নারী নির্যাতনের ভয়ংকর রুপ

শুক্রবার, নভেম্বর ২৯, ২০১৯ ৫:২৯ AM | বিভাগ : সমাজ/গবেষণা


লিঙ্গগতভাবে যেহেতু আমরা নারী হিসেবে জন্মেছি তাই আমরা নানা ধরণের নির্যাতনের শিকার যাকে আমরা সাধারণ অর্থে লিঙ্গ বৈষম্য বলে সংজ্ঞায়িত করে থাকি। পৃথিবীর সকল দেশে, সবখানে নারী নির্যাতনের শিকার, তবে স্থানভেদে এই নির্যাতনের দিক ও রুপ ভিন্ন। কোথাও নারীকে জন্মের সাথে সাথে মেরে ফেলছে কোথাও ভ্রুণটাই নারী বলে শেষ করছে, আবার জন্ম দিচ্ছে, কিন্তু পুরুষের পণ্য হিসেবে তৈরী করছে, কেউ কেউ ঘর থেকে বের হতে দিচ্ছে না। আবার দিলেও আাপাদ মস্তক মুড়ে দিচ্ছে। ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন, হত্যা এসব ছাড়াও আরো নানান সহিংসতার শিকার এই নারী। শুধুমাত্র তার লিঙ্গ নারী বলে।

নানান কারণে আমার ভৌগলিক ভাবে নারী নির্যাতনের ধরণ জানার প্রয়াস থাকে সবসময়। দেশে অথবা বিদেশে নতুন কোনো বন্ধু হলে জানতে চাই আপনাদের ওখানে নারীরা কী ধরনের সমস্যায় আছে? কয়েক বছর আগে আমার এক ফিনিস(ফিন্ডল্যান্ড এর অধিবাসী) নারী বন্ধু বলেছিলো তার দেশে নারীরা পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয় সবচেয়ে বেশি। আমার চোখ তো চড়ক গাছ। আমাদের মতো দেশে না হয় নারীরা সব দিক দিয়ে পিছিয়ে, কিন্ত এমন শতভাগ শিক্ষিত নারীর দেশে নারীরা পারিবারিক নির্যাতনের শিকার!

তার কথা অবিশ্বাস্য মনে হলেও সেদিনকার এক রিপোর্ট দেখে বিশ্বাস করতেই হলো। জার্মানী থেকে প্রচারিত ডয়েচে ভেলে ইউরোপে নারী নির্যাতনের চিত্র নিয়ে ২৫.১১.২০১৯ তারিখে একটা সংক্ষিপ্ত রিপোর্ট (দেখতে এখানে ক্লিক করুন) প্রকাশ করে। এ রিপোর্ট অনুযায়ী ইউরোপের প্রায় সকল দেশেই নারীরা সহিংসতার শিকার। খবরটিতে জার্মান পরিবার মন্ত্রী ফ্রানসিজকা গিফে'র বরাতে জানানো হয় খোদ জার্মানীতে প্রতি ঘন্টায় একজন নারী পারিবারিক সহিংসতার শিকার হন। আর ইউরোপে সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থায় আছেন ফ্রান্সের নারীরা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নারীরা তাদের সঙ্গীর দ্বারাই নির্যাতনের শিকার হন। বিষয়টি আসলে ভাববার মতো।

তবে আশার কথা হলো, ইউরোপে এসকল সহিংসতার বিরুদ্ধে নারীরা সোচ্চার। দিনে দিনে বাড়ছে তাদের সোচ্চার হবার সংখ্যা। রিপোর্টটিতেই জানানো হয়, আগের চেয়ে বেড়েছে আইনের দ্বারস্থ হবার সংখ্যাও। গত চব্বিশ নভেম্বর বেলজিয়ামের রাস্তায় নির্যাতিত নারীদের প্রতিক হিসেবে লাল জুতো বিছিয়ে করা অভিনব প্রতিবাদ।

এবার তাহলে আমাদের পারিবারিক নির্যাতনের অবস্থান কী তা জানা যাক। ইউএনএ'র তথ্য মতে পৃথিবীতে পারিবারিক নির্যতনের শিকার হয় এমন ৭১ টি দেশের মধ্যে ইথোপিয়াতে হয় সবচে বেশি। পৃথিবীতে ১৪৪ টি দেশে পারিবারিক নির্যাতন রোধে আইন পাশ হয়েছে। এশিয়ার এর সকল দেশে নারী পারিবারিক নির্যাতন আইন আছে। এ থেকে সহজেই বোঝা যায় পারিবারিক নির্যাতনের ভয়াবহ রুপ।

পারিবারিক নির্যাতন অনেকগুলো নির্যাতনের সমষ্টি। শারিরীক নির্যাতন, যৌন নির্যাতন, মানসিক নির্যাতন, আর্থিক নির্যাতন, মত প্রকাশের অনাধিকার সব কিছু পারিবারিকভাবে করা হয়। এশিয়ায় ৭৪ শতাংশ নারী পারিবারিক যৌন নিপীড়নের এবং ৭৬ শতাংশ অর্থনৈতিক নিপীড়নের শিকার। এই সকল তথ্য বৈবাহিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে দেখা গেছে। তবে অবিবাহিত/সঙ্গী সম্পর্কে পারিবারিক নির্যাতনের কোনো সুরক্ষা আইন নেই এখনো। পৃথিবীর মাত্র তিনটি দেশে অবিবাহিত সম্পর্কের ক্ষেত্রে আইনি সুরক্ষা রয়েছে। এশিয়াতে ৮৮ শতাংশ এবং দক্ষিন এশিয়াতে ১০০ ভাগ বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কে কোনো সুরক্ষা আইন নেই।

বাংলাদেশের গবেষনায় বলছে ৬৬ শতাংশ নারী পারিবারিক নির্যাতনের স্বীকার এবং ৭২.১ শতাংশ নারী এই নির্যাতন মুখ বুজে মেনে নেন। বাংলাদেশে নারী পারিবারিক নির্যাতনের প্রধান মূখ্য কারন যৌতুক, এটি দৃশ্যমান এবং এর কারনে পরিনতি মামলা এবং বিচ্ছেদ অব্দি গড়ায়। এদেশে আরও একটি নির্যাতন হলো নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে যৌন সম্পর্কে বাধ্য করা। যেহেতু যৌন সম্পর্ক এক ধরনের ট্যাবু তাই এই বিষয় নিয়ে মুখ খোলেন না অধিকাংশ নারী, ফলে এ ধরণের নির্যাতন রয়ে যায় লোকচক্ষুর অন্তরালে।

আর এদেশে প্রতিবছর বহু নারী পারিবারিক নির্যাতনের কারণে মারা পর্যন্ত যায়, মেরে ফেলা হয়। সন্তানদের জীবনে এর ব্যাপক প্রভাব পড়ে। সেই পরিবারের পুরুষ সন্তান পিতাকে অনুসরণ করে নতুন নির্যাতকে রুপ নেয় আর মেয়ে সন্তান মুখ বন্ধ করে রাখার প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত হয়। এর ব্যতিক্রম গল্প হয়তো আছে। কিন্ত সেই গল্পকে সমাজ অনুসরণ করে না। এজন্য টিকে থাকে এই সকল সহিংসতা ক্রমন্বয়ে বংশের পর বংশ ধরে।

আমরা নারীদের বলি, অনেক হয়েছে, আর না। পারিবারিক নির্যাতন মুখ বুঝে মেনে নেবেন না। আশার কথা যে নারীরা প্রতিবাদী হচ্ছেন, নির্যাতনের প্রতিবাদে প্রয়োজনে তারা সংসার ভেঙে স্বাধীন জীবন যাপন করতে বেড়িয়ে আসছেন। এরফলে হয়তো বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনাও অনেক বেশি দেখা যাচ্ছে। তাতে কী! এখানে নারীরা নিজের কাধে তুলে নিচ্ছেন সকল বোঝা।

তবে, মাতৃত্বের কারণে ডিভোর্সী নারীরা খুব সহজেই নতুন জীবনে প্রবেশ করতে পারছেন না। তাদেরকে সন্তানের দায় বহন করতে হচ্ছে। ফলে শুধুমাত্র সন্তানের কী হবে এই জন্য নারীরা নতুন সম্পর্কে জড়াতে অনাগ্রহী। অপরদিকে পুরুষ যেহেতু সামাজিকভাবে পুরুষতন্ত্রের আবরনে থাকে তারা তাই সন্তনের লালন পালন নিয়ে এতোটা চিন্তিত থাকেন না। আর যে সকল নারীরা মুখ বুঝে সব মেনে নিচ্ছেন তার পিছনে আছে এই মাতৃত্বের দূর্বলতা। অবশ্য বিচ্ছেদের পর রোজগারের কোনো পথ না থাকাটাও আরেকটি কারণ। পুরুষরা সাধারনত এই বিষয় গুলোকে হাতিয়ার বানিয়ে বয়ে চলেছে তাদের পুরুষতন্ত্রের ধারা।

পরিশেষে এটাই বলতে চাই, পৃথিবীব্যাপী পারিবারিক নির্যাতন যেহেতু একটি মহামারি তাই এটিকে আর নগণ্য হিসেবে ভাবার সুযোগ নেই। একটি সম্পর্ক বাঁচিয়ে রাখার জন্য শুধু নারীকেই একজীবনে কেনো এতোটা বির্সজন দিতে হবে? আমাদের নারীদের তৈরী হতে হবে সবার আগে। সকল রকম আবেগকে নিয়ন্ত্রনে নিতে হবে। পুরুষকে প্রভু নয় সঙ্গী হিসেবে ভাবতে হবে। সম্পর্কে শুরু থেকেই নিজেকে মানুষ হিসেবে প্রদর্শন করতে হবে। নিজের অধিকার, প্রাপ্যের ব্যাপারে ছাড় দেওয়া চলবে না। তৈরী করতে হবে নিজের প্রজন্মকে নারী পুরুষ উভয় সন্তানকে। যদিও পুরুষতন্ত্রের শিকড় উপড়ে ফেলা সহজ কোনো বিষয় নয়। তথাপি, পুরুষ যেমন করে আমাদের অধিকার গিলে খেয়েছে আমাদেরকেও তেমনি উদ্ধার করতে হবে হারানো অধিকার।


  • ৮৮৯ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

জান্নাতুল মাওয়া

এক্সেকিউটিভ ডিরেকট, বিন্দু BINDU(Best Initiative National Development Unification)

ফেসবুকে আমরা