেউ বাংলায় ভর্তি হন না (ব্যতিক্রম মাথায় রাখছি)। তারাও ক্লাশে বাংলা সেভাবেই পড়ান। বাক্য রচনা, সমাস, সাধু-চলিত, কারক...দশটা করে। এগুলো আবার সাজেশন দেয়া হয়। সেগুলো আবার ‘কমন’ পড়ে পরীক্ষায়। কাজেই ভাষা কী শেখা হয় সহজেই অনুমান করা যায়।

শিক্ষাজীবনের শুরুতেই বাংলা এবং আরেকটু পরে ইংরেজি- এই দুই ভাষা যত্ন করে শেখানো হোক। শিক্ষক কোথায় পাওয়া যাবে? শিক্ষক নেই। আগে শিক্ষকদের পড়ানো হোক। তথাকথিত ট্রেনিং না শুধু। ট্রেনিং মানে জলের বোতল, ফোল্ডার, তথাকথিত ব্রেইন-স্টর্মিং...যতসব ফালতু কাজ। শিক্ষক যারা হবেন তাঁদের শেখানো হোক সাহিত্য পড়তে, ভাষার কাঠামোটা বুঝতে। তারপর তাদের স্কুলে-কলেজে পড়াতে পাঠানো হোক। এজন্য জাতীয় পর্যায়ে নিবিড়ভাবে ভেবে সিদ্ধান্ত নেয়া দরকার। এখন কেউ যদি বলেন, জাতীয় পর্যায়ে নিবিড়ভাবে ভেবে সিদ্ধান্ত নেবার মানুষ কি যথেষ্ট আছেন? তাঁদের কথা ফেলে দেবার মতো হবে না। তবুও কুড়িয়ে-বাড়িয়ে যাঁরা আছেন, তাঁদের নিয়ে ভাষা সমস্যার সমাধানে কী করা যায়, সে নিয়ে কথা শুরু হোক।

প্রাথমিকেই ইংরেজি আর বাংলা মাধ্যমের মধ্যে যে দুস্তর ব্যবধান, সেটা কমানোর জন্য কী করা যায়, চিন্তা করার অভ্যাস চালু হোক। কেবল ইংরেজি ভাষায় কথা বলতে পারা ছেলেমেয়েদের বাহবার চোখে দেখে বাংলায় শুদ্ধ চর্চার বিস্তার আশা করা ভুল। বাংলা শব্দ, বাক্য ভুল হলে আমরা মাত্রেই মাথা ঘামাই না, কিন্তু ইংরেজিতে একটু ভুল হলে লজ্জায় মরে যাই। অন্যদিকে, শুদ্ধভাবে বাংলা বলতে-লিখতে পারার জন্য কেউ বাহবা পাবে না, অথচ কোনোভাবে ইংরেজি বলতে-লিখতে পারলেই সমীহ। এই যে সমমান দেয়া হলো না ভাষা শেখা আর চর্চার ক্ষেত্রে, আর প্রায় একশোভাগ ঘরে ছেলেমেয়েদের ইংরেজি শেখানোর জন্য ধারদেনা করে হলেও শিক্ষক নিয়োগ করে পড়ানো হলো, এই মূল্যনির্ধারণীর মধ্য দিয়ে কীভাবে বাংলা ভাষার প্রতি ছেলেমেয়েদের মধ্যে সম্মান জাগানো সম্ভব? শুরু থেকেই ভাবছিলাম, অন্যান্য জাতিসত্ত্বার ভাষার কথাও তো বলা চাই। ২১শে ফেব্রুয়ারি তো মাতৃভাষায় অধিকারের দিবস, কেবল বাংলায় কথা বলার অধিকারের দিবস নয় । কিন্তু বাংলারই যে অবস্থা, অন্য ভাষার মর্যাদার কথা নাই-ই তুলি।

প্রায় সকল মনের ইচ্ছা, সন্তানরা যেনো চোস্ত ইংরেজি শেখে, এবং সেখানেই সকল বিনিয়োগ; সেই সকলেরা যখন সাদা-কালোতে সেজে বলেন, ‘সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু কর’ একুশে ফেব্রুয়ারির দিনে, তখন, জাতি হিসেবে সব্বাইকে ব্যতিক্রমহীনভাবে হিপোক্রিট বলে মনে হয়। গোটা একটা জাতি প্রতি বছর এমন হিপোক্রেসিকে একটা উৎসবে রুপ দিয়ে ফেলেছে। দুঃখজনকভাবে, আমিও ব্যতিক্রম নই।


  • ৪৪০ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

কাবেরী গায়েন

অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ওসাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ফেসবুকে আমরা