জাকারিয়া হোসাইন

অনলাইন একটিভিস্ট ও হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার।

আন্তর্জাতিক নারী দিবসে নারী সমীপেষু

অর্ধেক মানবী তুমি- অর্ধেক কল্পনা, এভাবেই পুরুষ বন্দনা করেছে নারী প্রতিমাকে। এ ধরণের রচনা মূলতঃ আত্মরতির জন্য। খররৌদ্রের বাস্তবচিত্র দেখতে চায় না বলে কল্পনা দিয়ে পুরণ করা। আমাদের ভাষা যেহেতু চিহ্নায়ক, নারী এবং তার প্রতিশব্দের মধ্যে প্রচ্ছন্ন রয়েছে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরম্পরার ইঙ্গিত। নারী মানে যে পুষ্টিদান করে, স্ত্রী মানে যা বেষ্টন করে। পূজার্হাঃ গৃহদীপ্তয়ঃ বলে কালিদাস যতোই প্রসংশা করুন, স্ত্রীজাতি লতাধর্মী- পুরুষবক্ষকে স্ত্রীলতা জড়িয়ে থাকে, রমণী অর্থ রমণযোগ্য,- যার মধ্যে ভোগের বিষয়টি স্পষ্ট। লঙ্কা যুদ্ধে জয়ী হবার পর রাম সীতাকে বলছে- (নোৎসাহে পরিভোগায়) অর্থাৎ তোমাকে ভোগ করতে আমার আর ইচ্ছে নেই। প্রাচীন ভারত উপমহাদেশেও নারীকে কেবলমাত্র পুরুষ সন্তান উৎপাদনের উপায় হিসেবে দেখেছে।

ভৃত্য এবং ভার্ষা একই ক্রিয়াপদ। এটি নিষ্পন্ন করলে (ভৃ) ধাতু, অর্থাৎ ভরনপোষণ করা। নারীকে অশুচি, অমঙ্গলের উৎস, বিশ্বাসের অযোগ্য এমনকি নরকের দ্বার বলা হতো। নারী উন-মানব অর্থাৎ পুরোপুরি মানুষ নয়। ধর্ম-সাহিত্যে তো এমনও আছে যে কালো পাখি, সাপ, বেজি, শুদ্র বা নারীকে হত্যা করলে প্রায়শ্চিত্ব সম্মান।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গৃহযুদ্ধের সময়, সিভিল রাইটস আন্দোলনের সময় মধ্যবিত্ত নারীরা বলতে শুরু করে সবরকম শোষণের মূলে রয়েছে Sexsism. ঠিক এই সময় আরো একটি মহান সত্য সামনে আসে। যেখানে দেখা যায়, শোষিতও কখনো কখনো শোষকের ভূমিকা পালন করে। যেমন একজন দাস মহিলার সাথে তার স্বেতাঙ্গিনী মালিকের সম্পর্ক। সাদা চামড়ার লোকেদের তুলনায় নিগ্রোরা অর্ধেক মানুষ, নিগ্রোদের ভিতরেই আবার নারীরা অর্ধেক মানুষ। যে কোনো দলিত শ্রেণীর নারীদের অবস্থান পুরুষের তিনভাগের একভাগেরও কম।

গ্রিক দার্শনিক এরিষ্টটলের মতো মনীষীও ভেবেছিলেন কিছু কিছু আবশ্যিক গুণাবলি নেই বলে নারীকে আজন্ম নারী হয়েই থাকতে হয়, পুরুষের কাম্য অবস্থায় পৌছতে পারে না।–(দ্রষ্টব্যঃ পোয়েটিকস)। সন্ত থমাস এ্যাকুইনাস বলেছিলেন, নারী হলো অসম্পূর্ণ পুরুষ। বঙ্কিমের কমলাকান্তও বলেছে- স্ত্রীলোকের বুদ্ধি কখনো আধখানা বৈ পুরা হইতে দেখিলাম না। প্রাচ্য বলেন আর পাশ্চাত্য, বাংলাদেশ বলেন অথবা জাপান, সবদেশে নারীদের সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি একই। বর মানে শ্রেষ্ঠ, বরণীয় এবং বধূ অর্থাৎ যাকে বহন করে নিয়ে যেতে হয়। নারী কন্যা হিসেবে পিতার অধীন, স্ত্রী হিসেবে স্বামীর অধীন, বুরো বয়সে ছেলে বা জামাইয়ের অধীন। মেয়েদের নিজস্ব বলতে কিছু নেই, তাদের স্বাধীনতা বলতেও কিচ্ছুটি নেই।

বিশ্বায়নের নামে পশ্চিমা ধনী দেশগুলো আজও আন্তর্জাতিক ধনতন্ত্রের বাজার সৃষ্টি করে দূর্বল দেশ ও দূর্বল শ্রেণীর উপর, বিশেষ করে মেয়েদের উপর যে শোষণ চালাচ্ছে, তার ছোয়া এসে লেগেছে স্বয়ং নারীদের আচরণে। সম্প্রতি ভারতের একটি বাংলা বিজ্ঞাপনে ডাভ সাবানের বিজ্ঞাপনের একটি চিত্র না বললেই নয়। সেখানে একজন নারী রোদে পুড়ে, ময়লা ঘাম মিশিয়ে কাজ করতে করতে কালো ও শুকনো হয়ে যায়। এমতাবস্থায় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির ডাক্তার নারীটিকে ডাভ সাবান ব্যবহারের পরামর্শ দেন। প্রায় এক সপ্তাহ এই ডাভ সাবান ব্যাবহার করার পর নারীটির মন্তব্য- স্বামী আগে কাছেই আসতো না, এখন বলে আমার গালগুলো নাকি রসগোল্লার মতো।

বিশ্বায়নের যুগে প্রাকৃতিক সম্পত্তিতে ভাগ বসাচ্ছে এসব মাল্টিন্যাশনাল কর্পোরেশন, গরীব, মেহনতী মানুষের অধিকার কেড়ে নিচ্ছে তারা। তারই প্রতিবাদে গড়ে উঠছে চিপকো আন্দোলন, ওকুপাই আন্দোলন, এসব গনপ্রতিবাদে নারীরাও পিছিয়ে নেই। তারা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে, সর্বগ্রাসী ধনতন্ত্রের বিরুদ্ধে জাতপাত, নারী পুরুষ ব্যাবধান না রেখে, আন্তর্জাতিক মঞ্চে পুরুষের সাথে একই মঞ্চে এসে অধিকার আদায়ের দাবী জানাচ্ছে। পশ্চিমের বাহিরে গণতন্ত্রের তকমা এঁটে, আধুনিক সাম্রাজ্যবাদকে ধরে রাখতে তারা সুনিপুন এক জাল বিছিয়েছে। বিভিন্ন স্তরের সেই জালে একদিকে তারা কাজে লাগাচ্ছে গরিব দেশগুলোর দরিদ্রতম গোষ্ঠির মেয়েদের। 

অন্যদিকে পুরুষের প্রায় অর্ধেক বেতনে কাজ করিয়ে নিয়ে তারা এমন ভাব দেখাচ্ছে যাতে মনে হয়, নারীবাদ প্রতিষ্ঠা হয়ে গিয়েছে। 

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, পূজিবাদ ফাঁদ পেতেছে। আমাদেরও সাবধান হতে হবে। আজকের ধনতন্ত্রবিরোধী আন্তর্জাতিক আন্দোলনকে সফল করতে হলে ধরে রাখতে হবে মূল নারীবাদের মন্ত্র।

পুনশ্চঃ শারীরিক কিছু ব্যাতিক্রম থাকার কারণেই নারী এবং পুরুষ আলাদা তন্ত্রের ধারক। ব্যাক্তিগতভাবে আমি মনে করি নারীকে নারী হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবে দেখতে হবে। ঠিক এইমতে উপরের রচনায় নারী শব্দটির স্থলে (মানুষ) পড়ে নেয়ার অনুরোধ রইল।

সবাইকে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের শুভেচ্ছা।

970 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।