জাকারিয়া হোসাইন

অনলাইন একটিভিস্ট ও হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার।

#metoo; আমাদের ভাবনা

#Metoo আজকের বাংলাদেশে খুব পরিচিত এবং সম্ভবত নির্বাচন ইস্যুর পর সবচেয়ে আলোচিত শব্দ। পশ্চিমা বিশ্বে আলোড়ন তুলে পুরুষতান্ত্রিক শোষণ এবং পুরুষতান্ত্রিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে একত্রিত হবার সবচেয়ে বড় প্লাটফর্ম সৃষ্টিকারী গণজাগরণ এই #Metoo ।

 

বিভিন্ন সময়ে নানা অজুহাতে, নানা ছুতোয় পুরুষদের দ্বারা যৌন নিপীড়নের শিকার, নির্যাতনের শিকার নারীগণ তাদের অপ্রকাশিত ভয়ংকর অভিজ্ঞতাগুলো জানিয়ে দিচ্ছেন পরবর্তী প্রজন্মের কাছে। সমাজের উচ্চ হতে নিম্নপদস্থ পুরুষদের যৌন-মৌন এবং অন্যায় অত্যাচারের শিকার যেনো আর কেউ না হয়; এজন্যে পশ্চাদগামী, পিছিয়ে পড়া নারীদের কাছে তুলে ধরছেন তাদের সাথে ঘটে যাওয়া অমানবিক ঘটনাগুলো। অন্যান্য নারী-ভগিনীদের জানিয়ে দিচ্ছেন "আর নয় চুপ থাকা, আর নয় লজ্জা, জ্বালিয়ে দাও পুড়িয়ে দাও; পুরুষতন্ত্রের ধ্বজা।" সব বাধ ভেঙে দিয়ে পুরুষতন্ত্রের শোষন থেকে বেড়িয়ে এসে শুধু নারী, অবলা, অর্ধাঙ্গিনী, বেগমজান কিংবা হেরেম ঘরের বাসিন্দা হিসেবে নয়; মানুষ হিসেবে স্বাধীন ভাবে বাঁচার এ লড়াই। 

বরাবরের মতো এবারও প্রশ্ন আসবে, "তুমি মেয়ে মানুষ, তুমি কী বুঝো?"

এমন প্রশ্ন আমরা হরহামেশাই শুনে থাকি। (প্রাকৃতিক ভাবে আমি পুরুষ, আমার কখনো কাউকে এমন কিছু বলার সুযোগ হয়নি। আশাকরি হবেও না, পাঠক শুভকামনা রাখবেন; যেনো সেই সুযোগ কিংবা আস্পর্ধা কখনো আমার না হয়।) এমন প্রশ্নের উত্তর অনেকভাবেই দেয়া যায়। শিক্ষিত, মূর্খ পুরুষ মাত্রই জানে আজকের সমাজে নারীকুল কতটা এগিয়ে আছে। খোদ বাংলাদেশেই প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, বিরোধী দলীয় নেতা, এমনকি পচে যাওয়া সাবেক বিরোধী দলের নেতাও নারী। বিশ্বরাজনীতিতেও অপেক্ষাকৃতভাবে নারীরা পুরুষের চেয়ে অনেক এগিয়ে। পাকিস্তানের মতো অশিক্ষিত জাতির একমাত্র গর্ব মালালা ইউসুফজাঈ; তিনিও নারী। জ্ঞান, বিজ্ঞান, সাহিত্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, প্রশাসন, আইন, বিচার, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, ক্ষমতা, রাজনীতি এমনকি বাসচালক পর্যন্ত মেয়ে/নারী/ভগিনীরা তাদের অগ্রযাত্রা অক্ষুণ্ণ রেখে চলছেন। পৃথিবীর শুরু থেকে অদ্যকার সময় পর্যন্ত শুধুমাত্র এবং সম্ভবত একমাত্র নবী-রসুল-পয়গম্বর ছাড়া সকল পদেই আসীন হয়েছেন নারী। এই পদটিতে নারীগণ যেতে পারতেন, কেবলমাত্র একটি কারণেই যাওয়া হয়নি। এবং তা হলো পুরুষতান্ত্রিক জটিলতা। ডারউইন যারা পড়েছি, মার্ক্সবাদ যারা কিছুটা হলেও জেনেছি; তারা এটুকু নিশ্চিত যে; "মাতৃতান্ত্রিক গোত্র/সমাজব্যবস্থা ধ্বংস হয়েই পুরুষতান্ত্রিক শাসনের উত্থান, সেইসাথে গোত্র বিবাদের প্রধান কারণ নারীর ক্ষমতাহ্রাস এবং পুরুষতান্ত্রিক জটিলতার সর্বশেষ স্তর হচ্ছে ধর্ম"। (একক কোন ধর্মকে উদ্দেশ্য করছি না, এখানে সকল ধর্মের কথা বলা হচ্ছে) এবং পুরুষতান্ত্রিক শাসনবিধি কতটা ভয়ংকর এবং হাস্যকর; সেটা বুঝতে পারি এক ধর্মের সাথে অন্য ধর্মের হানাহানী-হিংসা দেখে।

সুতরাং নারী মাত্রই অবুঝ; এমনটা ভাবার কারণ নেই। তারপরও কেউ এমন অযৌক্তিকভাবে (নারী মাত্রই অবুঝ) প্রশ্ন করলে পাঠকের কাছে অনুরোধ থাকবে; এমন মানুষদের পরিত্যাগ করা। পৃথিবীতে অনেক কোটি মানুষ আছে, সুতরাং এমন গবেট গোয়ার চাড়ালদের সাথে সম্পর্ক না রাখলে খুব কিছু অসুবিধা হবার নয়।

"মেয়েরা তো অর্ধাঙ্গিনী" এমন বাক্য হরহামেশাই শুনতে পাই। অর্ধাঙ্গিনীই তো। না এমনটা আমি ভাবিনি। পুরুষতান্ত্রিক শোষণের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে অথবা সামঞ্জস্যতা রক্ষা করতে গিয়ে বেগম রোকেয়া এমনটাই দাবী করেছেন। তিনি পুরুষতান্ত্রিক জটিলতা থেকে নারীদের মুক্ত করতে চেয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু পুরুষদের মতো করে। তাই অর্ধাঙ্গিনী শব্দটি পুরুষদের খুবই প্রিয়।

এবার আসুন, অর্ধাঙ্গিনী শব্দটি আদতে কী? আভিধানিক অর্থে এখানে অর্ধ+অঙ্গ+ধারিণী= অর্ধাঙ্গিনী বলা হলেও এর পারিভাষিক কোন অর্থ নেই। থাকবেও না। কারণ অর্ধ অঙ্গ হলে সেখানে পুর্ণাঙ্গ থাকা বাঞ্ছনীয়। সে অর্থে পুরুষের অর্ধাঙ্গিনী যদি নারী হয়; তবে নারীর অর্ধাঙ্গিনীও পুরুষ। এক অর্থে পুরুষ পুর্ণাঙ্গ তো নয়ই, অর্ধাঙ্গও নয়। তবে পুরুষকুলকে আমরা অঙ্গহীন কিংবা পঙ্গু বলবো না। কারণ নারীবাদ মানেই মানবতাবাদ। মানবতাবাদে কাউকে খাটো করে দেখা অমানবিক হিসেবেই ধরা হয়।

সুতরাং, অর্ধাঙ্গিনী শব্দটি কোনো অর্থবহ শব্দ নয়। অসুন্দর, অবাস্তব এবং সার্বজনীনতার অভাব থাকায় অর্ধাঙ্গ/অর্ধাঙ্গিনী আর যাই হোক, কোনো শব্দ কিংবা পদ অথবা বিশেষণ হতে পারেনা।

"নারী হচ্ছে গৃহিণীঃ বাহিরে যেতে নেইকো মানা" নারীগণ বাড়ীর বাহিরে গেলে অনেক, বেশিরভাগ এমনকি পুরুষতান্ত্রিক সমাজের সকল পুরুষ, এমনকি অনেক নারীরাও আপত্তি করে। মজার ব্যপার হলো এইসব নারীরাও পুরুষতন্ত্রের নিন্দা করে। কিন্তু অর্থনৈতিক কারণে ঘর ছেড়ে দিতে পারেন না। আমার বিশ্বাস, বাঙালী সমাজের নারীরা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, শিক্ষা শেষে কাজ এবং স্বাবলম্বী হলে বাংলাদেশ থেকে পুরুষতন্ত্র এবং পুঁজিবাদ উঠে যাবে। বিশ্বাস না হলে কোন বিবাহিত এবং দরিদ্র চল্লিশোর্ধ নারীকে বাকী জীবনধারণ এর জন্য পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা দিয়ে দেখতে পারেন।

যাই হোক, নারীগণ দিনে বের হতে পারেন। কিন্তু রাতে নয়!! আপনি তো পুরুষ। আপনি যদি রাত বিরাতে বের হতে পারেন, তবে নারী কেন নয়?

মনে করুন, আপনি প্রচণ্ড অসুস্থ এবং বাড়ীতে শুধুমাত্র একজন নারী (মা, কন্যা বোন, স্ত্রী, জায়া, ভগিনী যে কোন একজন) আছেন, যিনি আপনার জীবনরক্ষাকারী ঔষধ নিয়ে আসতে পারবেন। আপনি কী তাকে নিষেধ করবেন-"এই, তুমি তো নারী, তুমি খবরদার বাহিরে যাবে না" বলে!! পারবেন না। (যদিও আপনার মতো ধর্ষক/পুরুষ বাহিরে ওঁত পেতে আছে, হায়েনার মতো দাত বের করে আছে, তবুও আপনি সেই নারীকে ঘর থেকে বের হতে নিষেধ করতে পারবেন না। কারণ এটা আপনার প্রয়োজন, আপনাদের মতো পুরুষতান্ত্রিক স্বার্থবাদীদের প্রয়োজন।)

উল্টো যুক্তি দিয়ে চাড়ালদের কেউ কেউ বলবে- যাই হোক না কেন, আমি নারীদের বাহিরে যেতে বলবো না; তাঁহারা নিরেট পাগল। পাঠকদের কাছে করজোড় অনুরোধ; এসব গাড়ল চাড়ালদের থেকে দূরে থাকবেন। পৃথিবী অনেক বড়। সেখানে দ্রোহ বিদ্রোহ এবং শান্তি থাকে।

"নারীর আঁচলে লুকোনো পুরুষ" আমরা যারা নারীর ক্ষমতায়ন চাই, নারীর অধিকার ফিরিয়ে নেয়ার দাবী জানাই; পুরুষতন্ত্র আমাদের মেয়েলী বলে তিরস্কার করে। যদিও বাক্যটি তিরস্কার কিংবা অপমানজনক নয়, এক্ষেত্রে সেই পুরুষ বক্তার স্বর এবং বাচনভঙ্গিটাই কেবল তিরস্কার হিসেবে মনে হয়। যাই হোক, নারী/মেয়েদের আঁচলের নিচেই আমাদের জন্ম। আমাদের আবেগ, আমাদের সুখ। আমরা নারীর ক্ষমতায়ন চাই। কারণ আমরা মানুষের ক্ষমতায়ন চাই। মানবিক মানুষের ক্ষমতায়ন চাই। আমার জন্ম যেখানে, কোন মায়ের আঁচলের নিচে। সেখানে যা সুখ, অন্য কোথাও কী আছে সেই সুখ!! না। নেই।

আমরা মানবতাবাদ ফিরিয়ে আনতে চাই। পুঁজিবাদ এবং পুরুষতন্ত্র এক। আমরা, যারা সাম্যবাদের আদর্শ বুকে লালন করি, আমরা পুঁজিবাদকে ঘৃণা করি। আমরা পুরুষতন্ত্রকে ঘৃণা করি। কারণ যাহা পুরুষতন্ত্র, তাহাই পুঁজিবাদ।

আমরা নারীর ক্ষমতায়ন চাই। কারণ নারীবাদ, নারীর ক্ষমতায়ন মানেই মানবতাবাদ। জাগতিক সকল মন্ত্র তন্ত্র যন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে আমরা মানবতাবোধসম্পন্ন পৃথিবী গড়তে চাই, যা একমাত্র নারীরাই দিতে পারে।

নারীদের প্রতি পুরুষতান্ত্রিক অত্যাচার, (ভালবেসে নয়) প্রলোভন দেখিয়ে, জোড় করে, কাজের বিনিময়ে, কাজ দেয়ার নাম করে, অফিসের বস হিসেবে, বাড়ির মালিক, মনিব হিসেবে, স্কুল কলেজ এর নম্বর কম দেয়ার ভয় দেখিয়ে, সামাজিক অপরাধী হিসেবে প্রচার করার ভয় দেখিয়ে পুরুষরা আজ পর্যন্ত যা যা করেছে; সেসব আপনারা বলুন। তুলে ধরুন মানুষের সামনে। মানুষের কাছে।

হয়তো বিচার হবে না। শাস্তি হবে না। কিন্তু মানুষ বিচার করবে। যেভাবে রাজাকারদের বিচার করেছিল উত্তাল শাহবাগে। গণ আদালতে। ইতিহাস সাক্ষী; ইতিহাসই বিচার করবে। 

তো ভগিনী, জায়া, জননী ফুঁসে উঠুন এখনি। রাগে গড়গড় থরথর কাঁপছে ঐ ধরণী। জেগে উঠুন, জ্বালিয়ে দিন মানবতাবাদের আলো। হাসবো আবার, গাইবো আবার, বাসবো অনেক ভালো।

 

1110 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।